বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার সাম্প্রতিক সংকটের কেন্দ্রে এখন শুধু সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নামই নয়, আলোচনায় উঠে এসেছে আরও এক ব্যক্তির নাম—ইতালীয় আইনজীবী মারিও গাল্লাভোত্তি। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ইনফান্তিনোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা এই ব্যক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে খুব বেশি পরিচিত না হলেও ফিফার গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তে তার প্রভাব যথেষ্ট বলেই দাবি করছেন সংস্থাটির সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের অনেকে।
সম্প্রতি বিশ্বকাপের কিছু অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে তুলে দেওয়ার গোপন পরিকল্পনা প্রকাশ্যে আসার পর ফিফার ভেতরের ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সেই পরিকল্পনার তথ্য কীভাবে বাইরে গেল, কারা এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ইনফান্তিনোর সিদ্ধান্ত গ্রহণে কারা প্রভাব রাখেন—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে গাল্লাভোত্তির ভূমিকা সামনে এসেছে।
ইনফান্তিনোর ছায়াসঙ্গী
ফিফার সাবেক স্বাধীন নিরীক্ষা কমিটির প্রধান তোমাজ ভেসেল বলেছেন, কখনো কখনো গাল্লাভোত্তি ও ইনফান্তিনোর মধ্যে কে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝা কঠিন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ফিফায় গাল্লাভোত্তির ভূমিকা অন্য যেকোনো ব্যক্তির তুলনায় বেশি রাজনৈতিক।
গাল্লাভোত্তির সঙ্গে ইনফান্তিনোর পরিচয় প্রায় দুই দশক আগের। তখন ইনফান্তিনো ইউরোপীয় ফুটবলের প্রশাসনিক পর্যায়ে কাজ করতেন। অন্যদিকে গাল্লাভোত্তি ইতালির পেশাদার ফুটবল প্রশাসনের সঙ্গে আইনগত পরামর্শক হিসেবে যুক্ত ছিলেন।
২০১৬ সালে ইনফান্তিনো ফিফার সভাপতি হওয়ার পর সংস্থাটির কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। দুর্নীতির দীর্ঘ ইতিহাস থেকে বেরিয়ে এসে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন কমিটির কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য একটি নতুন প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করা হয় এবং সেখানে গাল্লাভোত্তিকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এই দায়িত্বের কারণে শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও অভিযোগসংক্রান্ত সংবেদনশীল বিষয়গুলোর কাছাকাছি চলে আসেন তিনি।
হাইতিতে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ
২০২০ সালে হাইতির ফুটবল কর্তৃপক্ষের তৎকালীন প্রধান ইভ জ্যাঁ-বার্টের বিরুদ্ধে নারী ফুটবলারদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগ সামনে আসে। এর আগে আফগানিস্তানের ফুটবল কর্তৃপক্ষের প্রধানের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছিল।
হাইতির ঘটনাটি ফিফার নৈতিকতা কমিটির আওতায় তদন্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অভিযোগকারীদের পক্ষে কাজ করা মানবাধিকারকর্মীরা দাবি করেন, ভুক্তভোগীদের অভিযোগ সামলাতে ফিফার ব্যবস্থা ছিল অপর্যাপ্ত।
মানবাধিকার সংগঠনের একজন কর্মকর্তা মিঙ্কি ওয়ার্ডেন অভিযোগ করেন, তরুণী ও কিশোরীদের বারবার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলতে হয়েছে, অথচ তাদের ও তাদের পরিবারের নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট ব্যবস্থা ছিল না।
ফিফা অবশ্য জানায়, ২০২০ সালে নৈতিকতা কমিটির তদন্তকারী শাখা হাইতির ফুটবল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তদন্ত শুরু করেছিল এবং পরবর্তী সময়ে কয়েকজনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া হয়। সেই সময় গাল্লাভোত্তি স্বাধীন কমিটিগুলোর প্রশাসনিক সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন বলে সংস্থাটি জানায়।
জ্যাঁ-বার্ট অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। ফিফা তাকে আজীবন নিষিদ্ধ করলেও পরে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সালিশ আদালত সেই নিষেধাজ্ঞা বাতিল করে।
সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
গাল্লাভোত্তির প্রভাব শুধু ফিফার অভ্যন্তরীণ প্রশাসনেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সৌদি আরবের সঙ্গে ফিফার ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক তৈরিতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বলে একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
২০২১ সালে সৌদি আরবের ফুটবল কর্মকর্তারা রোমে গিয়ে ইতালির সঙ্গে ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ যৌথভাবে আয়োজনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন। ওই বৈঠকগুলোর আয়োজন ও যোগাযোগে গাল্লাভোত্তির ভূমিকা ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
সৌদি আরব তখন ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে জোট গঠনের চেষ্টা করছিল। এশিয়ায় ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ হওয়ার কারণে মাত্র আট বছর পর আবার এশিয়ায় বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে ফিফার নিয়মগত সীমাবদ্ধতা ছিল। তাই ইউরোপ ও আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে প্রার্থী হওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
ইতালি শেষ পর্যন্ত সেই উদ্যোগে যোগ দেয়নি। সৌদি আরবের মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং মিশরের সঙ্গে ইতালির রাজনৈতিক টানাপোড়েনের বিষয়টিও এতে প্রভাব ফেলেছিল।
শেষ পর্যন্ত ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের অধিকার সৌদি আরব পায়। একই সময়ে সৌদি রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান আরামকোর সঙ্গে ফিফার বিপুল অঙ্কের পৃষ্ঠপোষকতা চুক্তিও হয়।
কাতার সংকটেও গাল্লাভোত্তির ছায়া
মধ্যপ্রাচ্যে কাতারকে ঘিরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবরোধের সময়ও গাল্লাভোত্তির নাম সামনে আসে।
সৌদি আরব ও তার মিত্ররা যখন কাতারকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছিল, তখন কাতারের ক্রীড়া সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান বেইন স্পোর্টসের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। মিশরেও প্রতিষ্ঠানটির সম্প্রচার বন্ধ করা হয়েছিল।
সেই সময় গাল্লাভোত্তির সঙ্গে মিশরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যোগাযোগ নিয়ে কাতারের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল বলে সমসাময়িক নথির বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
আফ্রিকান ফুটবলের আঞ্চলিক প্রশাসনের এক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে গাল্লাভোত্তি এমন কিছু আলোচনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন, যেখানে তার কোনো আনুষ্ঠানিক পদ ছিল না।
স্বাধীন কমিটি কি সত্যিই স্বাধীন?
২০২১ সালে ফিফার স্বাধীন কমিটিগুলোর তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব ছেড়ে গাল্লাভোত্তি সরাসরি সভাপতির কার্যালয়ে জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দেন।
এরপর থেকেই ইনফান্তিনোর রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে তার ভূমিকা আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
ফিফার সাবেক নিরীক্ষা কমিটির প্রধান ভেসেল অভিযোগ করেছেন, গাল্লাভোত্তি স্বাধীন সংস্থাগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতেন এবং বিভিন্ন শাস্তিমূলক সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতো।
তার দাবি, ইনফান্তিনোর সমর্থকদের বিরুদ্ধে শাস্তি কঠোর না করার জন্য নিয়মিত চাপ তৈরি করা হতো।
ফিফা অবশ্য এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও প্রমাণহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। সংস্থাটির বক্তব্য, স্বাধীন কমিটিগুলো তাদের দায়িত্ব স্বাধীনভাবেই পালন করে এবং ফিফার বিধি ও নিয়ম অনুসরণ করে।
বিশ্বকাপের লাল কার্ড বিতর্ক
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ চলাকালেও ফিফার সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্ন ওঠে।
যুক্তরাষ্ট্রের খেলোয়াড় ফোলারিন বালোগুনকে দেওয়া লাল কার্ড ও নিষেধাজ্ঞা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপের পর বিষয়টি ফিফার শৃঙ্খলা কমিটিতে যায়। পরে আপিলের ভিত্তিতে বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।
ঘটনাটি ফিফার সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগকে আরও জোরালো করে। সমালোচকদের মতে, ইনফান্তিনোর সময়ে তৈরি কমিটি কাঠামোকে কখনো কখনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণে ব্যবহার করা হচ্ছে—যদিও ফিফা এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
বিশ্বকাপ বিক্রির গোপন পরিকল্পনা
তবে গাল্লাভোত্তির ভূমিকা নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গোপন পরিকল্পনা প্রকাশের ঘটনায়।
বিশ্বকাপের ফাইনালের কয়েক দিন আগে ইনফান্তিনো তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের কাছে বিশ্বকাপের কিছু বাণিজ্যিক অধিকার ও সম্পদ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান বলে অভিযোগ রয়েছে।
দুই শীর্ষ ফুটবল কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, গাল্লাভোত্তি সেই পরিকল্পনার কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিউইয়র্কের একজন ক্রীড়া শিল্প বিশেষজ্ঞের কাছে ব্যক্তিগতভাবে জানান। পরে বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে আসে এবং বিশ্ব ফুটবলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
সমালোচকদের অভিযোগ, এই পরিকল্পনা বিশ্বকাপকে ক্রীড়া প্রতিযোগিতার চেয়ে আরও বেশি লাভের প্রকল্পে পরিণত করতে পারে।
এর পর থেকেই ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে ইউরোপসহ বিভিন্ন অঞ্চলে চাপ বাড়তে থাকে। যুক্তরাজ্য ও কানাডার রাজনৈতিক নেতারাও তার পদত্যাগের দাবি তুলেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তের মুখে ইনফান্তিনো
সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের ফুটবল প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে একটি আবেদন করেছে, যাতে মার্কিন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা যায়। ইউরোপীয় পক্ষের দাবি, সুইজারল্যান্ডে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য ফৌজদারি মামলার প্রস্তুতিতে এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এদিকে আগামী মার্চে ফিফা সভাপতির নির্বাচন হওয়ার কথা। ইনফান্তিনো তৃতীয় পূর্ণ মেয়াদে থাকার জন্য সমর্থন জোগাড় করছেন। ফিফার ২১১টি সদস্য সংস্থার প্রত্যেকের একটি করে ভোট রয়েছে।
সৌদি আরবের ফুটবল কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছে।
কে এই গাল্লাভোত্তি?
মারিও গাল্লাভোত্তি মূলত একজন ইতালীয় আইনজীবী। তিনি ইতালির ফুটবল প্রশাসনের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন এবং দেশটির ঐতিহ্যবাহী ক্লাব লাজিওর সমর্থক হিসেবে পরিচিত।
কিন্তু ফুটবল প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক পদ-পদবির বাইরেও তার প্রভাব বিস্তারের অভিযোগই তাকে এখন আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
একজন জ্যেষ্ঠ ইউরোপীয় ফুটবল কর্মকর্তা তাকে ইনফান্তিনোর বিশ্বব্যাপী যোগাযোগের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আরেক সাবেক ফিফা কর্মকর্তা তাকে একই সঙ্গে কঠোর ও কৌশলী সংগঠক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
অন্যদিকে ফিফা ও গাল্লাভোত্তি যৌথভাবে দাবি করেছে, ফিফার ভেতরে তার উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক কর্তৃত্ব রয়েছে—এমন দাবি সম্পূর্ণ ভুল।
তবে বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক পরিকল্পনা, সৌদি আরবের সঙ্গে ফিফার ঘনিষ্ঠতা, স্বাধীন কমিটির কার্যক্রম এবং ইনফান্তিনোর রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক—সবকিছুর সঙ্গে গাল্লাভোত্তির নাম বারবার উঠে আসায় ফুটবল প্রশাসনের ক্ষমতার নেপথ্য কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন আরও গভীর হয়েছে।
বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে প্রভাবশালী সংগঠনের সামনে এখন মূল প্রশ্ন শুধু ইনফান্তিনো কতটা শক্তিশালী, তা নয়; বরং তার চারপাশে থাকা অদৃশ্য ক্ষমতার বলয় কতটা সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে, সেটিও।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















