ইরানের কাছ থেকে তেল কেনা দেশগুলোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবার চীনের সঙ্গে নতুন করে সংঘাতের পথে হাঁটছে। ওয়াশিংটন সরাসরি চীনের নাম না নিলেও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ইরানি তেল ক্রেতা হিসেবে বেইজিং যে এই চাপের মূল লক্ষ্য, তা স্পষ্ট।
ইরান ইস্যুতে নতুন চাপ
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৬০ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে চীনের মূল ভূখণ্ড ও হংকংয়ের কিছু প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। ফলে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সাময়িক স্বস্তির পরিবেশ আবারও চাপের মুখে পড়েছে।
চীন এখন পর্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, অর্থনৈতিক চাপ বা হুমকির কাছে তারা নতি স্বীকার করবে না। ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্র যদি চীনের ওপর দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তাহলে বেইজিং কঠোর পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে।
একের পর এক চাপে বেইজিং
ইরানই শুধু নয়, গত কয়েক মাসে চীনের ওপর একাধিক দিক থেকে চাপ বাড়িয়েছে ওয়াশিংটন। চীনের কয়েকটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে। চীনা পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের পাশাপাশি রোবট, বিদ্যুৎ রূপান্তর সরঞ্জাম এবং সৌরশক্তি উৎপাদনে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের ওপরও বিধিনিষেধ এসেছে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা হচ্ছে, শুধু শুল্ক নয়—প্রযুক্তি, সরবরাহ ব্যবস্থা, বিনিয়োগ ও বাজারে প্রবেশাধিকার—প্রতিটি ক্ষেত্রেই চীনের ওপর চাপ বাড়ানো হবে।
চীনের কৌশল বদলেছে
তবে বেইজিং আগের মতো নির্বিচারে পাল্টা শুল্ক আরোপ করছে না। যেখানে পাল্টা পদক্ষেপে নিজেদের ক্ষতির আশঙ্কা বেশি, সেখানে চীন সংযম দেখাচ্ছে। কিন্তু নিজেদের মৌলিক স্বার্থে আঘাত এলে লক্ষ্যভিত্তিক ও কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে।
জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগে চীনা প্রতিষ্ঠানের ওপর মার্কিন বিধিনিষেধের ক্ষেত্রেও একই কৌশল দেখা গেছে। সরাসরি সর্বাত্মক বাণিজ্যযুদ্ধে না গিয়ে চীন নির্দিষ্ট পণ্য ও খাতকে লক্ষ্য করে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তাভিত্তিক তদন্তের পথ বেছে নিয়েছে।
ইরানের ক্ষেত্রে অবশ্য পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর। কোন দেশের সঙ্গে চীন বাণিজ্য করবে, সে সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ মেনে নেওয়ার সম্ভাবনা কম। ফলে ইরানকে কেন্দ্র করে নতুন সংঘাত তৈরি হলে তা দুই দেশের সম্পর্কের বড় ধরনের মোড় পরিবর্তনের কারণ হতে পারে।
বিরোধের আরও দুটি বড় ক্ষেত্র
চীন-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার আরেকটি বড় কারণ হতে পারে চীনের অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে মার্কিন তদন্ত। সৌরশক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ইস্পাতের মতো শিল্পে চীনা সরকারি সহায়তার কারণে বিশ্ববাজারে অতিরিক্ত পণ্য জমছে—এমন অভিযোগ রয়েছে।
এই তদন্তের পর চীনা পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হলে বেইজিং বিরোধী ব্যবস্থা নিতে পারে। বিশেষ করে বিরল খনিজ ও গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের ক্ষেত্রে চীনের শক্তিশালী অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে চীনের স্বাভাবিক বাণিজ্য সুবিধা বাতিলের দাবিও জোরালো হচ্ছে। এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে চীনা পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক অনেক বেড়ে যেতে পারে। এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে চীনও কঠোর পদক্ষেপ নিলে ২০০১ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় চীনের যোগদানের পর দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হতে পারে।
শুল্কযুদ্ধ থেকে সরবরাহব্যবস্থার লড়াই
চীন-যুক্তরাষ্ট্র বিরোধ এখন আর কেবল শুল্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নিষেধাজ্ঞার তালিকা, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, ন্যূনতম আমদানি মূল্য এবং প্রযুক্তিগত মানদণ্ডের মতো নানা উপায় ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র চীনা পণ্যের জন্য বাজার সংকুচিত করার চেষ্টা করছে।
বিশেষ করে সবুজ জ্বালানি ও উচ্চপ্রযুক্তি খাতে চীনা পণ্যের চাহিদা কমানোর ওপর গুরুত্ব বাড়ছে। ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় করে যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি বাণিজ্য পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে, যেখানে চীনা পণ্যের বাজারে প্রবেশ কঠিন হয়ে পড়ে।
চীনও এখন পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রস্তুত। বিরল খনিজ, সৌরশক্তির কাঁচামাল, ড্রোন ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পখাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ বেইজিংয়ের রয়েছে।
প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, বিচ্ছেদ নয়
দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠক সম্পর্কের সব বিরোধ শেষ করার জন্য নয়, বরং সংঘাত যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়, সে জন্য একটি ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরির চেষ্টা করেছে। সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা বাস্তবসম্মত বা দুই পক্ষের জন্য কাঙ্ক্ষিত—এমনটিও নয়।
তবে কৌশলগত অর্থনৈতিক সহযোগিতার পুরোনো যুগ যে অনেকটাই শেষ হয়ে গেছে, তা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। সামনে দুই দেশের সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা হতে পারে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও সহাবস্থান।
দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ শুল্ক, ধীরে ধীরে বদলে যাওয়া সরবরাহব্যবস্থা এবং প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আরও শক্ত সীমারেখা—এসবই হতে পারে নতুন বাস্তবতার অংশ।
ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন চাপ তাই কেবল তেল বাণিজ্যের প্রশ্ন নয়। এটি চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা কতটা তীব্র হবে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। আগামী দিনে আরও বৈঠক ও কূটনৈতিক উদ্যোগ সাময়িকভাবে উত্তেজনা কমাতে পারে, কিন্তু চীনের উত্থান নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ সহজে দূর হওয়ার সম্ভাবনা কম।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















