দক্ষিণ চীন সাগরের বিতর্কিত জলসীমায় দীর্ঘদিনের উত্তেজনা কমাতে চীন ও ফিলিপাইনের মধ্যে আবারও যৌথভাবে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান শুরুর প্রস্তাব উঠেছে। একই সঙ্গে সামুদ্রিক পরিবেশ সুরক্ষা ও সমুদ্রে অপরাধ দমনের মতো কম সংবেদনশীল ক্ষেত্রেও দুই দেশকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ
চীনা ও ফিলিপাইনি বিশ্লেষকদের যৌথভাবে তৈরি একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই দেশের সম্পর্ক বর্তমানে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ এক সন্ধিক্ষণে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে যৌথ তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানকে দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য একটি সহযোগিতা প্রকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রতিবেদনটির মতে, এ ধরনের উদ্যোগ ফিলিপাইনের জ্বালানি চাহিদা পূরণে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে একতরফা কর্মকাণ্ডের কারণে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ার ঝুঁকি কমিয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদার করতে পারে।
এর পাশাপাশি, সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার পার্থক্য এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, যৌথ অর্থনৈতিক উদ্যোগ তা কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
আগেও হয়েছিল তেল-গ্যাস সহযোগিতার উদ্যোগ
চীন ও ফিলিপাইন ২০১৮ সালে তেল ও গ্যাস সহযোগিতা নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছিল। কিন্তু এরপর খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি।
দুই দেশের দীর্ঘদিনের ভূখণ্ডগত বিরোধই মূলত এই সহযোগিতার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে রয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগরের বিতর্কিত বিভিন্ন এলাকায় দুই দেশের নৌবাহিনী ও উপকূলরক্ষী বাহিনীর মধ্যে নিয়মিত উত্তেজনা দেখা যায়। এর মধ্যে স্কারবরো শোল ও সেকেন্ড থমাস শোল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ফিলিপাইনের সংবিধান অনুযায়ী, দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। তবে যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সাংবিধানিক বিধান বিতর্কিত এলাকায় যৌথভাবে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় না।
মার্কোসের ‘সম্পর্ক পুনর্গঠনের’ আশা
চলতি মাসের শুরুতে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র চীনের সঙ্গে যৌথভাবে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের সম্ভাবনা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে সাজানোর আশা প্রকাশ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত বিরোধের বাইরে রাখার চেষ্টা দুই দেশের মধ্যে আস্থা পুনর্গঠনের একটি পথ হতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবিষ্যৎ সহযোগিতার কাঠামো এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে দুই দেশের শক্তির অসমতা কিংবা সার্বভৌমত্ব নিয়ে বিরোধ নতুন সংঘাতের কারণ না হয়। যৌথ প্রকল্পে ন্যায্যতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবেশ সুরক্ষায় সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা
তবে শুধু জ্বালানি খাত নয়, সামুদ্রিক পরিবেশ সুরক্ষাকেও দুই দেশের সহযোগিতার সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই খাতে রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা তুলনামূলক কম, দুই দেশের মধ্যে ঐকমত্যের সুযোগ বেশি এবং বাস্তবায়নও তুলনামূলক সহজ।
এ কারণে চীন ও ফিলিপাইন আবারও যৌথ বৈজ্ঞানিক অভিযান শুরু করতে পারে। এসব অভিযানে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র, প্রবালপ্রাচীর ও সমুদ্রদূষণ পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে।
অতীতের উদ্যোগও সফল হয়নি
দুই দেশ এর আগেও দক্ষিণ চীন সাগরে সহযোগিতার চেষ্টা করেছিল। ২০০৫ সালে চীন, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনাম যৌথভাবে সমুদ্রতলের ভূকম্পন জরিপ চালানোর জন্য একটি চুক্তি করেছিল। ধারণা ছিল, এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বড় যৌথ উন্নয়ন প্রকল্পের পথ খুলে দেবে।
কিন্তু চুক্তিটির মেয়াদ ২০০৮ সালে শেষ হয়ে যায়। এরপর একই ধরনের সহযোগিতাকে আর কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
বর্তমানে তাই তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষা ও সামুদ্রিক অপরাধ দমনের মতো তুলনামূলক কম বিতর্কিত উদ্যোগকে সামনে এনে দুই দেশের মধ্যে আস্থা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত এসব উদ্যোগ দক্ষিণ চীন সাগরের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বিরোধ কতটা কমাতে পারে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















