যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তেহরানের সঙ্গে কোনো আলোচনা চলছে না—এমন কঠোর বক্তব্য প্রকাশ্যে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যেই নতুন করে ৬০ দিনের একটি সুযোগ তৈরির যে উদ্যোগের কথা শোনা যাচ্ছে, তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের আওতায় নির্ধারিত আগের সময়সীমা ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। দুই দেশের প্রকাশ্য বক্তব্যও ক্রমেই তিক্ত হয়ে উঠেছে। নিষেধাজ্ঞা, নৌপথের নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্ব নিয়ে পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে যুদ্ধের রাজনৈতিক সমাধানের পরিসরও সংকুচিত হয়েছে। তারপরও আলোচনার ক্ষেত্রে যে কাঠামোর দিকে সংশ্লিষ্ট পক্ষ ও নতুন মধ্যস্থতাকারীরা বারবার ফিরে আসছেন, সেটির সঙ্গে পাকিস্তানের নাম জড়িয়ে আছে।
পাকিস্তানের স্বাধীন কূটনৈতিক অবস্থান
ইরানের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের অবস্থান নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তর যথার্থভাবেই এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে যে ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির যুক্তরাষ্ট্রের দূত হিসেবে তেহরান সফর করেছেন।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের গুরুত্ব তৈরি হয়েছে মূলত নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান, জাতীয় স্বার্থ ও নিজস্ব বিচারবোধ বজায় রাখার কারণে। ইরানের নেতৃত্বের সঙ্গে আসিম মুনিরের বৈঠক পাকিস্তানের নিজস্ব কূটনৈতিক উদ্যোগের অংশ হিসেবেই অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব আলোচনার মূল লক্ষ্য ছিল উত্তেজনা কমানো এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজে বের করা।
এই স্বাধীন অবস্থানই পাকিস্তানকে এমন কিছু সুযোগ দিয়েছে, যা সরাসরি কোনো পক্ষের হয়ে কাজ করা একজন দূতের পক্ষে পাওয়া কঠিন। একই প্রশ্ন কাতারের তেহরান সফরের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মধ্যস্থতার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে কাতারের উদ্যোগকে কি একই ধরনের রাজনৈতিক অর্থে দেখা হবে?
সমুদ্রপথে নিরাপত্তা হতে পারে আস্থার প্রথম ধাপ
কার্যকর শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য একাধিক পথ খোলা রাখা জরুরি। কাতারের পক্ষ থেকে সাময়িক নৌ চলাচলের করিডর এবং সমুদ্রপথ থেকে মাইন অপসারণের মতো বিষয় নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ সেই বাস্তবধর্মী প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দেয়, যা বড় কোনো কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে শুধু কথার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব অগ্রগতির দিকে নিতে পারে।
এ ধরনের উদ্যোগকে ইসলামাবাদ কাঠামোর বাইরে আলাদা করে দেখার পরিবর্তে তারই অংশ করা উচিত। সীমিত পরিসরে নিরাপদ নৌ চলাচলের ব্যবস্থা দুই পক্ষের পারস্পরিক সদিচ্ছার প্রাথমিক প্রমাণ হিসেবে কাজ করতে পারে।
অবশ্যই এমন কোনো ব্যবস্থা পুরো সংঘাতের সমাধান করবে না। এটিকে সেভাবে উপস্থাপন করাও ঠিক হবে না। বরং এর প্রকৃত গুরুত্ব হলো—সুনির্দিষ্ট ও পরিমিত কিছু ছাড় দেওয়া সম্ভব, অথচ তাতে যুক্তরাষ্ট্র বা ইরানকে তাদের মৌলিক অবস্থান থেকে সরে এসেছে বলে মনে হবে না—এমন একটি বাস্তব উদাহরণ তৈরি করা।
পাকিস্তানের সামনে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক দায়িত্ব
ধৈর্য ও কৌশলগত বিচক্ষণতার সঙ্গে পাকিস্তান তার কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করে আসছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি পাকিস্তানের জন্য সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে দেশটির অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, আঞ্চলিক অংশীদারত্ব এবং নিজস্ব নিরাপত্তার বিষয়ও জড়িত।
তবে পাকিস্তানের অর্জনের গুরুত্ব শুধু নিজেদের স্বার্থের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যখন সামরিক শক্তি প্রদর্শন ও কঠোর হুমকি আন্তর্জাতিক সংবাদে প্রাধান্য পাচ্ছে, তখন সংঘাত নিরসনের ক্ষেত্রে টিকে থাকা সবচেয়ে কার্যকর কূটনৈতিক কাঠামোটির সঙ্গে ইসলামাবাদের নামই যুক্ত রয়েছে।
তাই পাকিস্তানের উচিত এই কূটনৈতিক অর্জনকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সংরক্ষণ করা। সংঘাত অবসানের প্রতিটি আন্তরিক উদ্যোগ যেন পাকিস্তানের তৈরি করা প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে না যায়, বরং সেটিকে আরও শক্তিশালী করে—ইসলামাবাদের এখন সেই বিষয়েই জোর দেওয়া প্রয়োজন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















