০৮:০২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত নিয়ে জাপানের করণীয়: শুধু ওয়াশিংটনের বিরোধিতা যথেষ্ট নয় শোকের মাসের শেষ দিন: এবার বাঙালির বঙ্গবন্ধু এসেছিলেন সাধারণের প্রাণে প্রাণে হাসিনা ফ্যাক্টর নয়, আসল ঝুঁকি বিদ্যুৎ-গ্যাসে চীন, পাকিস্তান ও আমেরিকার অভিজ্ঞতা ভারতের জন্য যে সতর্কবার্তা ‘ছয় মাস চলে গেল, আর কয় মাস লাগবে?’ সাইপ্রাস উপকূলে ২৬৭ আরোহী নিয়ে ফেরি ডুবি, নিহত ৭; নিখোঁজ ২৩ জাতিসংঘে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে অতিরিক্ত দায়িত্ব পেলেন হুমায়ুন কবির রুমিন ফারহানার ‘হাঁস’ খেয়ে ফেলার হুঁশিয়ারি সারোয়ার তুষারের কিশোরগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৩, আহত ৩ বৈশ্বিক রাজনীতিতে ভারতের প্রাসঙ্গিকতা কি কমছে?

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত নিয়ে জাপানের করণীয়: শুধু ওয়াশিংটনের বিরোধিতা যথেষ্ট নয়

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসির প্রেসিডেন্ট তোমোকো আকানেসহ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত জাপানের জন্য একটি জটিল কূটনৈতিক ও নীতিগত পরীক্ষার সৃষ্টি করেছে। ১৮ আগস্ট ওয়াশিংটন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেওয়ার পর ২৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেন, এই পদক্ষেপ জাপানের অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং টোকিও বিষয়টি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে দেখছে। একই সঙ্গে তিনি সরকারের অবস্থানকে ‘দুর্বল’ বলে যে সমালোচনা করা হচ্ছে, তা প্রত্যাখ্যান করেন।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও অবশ্য আইসিসির বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, আদালতটি দুর্নীতিগ্রস্ত, অতিমাত্রায় রাজনৈতিক এবং নিজের ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছে। বিপরীতে জাপানের প্রধান সংবাদপত্রগুলো প্রায় একযোগে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করেছে। তাদের অনেকের মতে, আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা রক্ষায় টোকিওর আরও দৃঢ় অবস্থান নেওয়া উচিত।

কিন্তু বিতর্কটিকে শুধু ‘জাপান কি যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে নতি স্বীকার করছে?’—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ রাখলে সমস্যাটির গুরুত্বপূর্ণ দিকটি আড়ালে পড়ে যায়। আসল প্রশ্ন আরও গভীর: এমন এক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায়, যেখানে আইনের প্রয়োগ এখনো রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল, আইসিসি কীভাবে নিজের বৈধতা, কার্যকারিতা ও গ্রহণযোগ্যতা শক্তিশালী করবে?

জাপানের সংবাদমাধ্যমে যে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে

জাপানের প্রভাবশালী সংবাদপত্রগুলোর সম্পাদকীয় অবস্থান ছিল প্রায় অভিন্ন। আসাহি শিম্বুন জাপানকে অন্যান্য দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি তোলার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে তারা সতর্ক করেছে, যুক্তরাষ্ট্র-জাপান জোটের প্রতি অতিরিক্ত বিবেচনা যেন টোকিওর অবস্থান নির্ধারণে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়।

মাইনিচি শিম্বুনও সরকারের প্রতি সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রতিবাদ জানানোর আহ্বান জানিয়েছে। তাদের বিশ্লেষণে, ঘটনাটি এমন একটি পররাষ্ট্রনীতির সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে, যেখানে ওয়াশিংটনের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা কখনো কখনো জাপানের নিজস্ব নীতিগত অবস্থানকে সংকুচিত করে।

ইয়োমিউরি শিম্বুন মার্কিন চাপকে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে দেখেছে এবং প্রশ্ন তুলেছে, আইনের শাসন এবং আন্তর্জাতিক দায়িত্ব পালনরত একজন জাপানি নাগরিককে রক্ষা করতে সরকার যথেষ্ট দৃঢ়তা দেখিয়েছে কি না। নিক্কেইও আইসিসির প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এমনকি রক্ষণশীল হিসেবে পরিচিত সানকেই শিম্বুনও মনে করেছে, আদালতটি ভেঙে দেওয়ার পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

এই সমালোচনার অনেকটাই যৌক্তিক। একটি আন্তর্জাতিক আদালতের কর্মকর্তাদের শাস্তির আওতায় আনার মাধ্যমে তার স্বাধীনতাকে চাপে ফেলার চেষ্টা আন্তর্জাতিক আইনের জন্য উদ্বেগজনক নজির তৈরি করতে পারে। কিন্তু এখানেই বিতর্ক শেষ হওয়া উচিত নয়।

আন্তর্জাতিক আইনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা

দেশের ভেতরে আইনের শাসন কার্যকর রাখার জন্য আদালতের পাশাপাশি পুলিশ, প্রশাসন এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থাকে। কোনো আদালতের রায় কার্যকর করার জন্য একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় কাঠামো কাজ করে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এমন কোনো সর্বজনীন ও কেন্দ্রীয় প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ নেই।

আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতার ওপর নির্ভর করতে হয়। কোনো রাষ্ট্র যদি কোনো আন্তর্জাতিক আদালতের কর্তৃত্ব প্রত্যাখ্যান করে, তখন সেই আদালতের হাতে তার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত হয়ে যেতে পারে।

এই বাস্তবতা আন্তর্জাতিক আইনের জন্য একটি মৌলিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। শুধু আইনগতভাবে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের সুযোগ থাকা যথেষ্ট নয়; সেটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা বাড়াবে নাকি কমাবে—সেটিও বিবেচনায় নিতে হয়।

এ কারণেই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের দায়িত্ব অনেক বেশি কঠিন। তাদের একদিকে প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হয়, অন্যদিকে এমন সিদ্ধান্তও নিতে হয় যাতে প্রতিষ্ঠানটির বৈধতা ও কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।Sanctioned ICC president asked Japan to help de-escalate US tensions

আইসিসির ক্ষেত্রে এই দ্বন্দ্ব আরও তীব্র

আইসিসির অবস্থানকে বোঝার জন্য এর সদস্যপদ ও এখতিয়ারের বাস্তবতা বিবেচনা করা জরুরি। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মতো বড় শক্তিগুলো রোম সংবিধির পক্ষভুক্ত নয়। ইসরায়েলও এতে স্বাক্ষর করলেও অনুমোদন দেয়নি। তারপরও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সদস্য নয় এমন রাষ্ট্রের নাগরিকদের বিরুদ্ধে আইসিসির এখতিয়ার কার্যকর হতে পারে—বিশেষ করে অভিযোগকৃত অপরাধ কোনো সদস্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে সংঘটিত হলে বা সংবিধির অন্য কোনো বিধানের মাধ্যমে এখতিয়ার প্রতিষ্ঠিত হলে।

আইনগত ভিত্তি থাকা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা উপেক্ষা করা—এই দুটি বিষয় এক নয়। কোনো রাষ্ট্র আইসিসির কর্তৃত্ব স্বীকার না করলেও আদালত তার শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি সুযোগ পেতে পারে। কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে আদালতের দীর্ঘমেয়াদি গ্রহণযোগ্যতা ও কার্যকারিতার প্রশ্নও যুক্ত থাকে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য করা দরকার। আইসিসির কোনো সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক পরিণতি বিবেচনা করা মানে আদালতের স্বাধীনতা বিসর্জন দেওয়া নয়। একইভাবে আদালতের কোনো সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা মানেই যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করাও নয়।

বরং আন্তর্জাতিক আইনের সীমাবদ্ধতাই এমন ভারসাম্যের প্রয়োজন তৈরি করে।

জাপানের ভূমিকা শুধু প্রতিরক্ষামূলক হওয়া উচিত নয়

প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে জাপান তার উদ্বেগ ‘সীমার শেষ পর্যন্ত’ তুলে ধরেছে। আকানেকে ঘিরে তৈরি পরিস্থিতি নিয়ে টোকিও যে উদ্বিগ্ন, সেটিও তিনি স্পষ্ট করেছেন।

জাপানের আইসিসিকে সমর্থন করা উচিত। একইভাবে একজন জাপানি নাগরিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে তার স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের অধিকার রক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সমর্থনকে এমন পর্যায়ে নেওয়া ঠিক হবে না, যেখানে আদালতটির কার্যক্রম নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলাকেই প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতা হিসেবে দেখা হয়।

বরং আইসিসির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমর্থক হিসেবে জাপানের দায়িত্ব আরও বড়। টোকিওর উচিত আদালতকে এমন নীতি ও কৌশল অনুসরণে উৎসাহিত করা, যা একই সঙ্গে আইনগতভাবে দৃঢ়, বাস্তবসম্মত এবং দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর। আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা কেবল নীতিগত ঘোষণা দিয়ে তৈরি হয় না; সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা, এখতিয়ারের যথাযথ ব্যবহার এবং বাস্তব ফলাফলের মাধ্যমেও তা অর্জন করতে হয়।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে হোকুরিকু অঞ্চলের একটি আঞ্চলিক সংবাদপত্র হোককোকু শিম্বুনের অবস্থান বিশেষভাবে বিবেচনাযোগ্য। তারা আকানের ওপর বাইরের চাপের সমালোচনা করলেও মনে করিয়ে দিয়েছে, আইসিসি অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মতো সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। জাপানের উচিত আদালটিকে সমর্থন করার পাশাপাশি তার কার্যকারিতা ও কর্মকাণ্ডও নিয়মিতভাবে মূল্যায়ন করা।

এটাই সম্ভবত জাপানের জন্য সবচেয়ে দায়িত্বশীল পথ।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করা প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু জাপানের নীতি সেখানেই থেমে থাকা উচিত নয়। আন্তর্জাতিক আইনকে শক্তিশালী করতে হলে এমন প্রতিষ্ঠান দরকার, যাদের স্বাধীনতা যেমন থাকবে, তেমনি থাকবে আত্মসমালোচনা, বাস্তবতার বোধ এবং নিজেদের বৈধতা রক্ষার সক্ষমতা।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আইন ও ক্ষমতাকে পুরোপুরি আলাদা করা সম্ভব নয়। আইসিসির সামনে তাই চ্যালেঞ্জ শুধু ওয়াশিংটনের চাপ মোকাবিলা করা নয়। আরও বড় চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি বিচারব্যবস্থা হিসেবে টিকে থাকা, যার সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক আইনের নৈতিক কর্তৃত্ব বাড়ায় এবং একই সঙ্গে বাস্তব পৃথিবীতে তার কার্যকারিতাও নিশ্চিত করার সম্ভাবনা তৈরি করে।

জাপানের উচিত সেই বৃহত্তর লক্ষ্যটিকেই সামনে রাখা। কারণ আইসিসিকে রক্ষা করার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো এমন একটি আন্তর্জাতিক আইনব্যবস্থাকে কার্যকর রাখা, যেখানে ক্ষমতাবান রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যেও আইনের শাসনের জন্য জায়গা তৈরি করা সম্ভব।

লেখক: কুনি মিয়াকে, সাবেক জাপানি কূটনীতিক ও ফরেন পলিসি ইনস্টিটিউটের সভাপতি।

জনপ্রিয় সংবাদ

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত নিয়ে জাপানের করণীয়: শুধু ওয়াশিংটনের বিরোধিতা যথেষ্ট নয়

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত নিয়ে জাপানের করণীয়: শুধু ওয়াশিংটনের বিরোধিতা যথেষ্ট নয়

০৮:০০:৩০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসির প্রেসিডেন্ট তোমোকো আকানেসহ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত জাপানের জন্য একটি জটিল কূটনৈতিক ও নীতিগত পরীক্ষার সৃষ্টি করেছে। ১৮ আগস্ট ওয়াশিংটন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেওয়ার পর ২৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেন, এই পদক্ষেপ জাপানের অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং টোকিও বিষয়টি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে দেখছে। একই সঙ্গে তিনি সরকারের অবস্থানকে ‘দুর্বল’ বলে যে সমালোচনা করা হচ্ছে, তা প্রত্যাখ্যান করেন।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও অবশ্য আইসিসির বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, আদালতটি দুর্নীতিগ্রস্ত, অতিমাত্রায় রাজনৈতিক এবং নিজের ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছে। বিপরীতে জাপানের প্রধান সংবাদপত্রগুলো প্রায় একযোগে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করেছে। তাদের অনেকের মতে, আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা রক্ষায় টোকিওর আরও দৃঢ় অবস্থান নেওয়া উচিত।

কিন্তু বিতর্কটিকে শুধু ‘জাপান কি যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে নতি স্বীকার করছে?’—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ রাখলে সমস্যাটির গুরুত্বপূর্ণ দিকটি আড়ালে পড়ে যায়। আসল প্রশ্ন আরও গভীর: এমন এক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায়, যেখানে আইনের প্রয়োগ এখনো রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল, আইসিসি কীভাবে নিজের বৈধতা, কার্যকারিতা ও গ্রহণযোগ্যতা শক্তিশালী করবে?

জাপানের সংবাদমাধ্যমে যে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে

জাপানের প্রভাবশালী সংবাদপত্রগুলোর সম্পাদকীয় অবস্থান ছিল প্রায় অভিন্ন। আসাহি শিম্বুন জাপানকে অন্যান্য দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি তোলার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে তারা সতর্ক করেছে, যুক্তরাষ্ট্র-জাপান জোটের প্রতি অতিরিক্ত বিবেচনা যেন টোকিওর অবস্থান নির্ধারণে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়।

মাইনিচি শিম্বুনও সরকারের প্রতি সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রতিবাদ জানানোর আহ্বান জানিয়েছে। তাদের বিশ্লেষণে, ঘটনাটি এমন একটি পররাষ্ট্রনীতির সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে, যেখানে ওয়াশিংটনের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা কখনো কখনো জাপানের নিজস্ব নীতিগত অবস্থানকে সংকুচিত করে।

ইয়োমিউরি শিম্বুন মার্কিন চাপকে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে দেখেছে এবং প্রশ্ন তুলেছে, আইনের শাসন এবং আন্তর্জাতিক দায়িত্ব পালনরত একজন জাপানি নাগরিককে রক্ষা করতে সরকার যথেষ্ট দৃঢ়তা দেখিয়েছে কি না। নিক্কেইও আইসিসির প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এমনকি রক্ষণশীল হিসেবে পরিচিত সানকেই শিম্বুনও মনে করেছে, আদালতটি ভেঙে দেওয়ার পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

এই সমালোচনার অনেকটাই যৌক্তিক। একটি আন্তর্জাতিক আদালতের কর্মকর্তাদের শাস্তির আওতায় আনার মাধ্যমে তার স্বাধীনতাকে চাপে ফেলার চেষ্টা আন্তর্জাতিক আইনের জন্য উদ্বেগজনক নজির তৈরি করতে পারে। কিন্তু এখানেই বিতর্ক শেষ হওয়া উচিত নয়।

আন্তর্জাতিক আইনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা

দেশের ভেতরে আইনের শাসন কার্যকর রাখার জন্য আদালতের পাশাপাশি পুলিশ, প্রশাসন এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থাকে। কোনো আদালতের রায় কার্যকর করার জন্য একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় কাঠামো কাজ করে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এমন কোনো সর্বজনীন ও কেন্দ্রীয় প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ নেই।

আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতার ওপর নির্ভর করতে হয়। কোনো রাষ্ট্র যদি কোনো আন্তর্জাতিক আদালতের কর্তৃত্ব প্রত্যাখ্যান করে, তখন সেই আদালতের হাতে তার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত হয়ে যেতে পারে।

এই বাস্তবতা আন্তর্জাতিক আইনের জন্য একটি মৌলিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। শুধু আইনগতভাবে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের সুযোগ থাকা যথেষ্ট নয়; সেটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা বাড়াবে নাকি কমাবে—সেটিও বিবেচনায় নিতে হয়।

এ কারণেই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের দায়িত্ব অনেক বেশি কঠিন। তাদের একদিকে প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হয়, অন্যদিকে এমন সিদ্ধান্তও নিতে হয় যাতে প্রতিষ্ঠানটির বৈধতা ও কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।Sanctioned ICC president asked Japan to help de-escalate US tensions

আইসিসির ক্ষেত্রে এই দ্বন্দ্ব আরও তীব্র

আইসিসির অবস্থানকে বোঝার জন্য এর সদস্যপদ ও এখতিয়ারের বাস্তবতা বিবেচনা করা জরুরি। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মতো বড় শক্তিগুলো রোম সংবিধির পক্ষভুক্ত নয়। ইসরায়েলও এতে স্বাক্ষর করলেও অনুমোদন দেয়নি। তারপরও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সদস্য নয় এমন রাষ্ট্রের নাগরিকদের বিরুদ্ধে আইসিসির এখতিয়ার কার্যকর হতে পারে—বিশেষ করে অভিযোগকৃত অপরাধ কোনো সদস্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে সংঘটিত হলে বা সংবিধির অন্য কোনো বিধানের মাধ্যমে এখতিয়ার প্রতিষ্ঠিত হলে।

আইনগত ভিত্তি থাকা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা উপেক্ষা করা—এই দুটি বিষয় এক নয়। কোনো রাষ্ট্র আইসিসির কর্তৃত্ব স্বীকার না করলেও আদালত তার শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি সুযোগ পেতে পারে। কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে আদালতের দীর্ঘমেয়াদি গ্রহণযোগ্যতা ও কার্যকারিতার প্রশ্নও যুক্ত থাকে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য করা দরকার। আইসিসির কোনো সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক পরিণতি বিবেচনা করা মানে আদালতের স্বাধীনতা বিসর্জন দেওয়া নয়। একইভাবে আদালতের কোনো সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা মানেই যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করাও নয়।

বরং আন্তর্জাতিক আইনের সীমাবদ্ধতাই এমন ভারসাম্যের প্রয়োজন তৈরি করে।

জাপানের ভূমিকা শুধু প্রতিরক্ষামূলক হওয়া উচিত নয়

প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে জাপান তার উদ্বেগ ‘সীমার শেষ পর্যন্ত’ তুলে ধরেছে। আকানেকে ঘিরে তৈরি পরিস্থিতি নিয়ে টোকিও যে উদ্বিগ্ন, সেটিও তিনি স্পষ্ট করেছেন।

জাপানের আইসিসিকে সমর্থন করা উচিত। একইভাবে একজন জাপানি নাগরিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে তার স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের অধিকার রক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সমর্থনকে এমন পর্যায়ে নেওয়া ঠিক হবে না, যেখানে আদালতটির কার্যক্রম নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলাকেই প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতা হিসেবে দেখা হয়।

বরং আইসিসির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমর্থক হিসেবে জাপানের দায়িত্ব আরও বড়। টোকিওর উচিত আদালতকে এমন নীতি ও কৌশল অনুসরণে উৎসাহিত করা, যা একই সঙ্গে আইনগতভাবে দৃঢ়, বাস্তবসম্মত এবং দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর। আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা কেবল নীতিগত ঘোষণা দিয়ে তৈরি হয় না; সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা, এখতিয়ারের যথাযথ ব্যবহার এবং বাস্তব ফলাফলের মাধ্যমেও তা অর্জন করতে হয়।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে হোকুরিকু অঞ্চলের একটি আঞ্চলিক সংবাদপত্র হোককোকু শিম্বুনের অবস্থান বিশেষভাবে বিবেচনাযোগ্য। তারা আকানের ওপর বাইরের চাপের সমালোচনা করলেও মনে করিয়ে দিয়েছে, আইসিসি অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মতো সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। জাপানের উচিত আদালটিকে সমর্থন করার পাশাপাশি তার কার্যকারিতা ও কর্মকাণ্ডও নিয়মিতভাবে মূল্যায়ন করা।

এটাই সম্ভবত জাপানের জন্য সবচেয়ে দায়িত্বশীল পথ।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করা প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু জাপানের নীতি সেখানেই থেমে থাকা উচিত নয়। আন্তর্জাতিক আইনকে শক্তিশালী করতে হলে এমন প্রতিষ্ঠান দরকার, যাদের স্বাধীনতা যেমন থাকবে, তেমনি থাকবে আত্মসমালোচনা, বাস্তবতার বোধ এবং নিজেদের বৈধতা রক্ষার সক্ষমতা।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আইন ও ক্ষমতাকে পুরোপুরি আলাদা করা সম্ভব নয়। আইসিসির সামনে তাই চ্যালেঞ্জ শুধু ওয়াশিংটনের চাপ মোকাবিলা করা নয়। আরও বড় চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি বিচারব্যবস্থা হিসেবে টিকে থাকা, যার সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক আইনের নৈতিক কর্তৃত্ব বাড়ায় এবং একই সঙ্গে বাস্তব পৃথিবীতে তার কার্যকারিতাও নিশ্চিত করার সম্ভাবনা তৈরি করে।

জাপানের উচিত সেই বৃহত্তর লক্ষ্যটিকেই সামনে রাখা। কারণ আইসিসিকে রক্ষা করার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো এমন একটি আন্তর্জাতিক আইনব্যবস্থাকে কার্যকর রাখা, যেখানে ক্ষমতাবান রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যেও আইনের শাসনের জন্য জায়গা তৈরি করা সম্ভব।

লেখক: কুনি মিয়াকে, সাবেক জাপানি কূটনীতিক ও ফরেন পলিসি ইনস্টিটিউটের সভাপতি।