আর মাত্র কয়েক ঘন্টা পরেই বাঙালি জাতির জাতীয় শোকের মাস আগস্ট শেষ হবে। এবারের এই শোকের মাস সরকারিভাবে পালন যেমন হয়নি, তেমনি প্রকাশ্যে কাউকে পালন করতেও দেওয়া হয়নি। এমনকি বাঙালি জাতি-রাষ্ট্রের স্রষ্টা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি তৈরির মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সেই কালো দিবস ১৫ আগস্টও পালন করতে দেওয়া হয়নি।
ইতিহাস বলে, শিয়া মুসলিম ধর্মীয় মতাদর্শের মানুষদের একসময় দীর্ঘদিন শোকের দিবস ১০ মহররম পালন করতে দেওয়া হয়নি। এমনকি মহররম মাসকে তারা শোকের মাস হিসেবে পালন করতে পারত না সব জায়গাতেই।
বাঙালিও কিন্তু ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পরে দীর্ঘদিন প্রকাশ্যে বাঙালি জাতি-রাষ্ট্র ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ রক্ষার ভূমি-স্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নিহত হওয়ার এই শোকাবহ দিনটি প্রকাশ্যে পালন করতে পারেনি।
কিন্তু একটি অদ্ভুত বিষয়, ওই সময়ে, ওই দুর্দিনেও এই সিংহপুরুষকে কখনই মৃত মানুষ মনে হয়নি। বরং মৃত্যুর ভেতর দিয়ে তিনি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন। ১৯৭০-এর নির্বাচনে, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে অনেককে তাঁর বিরোধিতা করতে দেখেছি। তাদের ভেতর যারা নরপিশাচ, তারা ছাড়া ভদ্রলোকদের বলতে শুনেছি, শেখ মুজিবকে কোনো মানুষ এভাবে হত্যা করতে পারে না। এমনকি জাতির জীবনে, রাষ্ট্রীয় জীবনে তাঁর আসন নিয়ে কোনো ভদ্রলোক বা মানুষকে কখনও তাঁকে ছোট করার চেষ্টা করতে ওই সময়েও দেখিনি। তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সবুর খান, শাহ আজিজ প্রমুখ। ওই সময়ের পত্রপত্রিকায়, এমনকি ১৯৭৯-এর পার্লামেন্টেও বঙ্গবন্ধু মুজিবকে নিয়ে এমন বক্তব্য দেওয়া হয়েছিল—আজ তোমরা যারা তাঁকে ছোট করতে চাচ্ছ, তোমরা কেউই তাঁর সমালোচনা করার যোগ্য নও।
আর ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পরে ওই কালো সময়ে দেখেছি, মৃত মুজিব কীভাবে ধীরে ধীরে জীবিত মুজিবের চেয়ে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘকায় হয়ে উঠলেন। এমনকি বাঙালির আর কোনো নেতাকে নিয়ে এত কবিতা, এত গল্প-উপন্যাস, এত ছবি আঁকা হয়নি। গ্রামে গ্রামে, বাজারেও তাঁকে নিয়ে পুথি লেখকদের পুথি পড়তে শুনেছি। শুনেছি ট্রেনে, বাসে, লঞ্চে।

আর এগুলো সবই ইতিহাসের স্বাভাবিক বিষয়। কারণ, মহাকাব্য কখনই একজন লেখেন না। মহাকাব্যিক জীবন ও ঘটনাকে ঘিরে যে অযুত-নিযুত লেখা হয়—তাই হাজার হাজার বছর ধরে একত্রিত হয়ে সৃষ্টি হয় মহাকাব্য। বাঙালির জাগরণ, বাঙালির মুক্তিসংগ্রাম, বাঙালি জাতির বীরত্বের প্রতীক শেখ মুজিবুর রহমানকে ঘিরে সেটাই গড়ে উঠছে। আর হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে উঠবে। তখন ইতিহাসের সমস্ত কালো বিড়ালগুলো মারা যাবে, সমস্ত অন্ধকার ছড়ানো কীটগুলো হারিয়ে যাবে—বিবর্তনের স্বাভাবিক নিয়মে। তখন বাঙালি জাতির পরিচয় ও আলো হিসেবে থাকবেন শেখ মুজিবুর রহমান।
কারণ, শেখ মুজিবুর রহমান কোনো সাধারণ রাজনীতিক নন। সাধারণ রাজনীতিক হলে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতেন ১৯৭০-এর নির্বাচনে বিজয়ের পরে। শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন মূলত একটি জাতির সংস্কৃতি রক্ষার জন্য, সোজা কথায়, বাঙালি সংস্কৃতি রক্ষার জন্য বাঙালির একটি নিজস্ব ভূমির স্রষ্টা।

আর বাঙালির আন্দোলনটা যে ষাটের দশক থেকে বাঙালি সংস্কৃতি রক্ষা এবং সেই লক্ষ্যেই এই স্বাধীন ভূমি সৃষ্টির পক্ষে ছিল, তা শত্রুরাই প্রথম বুঝেছিল। যে কারণে, যার হাত ধরে বাঙালির আধুনিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে, যাকে শেখ মুজিব তাঁর আদর্শে ও চেতনায় ধারণ করতেন—সেই রবীন্দ্রনাথের ওপর প্রথম আঘাত করে বাঙালি সংস্কৃতিবিরোধী পাকিস্তান সরকার। এবং বাঙালি সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার জন্যই তারা তথাকথিত ৪০ জন কবি, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী দিয়ে এই ভূখণ্ডে রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করার জন্য বিবৃতি দেওয়ায়। বাঙালি সেদিন ওই ৪০ জনকে ‘চল্লিশ চোর’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। কিন্তু ইতিহাস শেষ বিচারে এই ৪০ জনকেই বাঙালির ভেতরে জন্ম নেওয়া প্রথম ‘রাজাকার’ হিসেবে চিহ্নিত করে রেখেছে।

কিন্তু সেদিন প্রকৃত বাঙালি কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীরা সকল রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে বাঙালি সংস্কৃতির মননের আধার রবীন্দ্রনাথকে আঁকড়ে ধরেছিলেন, তাঁর জন্য এক ধরনের যুদ্ধ করেছিলেন। যে কারণে মননে ও চেতনায় আজ এই বাংলাদেশেই রবীন্দ্রনাথ প্রকৃত অর্থে বেঁচে আছেন। অন্য বাংলাভাষী ভূখণ্ডে তিনি পূর্ণেন্দু পত্রীর ভাষায় ‘পূজার ঠাকুর’ রবীন্দ্রনাথ।
আর এই বাংলাদেশে তিনি দুঃসময়ে, তিনি মুক্তিযুদ্ধে, তিনি আরও ঘোর অন্ধকার সময় পাড়ি দেওয়ার এক মনন।
ঠিক তেমনি ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর থেকে যখনই অন্ধকার নামে, তখনই সৈয়দ শামসুল হকের ভাষায়—নুরুলদিনের মুখ দিয়ে নিঃসৃত বাক্য, ‘মাটি হতে জন্ম নেয় আবার শরীর।’
বাস্তবে যখনই অন্ধকার নামে, তখনই মাটি হতে আবার জন্ম নেয় দীর্ঘ থেকে আরও দীর্ঘকায় হয়ে শেখ মুজিবুর রহমান। যতবার, যতভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়—ততবারই মৃত মুজিব, জীবিত মুজিবের চেয়ে আরও দীর্ঘকায় হয়ে সামনে এসে দাঁড়ান। সাহস হয়ে দাঁড়ান, ভালোবাসা শেখাতে দাঁড়ান—আর ছড়িয়ে পড়েন আপন শক্তিতে।

এবার তাঁকে হত্যা করার চেষ্টা হয়েছে—শুধু তাঁর স্মৃতিবিজড়িত বলে নয়, বাঙালির সংস্কৃতি রক্ষার ভূমি সৃষ্টির ইতিহাসের সুতিকাগার বা স্মারক ৩২ নম্বর বাড়িটি ভেঙে। অথচ একটি ভাঙা বাড়ি কী বিশাল শক্তিশালী। রাষ্ট্রশক্তি ও বাঙালি সংস্কৃতিবিরোধী গুন্ডারা মিলে সারা দিন ও রাত পাহারা দিয়েছে, মব সৃষ্টি করেছে—যাতে মানুষ সেখানে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে না পারে।
কিন্তু খোঁজ নিলে জানা যাবে, এবারের ১৫ আগস্ট যত মানুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে মনে করেছে, অন্তরের বেদিতে তাঁকে ফুল নিবেদন করেছে—১৫ বছরের সরকারি আড়ম্বরও তা পারেনি। এবারের সামাজিক ফোরাম বা সামাজিক মিডিয়ায় যেভাবে ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করা হয়েছে, তার ফলে অনেকেই নতুন করে আবার তাঁদের বঙ্গবন্ধু মুজিবকে পেয়েছে। বাঙালি দেখেছে, দুর্দিনেই বঙ্গবন্ধু তাদের আপন অন্তরে জ্বলে ওঠেন। এ আগুন নেভার নয়; বরং যখনই অন্ধকার নামে, তখনই এক প্রাণ থেকে লক্ষ প্রাণে আলো জ্বালার এ আগুন।
আর এখানেই একটি জাতি বা একটি নরগোষ্ঠীর গেম চেঞ্জারের সঙ্গে সাধারণ সরকারপ্রধান, রাজনীতিক ও সামরিক নেতাদের পার্থক্যের রেখা।
লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক ও সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World.
স্বদেশ রায় 


















