চীনের জায়ান্ট পান্ডা জাতীয় উদ্যানে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের কার্যক্রম জোরদার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাতও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত এক দশকে এ সংঘাত স্থানীয় কৃষকদের জীবন ও জীবিকায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে।
২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কৃষকদের ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, ফসল ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি মানুষ ও গবাদিপশুর ওপর বন্যপ্রাণীর হামলার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গবেষকদের মতে, বর্তমানে জাতীয় উদ্যানটির প্রশাসনের জন্য মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাতই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২২ হাজার বর্গকিলোমিটারের বিশাল উদ্যান
জায়ান্ট পান্ডা জাতীয় উদ্যানের আয়তন প্রায় ২২ হাজার বর্গকিলোমিটার। যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েলোস্টোন জাতীয় উদ্যানের তুলনায় এটি প্রায় আড়াই গুণ বড়। ২০২১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়া এই উদ্যানটি চীনের সিচুয়ান, শানসি ও গানসু প্রদেশজুড়ে বিস্তৃত।
এখানে বর্তমানে ১ হাজার ৩০০টিরও বেশি বন্য জায়ান্ট পান্ডা রয়েছে, যা বিশ্বে বন্য পরিবেশে থাকা মোট জায়ান্ট পান্ডার প্রায় ৭০ শতাংশ। পান্ডার পাশাপাশি তুষারচিতাবাঘসহ আরও বেশ কিছু বিপন্ন প্রাণীর আবাসস্থল এই বিশাল সংরক্ষিত এলাকা।
কৃষকদের ক্ষতি বেড়েছে কয়েক গুণ
গবেষণায় সিচুয়ান অংশের প্রায় ২ হাজার ৪০০ কৃষক পরিবারের কাছ থেকে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। উদ্যানটির মোট এলাকার প্রায় ৯০ শতাংশই সিচুয়ানে অবস্থিত।
২০১৫ সালে বন্যপ্রাণী-সম্পর্কিত সংঘাত নিয়ে কৃষকদের উদ্বেগের গড় মাত্রা ছিল ১ দশমিক ১৪৭। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ দশমিক ৯৪৯-এ। একই সময়ে এসব ঘটনায় কৃষকদের গড় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ২ দশমিক ৭ গুণ।
অর্থাৎ, শুধু সংঘাতের ঘটনা বাড়েনি, বরং তুলনামূলকভাবে গুরুতর সংঘাতের সম্ভাবনাও বেড়েছে। গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, কম মাত্রার সংঘাতের সম্ভাবনা কমেছে, বিপরীতে উচ্চ মাত্রার সংঘাতের সম্ভাবনা বেড়েছে।
কমেছে বনসম্পদ নিয়ে বিরোধ
তবে সব ধরনের সংঘাত বাড়েনি। জ্বালানি কাঠ ও বিভিন্ন উদ্ভিদ সংগ্রহ, গাছ কাটা, কৃষিকাজ এবং পশু চরানোর মতো প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের বিষয়কে কেন্দ্র করে বিরোধ ধীরে ধীরে কমেছে।
অন্যদিকে, কৃষকদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর বিধিনিষেধ নিয়ে যে সংঘাত তৈরি হয়েছিল, তা ২০২১ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। পরে তা আবার জাতীয় উদ্যান প্রতিষ্ঠার আগের সময়ের কাছাকাছি নেমে আসে।
একই সময়ে পরিবেশবান্ধব পর্যটন থেকে কৃষকদের গড় আয় দশ গুণেরও বেশি বেড়েছে। অর্থাৎ সংরক্ষণ কার্যক্রম স্থানীয় অর্থনীতিতে কিছু নতুন সুযোগ তৈরি করলেও তার সুফল ও ক্ষতির বণ্টন সমান নয়।
সংরক্ষণের সুফল সবার, ক্ষতির বোঝা কৃষকের
গবেষকদের মতে, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের সুফল বৃহত্তর সমাজ ভাগ করে নিলেও ক্ষতির বড় অংশ বহন করছেন স্থানীয় কৃষকেরা। উদ্যান প্রতিষ্ঠার ফলে সম্পদ সংগ্রহে বিধিনিষেধ, বন ব্যবস্থাপনার নিয়ম, বিকল্প জীবিকার সীমাবদ্ধতা এবং বন্যপ্রাণীর চলাচল—সব মিলিয়ে স্থানীয় মানুষের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
এই অঞ্চলের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে কৃষি, বনজ সম্পদ, জলবিদ্যুৎ ও খনির মতো সম্পদনির্ভর কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভরশীল। ফলে পরিবেশ সংরক্ষণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে টানাপোড়েন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
ক্ষতিপূরণের বদলে প্রতিরোধের ওপর জোর
গবেষকরা মনে করছেন, বন্যপ্রাণীর কারণে ক্ষতি হওয়ার পর কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রচলিত ব্যবস্থার ওপর এককভাবে নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। কারণ ক্ষতিপূরণ পেতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে এবং এতে সংঘাতের মূল কারণ দূর হয় না।
তাই ক্ষয়ক্ষতি ঘটার আগেই তা ঠেকাতে বৈদ্যুতিক বেড়া, বুদ্ধিমান অবলোপন প্রযুক্তি এবং আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদারের সুপারিশ করেছেন তারা।
জায়ান্ট পান্ডা রক্ষায় চীনের সাফল্য যেমন বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন, তেমনি এই গবেষণা দেখাচ্ছে—বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ দীর্ঘমেয়াদে সফল করতে হলে স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা ও জীবিকাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















