হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; জ্বালানি, উৎপাদন ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হয়ে বিশ্বজুড়ে শ্রমিকদের প্রকৃত আয় কমতে পারে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে এমনই চিত্র উঠে এসেছে।
বিশ্বের জ্বালানি প্রবাহে বড় ঝুঁকি
পারস্য উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সংযোগকারী হরমুজ প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের উল্লেখযোগ্য অংশ পরিবাহিত হয়। সংঘাত বা ভূরাজনৈতিক চাপের কারণে এই পথে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হলে জ্বালানির দাম বাড়ে। এতে জ্বালানিনির্ভর পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়, পাশাপাশি বৈশ্বিক চাহিদা কমে গিয়ে রপ্তানিনির্ভর শিল্পগুলোও চাপে পড়ে।
৮০ দেশের ওপর করা সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৬১টি দেশে ৯০ শতাংশের বেশি শ্রমিকের প্রকৃত আয় কমতে পারে। তবে ক্ষতির মাত্রা সব দেশে সমান নয়।
কম্বোডিয়া, ইউক্রেন ও ভিয়েতনাম সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। অন্যদিকে নাইজেরিয়া, অ্যাঙ্গোলা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রুনেই দারুসসালাম, কাজাখস্তান, নরওয়ে ও রাশিয়ার মতো তেল রপ্তানিকারক দেশ তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত। এসব দেশে প্রকৃত আয় কমার ঝুঁকিতে পড়া শ্রমিকের হার ২০ শতাংশের নিচে।
শিল্পভেদে বাড়বে বৈষম্য
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে টেক্সটাইল, কৃষি ও প্লাস্টিক শিল্পকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিপরীতে তেল উত্তোলন এমন কয়েকটি খাতের একটি, যা উচ্চ জ্বালানি মূল্যে লাভবান হতে পারে।
উচ্চ জ্বালানি মূল্য উৎপাদন ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি বৈশ্বিক চাহিদা দুর্বল করে। ফলে জ্বালানি খাতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয় এমন রপ্তানিমুখী শিল্পও ক্ষতির মুখে পড়ে। চীনের ইলেকট্রনিকস এবং কম্বোডিয়ার টেক্সটাইল শিল্প এর উদাহরণ।
একই দেশের মধ্যেও বড় ব্যবধান
কোনো দেশের সামগ্রিক জিডিপি বা গড় আয় দিয়ে এই ক্ষতির পূর্ণ চিত্র বোঝা যায় না। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত খাতের শ্রমিকদের প্রকৃত আয় গড়ে প্রায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ কমতে পারে। একই দেশের সবচেয়ে বেশি ও কম ক্ষতিগ্রস্ত খাতের মধ্যে আয় কমার ব্যবধান প্রায় ৩০ শতাংশ পয়েন্ট।
শ্রমিকরা দ্রুত সংকুচিত খাত থেকে সম্প্রসারিত খাতে যেতে না পারায় মোট কল্যাণ ক্ষতির প্রায় ১৪ শতাংশ তৈরি হয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শ্রমিকদের খাত পরিবর্তনের সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত হওয়ায় এই সমস্যা আরও প্রকট।
কৃষিতে বাড়তি চাপ
জ্বালানি-নির্ভর রাসায়নিক ও সার ব্যবহারের কারণে কৃষি খাত বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। জ্বালানির দাম বাড়লে কৃষির উৎপাদন ব্যয় দ্রুত বেড়ে যায়। ইউরোপের সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স, এস্তোনিয়া ও রোমানিয়াসহ আর্জেন্টিনা ও ইসরায়েলের কৃষিশ্রমিকরা বড় ধরনের আয়হানির মুখে পড়তে পারেন।
জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব খাদ্যদামেও পড়ে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে কৃষিপণ্যের দাম প্রায় ২ শতাংশ বাড়তে পারে, যেখানে উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে বৃদ্ধি প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। খাদ্যে আয়ের বড় অংশ ব্যয় করা পরিবারগুলোর জন্য এই সামান্য বৃদ্ধিও গুরুত্বপূর্ণ।
নীতিনির্ধারণে খাতভিত্তিক তথ্য জরুরি
বিশ্বব্যাংকের গবেষণা বলছে, শ্রমিকদের এক খাত থেকে অন্য খাতে যাওয়ার সুযোগ বাড়ানো, পুনঃপ্রশিক্ষণ, স্থানান্তরযোগ্য সুবিধা এবং নিয়োগ ও ছাঁটাইয়ের ব্যয় কমানো বৈশ্বিক বাণিজ্য ধাক্কা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ।
খাদ্য আমদানিনির্ভর দেশগুলোকে জ্বালানি মূল্য বাড়ার সময় দ্রুত ভর্তুকি বা নগদ সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা নিয়েও আগাম প্রস্তুতি নিতে হবে। একই সঙ্গে শুধু জিডিপির ওপর নির্ভর না করে খাতভিত্তিক তথ্য ব্যবহার করে নীতি নির্ধারণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের এই বিশ্লেষণটি ‘Responding to the Global Shock from the War in the Middle East’ শীর্ষক পলিসি ব্রিফের ভিত্তিতে তৈরি। গবেষণাটি ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















