চীনের শিল্প খাতের তীব্র মূল্য ও উৎপাদন প্রতিযোগিতা এখন দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে পড়ছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, সৌর প্যানেল, ব্যাটারি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-ভিত্তিক প্রযুক্তিপণ্যে চীনা কোম্পানিগুলোর দ্রুত সম্প্রসারণ যেমন রপ্তানি বাড়াচ্ছে, তেমনি তৈরি করছে অতিরিক্ত উৎপাদন, কম মুনাফা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন চাপ। চীনের এই পরিস্থিতিকে দেশটির নীতিনির্ধারকেরা ‘ইনভল্যুশন’ হিসেবে বর্ণনা করছেন।
দেশের চাহিদা দুর্বল, বিদেশে বাড়ছে নির্ভরতা
চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য বিদেশি বাজার ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। গত বছর ৩ হাজার ৭৭৫টি তালিকাভুক্ত চীনা কোম্পানির বিদেশি আয় ১২ দশমিক ৩৮ ট্রিলিয়ন ইউয়ানে পৌঁছায়, যা তাদের মোট আয়ের রেকর্ড ২২ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০১৯ সালে এই অনুপাত ছিল প্রায় ১০ শতাংশ।
২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে চীনের ‘নতুন তিন’ রপ্তানি পণ্য—সৌরকোষ, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক গাড়ির রপ্তানি ৫২ শতাংশ বেড়ে ১১৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে রোবট ভ্যাকুয়াম নির্মাতা ইকোভ্যাকসের বিদেশি বিক্রি ৪৫ শতাংশ বেড়েছে, যেখানে দেশীয় বিক্রি বেড়েছে মাত্র ২ শতাংশ। সৌর প্যানেল নির্মাতা ট্রিনা সোলারের বিদেশি আয়ও ১৬ শতাংশ বেড়েছে, যদিও অভ্যন্তরীণ বিক্রি কমেছে ৯ শতাংশ।
রপ্তানি বাড়লেও কমছে মুনাফা
চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্পে এই বৈপরীত্য সবচেয়ে স্পষ্ট। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতারা ২৩ লাখ গাড়ি রপ্তানি করেছে, যা পুরো ২০২৫ সালের ২৫ লাখ রপ্তানির কাছাকাছি। কিন্তু একই সময়ে চীনা গাড়ি নির্মাতাদের মোট মুনাফা ২০ শতাংশ কমে ১৯৫ বিলিয়ন ইউয়ানে নেমেছে। মুনাফার হার ২০১৭ সালের ৮ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৮ শতাংশ।
চীনের গাড়ি নির্মাতা জিলির কর্মকর্তারাও সতর্ক করেছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের তীব্র প্রতিযোগিতা ভবিষ্যতে বিদেশি বাজারেও ছড়িয়ে পড়বে, কারণ প্রায় সব চীনা কোম্পানিই এখন বৈশ্বিক সম্প্রসারণে যাচ্ছে।
বিদেশি বাজারে বাড়ছে মূল্যচাপ
চীনা পণ্যের প্রবাহ ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশের স্থানীয় শিল্পে মূল্যযুদ্ধ তৈরি করছে। গোল্ডম্যান স্যাকসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সাল থেকে চীনের রপ্তানি এক শতাংশ পয়েন্ট বাড়লে অন্যান্য দেশে পণ্যের দাম গড়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। যুক্তরাষ্ট্র বাদে প্রধান উন্নত অর্থনীতিগুলোতে এখন পর্যন্ত এই প্রবণতায় গড়ে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ মূল্যচাপ তৈরি হয়েছে।
ব্রাজিলে চীনা গাড়ির প্রবেশের কারণে জুনে হালকা যানবাহনের গড় দাম আগের বছরের তুলনায় ৩ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। স্থানীয় শিল্প সুরক্ষায় দেশটি বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ির আমদানি শুল্ক ৩৫ শতাংশের সর্বোচ্চ সীমায় তুলেছে।
জার্মানিতেও উদ্বেগ তীব্র। একটি গবেষণা অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশটির উৎপাদন খাতে হারানো ৫ লাখ ২০ হাজার চাকরির মধ্যে প্রায় ৪ লাখের সঙ্গে চীনা প্রতিযোগিতার সম্পর্ক রয়েছে। জার্মান কর্মকর্তারা চীনের অতিরিক্ত উৎপাদন, সরকারি ভর্তুকি ও বাণিজ্যনীতির সমালোচনা করে আরও কঠোর অবস্থানের আহ্বান জানিয়েছেন।
‘ইনভল্যুশন’ ঠেকাতে চীনের উদ্যোগ
চীনের সরকার দুই বছর আগে ‘অ্যান্টি-ইনভল্যুশন’ অভিযান শুরু করলেও স্থানীয় সরকারগুলো কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশীয় প্রযুক্তি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। ফলে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা কমানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে চীনের সরকারি সংবাদমাধ্যমও সতর্ক করেছে, দেশের নিম্নমূল্যের প্রতিযোগিতা যদি বিদেশি বাজারে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে চীনা কোম্পানির মুনাফা কমার পাশাপাশি বাণিজ্য সংঘাত ও ‘মেড ইন চায়না’ ব্র্যান্ডের ভাবমূর্তির ক্ষতি হতে পারে।
স্থানীয় উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে চীনা কোম্পানি
বাণিজ্যিক চাপ কমাতে চীনা গাড়ি নির্মাতারা ইউরোপে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। জিলি, চেরি, লিপমোটর ও ডংফেং ইউরোপের কারখানায় কিছু মডেল উৎপাদনের পরিকল্পনা করেছে। বিওয়াইডিও একই ধরনের উদ্যোগ বিবেচনা করছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-ভিত্তিক গাড়ির যন্ত্রাংশ নির্মাতা অটোলিংকও রোমানিয়ায় উৎপাদন ও গবেষণা উন্নয়ন কেন্দ্র গড়তে চায়। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ইয়াং হংজে মনে করেন, শুধু রপ্তানি নয়, জাপানের জন্য জাপানে, ইউরোপের জন্য ইউরোপে এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলাই ভবিষ্যতের পথ।
চীনের অতিপ্রতিযোগিতা এখন তাই শুধু দেশটির শিল্পনীতির বিষয় নয়; এটি বৈশ্বিক মূল্য, কর্মসংস্থান, স্থানীয় উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতির ওপরও ক্রমবর্ধমান প্রভাব ফেলছে।
চীনের অতিপ্রতিযোগিতা বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম কমালেও কমছে কোম্পানিগুলোর মুনাফা, বাড়ছে স্থানীয় শিল্প সুরক্ষার চাপ এবং নতুন বাণিজ্য সংঘাতের আশঙ্কা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















