ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়াতে পারে। কিন্তু বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে এখন আরও বড় প্রশ্ন অন্য জায়গায়—কারখানা চালানোর মতো নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও গ্যাস থাকবে কি না, ব্যাংকিং ব্যবস্থা কতটা স্থিতিশীল, বৈদেশিক মুদ্রা কতটা সহজলভ্য এবং সরকার বদলালেও বিনিয়োগ চুক্তির ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে কি না। রাজনৈতিক ঝুঁকির সঙ্গে জ্বালানি ও আর্থিক সংকট যুক্ত হলে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে তাই দুটি সংকট পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে—রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা। প্রথমটি বিনিয়োগকারীর সিদ্ধান্তকে অনিশ্চিত করছে, দ্বিতীয়টি সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
সরকার বিদেশি অর্থ চাইছে। আন্তর্জাতিক ঋণদাতা ও উন্নয়ন অংশীদাররা বাংলাদেশকে সহায়তা দিচ্ছে। চীন ও জাপানও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের নিট সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ৩৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে বলে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
তবে এই অঙ্ক এখনও বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার এবং শিল্পায়নের প্রয়োজনের তুলনায় খুবই ছোট। বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগের প্রতিযোগিতা যখন তীব্র, তখন বাংলাদেশকে শুধু বিনিয়োগের আহ্বান জানালেই হবে না। বিনিয়োগকারীদের বোঝাতে হবে, ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া বা অন্য কোনো এশীয় দেশে না গিয়ে তারা কেন বাংলাদেশকে বেছে নেবেন।
এর মধ্যেই ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থ জুন ২০২৬ শেষে বেড়ে ৩ দশমিক ৩৬ ট্রিলিয়ন টাকায় দাঁড়িয়েছে—এক বছর আগের তুলনায় ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এখনও ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর পুরোপুরি আস্থা ফিরে পায়নি।
এখানেই বিদেশি বিনিয়োগের একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে। দেশের মানুষই যদি ব্যাংকে টাকা রাখতে সতর্ক থাকে, বিদেশি বিনিয়োগকারী কেন তার কোটি কোটি ডলার এখানে দীর্ঘ সময়ের জন্য বিনিয়োগ করবেন?
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও কঠিন কিছু প্রশ্ন। কারখানায় নিয়মিত বিদ্যুৎ থাকবে কি? গ্যাস পাওয়া যাবে কি? ডিজেল পাওয়া যাবে কি? তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির জন্য পর্যাপ্ত ডলার থাকবে কি? বন্দর ও পরিবহনব্যবস্থা সচল থাকবে কি?
রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ডিসেম্বর এখন একটি সম্ভাব্য ঝুঁকির বিন্দু। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, তিনি ডিসেম্বর বাংলাদেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন। আগস্টেও তিনি সেই পরিকল্পনা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
তবে বিনিয়োগকারীর কাছে প্রশ্নটি শুধু ‘হাসিনা ফিরবেন কি না’—এত সরল নয়। আসল প্রশ্ন হলো, সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কার্যক্রম কতটা স্থিতিশীল থাকবে।
বিদেশি বিনিয়োগের দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি
বাংলাদেশের গল্পের একটি ইতিবাচক দিক আছে।
২০২৫ সালে নিট সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের ১ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।
এ থেকে বোঝা যায়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেও কিছু বিদেশি বিনিয়োগকারী বাংলাদেশকে পুরোপুরি পরিত্যাগ করেননি।
কিন্তু সংখ্যাটির আরেকটি দিকও আছে। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের দেশে, যেখানে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, অবকাঠামো, জ্বালানি ও শিল্পায়নের জন্য বিপুল মূলধন প্রয়োজন, বছরে ১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ খুব বড় বিনিয়োগপ্রবাহ নয়।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যেও দেখা যায়, বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় বিদেশি বিনিয়োগ ঐতিহাসিকভাবে খুবই কম।
অর্থাৎ সমস্যা বিনিয়োগকারীর সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি নয়। সমস্যা হলো, বাংলাদেশ তার সম্ভাবনার তুলনায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ টানতে পারছে না।
সবচেয়ে বড় বাধা রাজনীতি, নাকি বিদ্যুৎ?
দুটিই। তবে বিদেশি শিল্প বিনিয়োগকারীর জন্য বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট অনেক সময় রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার চেয়েও বেশি সরাসরি ক্ষতিকর।
রাজনৈতিক ঝুঁকি একজন বিনিয়োগকারী হিসাব করতে পারেন। কিন্তু কারখানা চালানোর জন্য প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে সেই ঝুঁকি সামাল দেওয়ার সহজ কোনো ব্যবস্থা নেই।
২০২৬ সালের গ্রীষ্মে বাংলাদেশে এই বাস্তবতা আবার সামনে এসেছে।
আগস্টে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় কয়েক শ মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হয় এবং বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং শুরু হয়। রয়টার্স জানিয়েছে, গ্যাসের সীমিত সরবরাহ বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে দেয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারে অস্থিরতাও পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে।
দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার সমস্যাটি শুধু উৎপাদনক্ষমতার অভাব নয়। বাংলাদেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বড় অংশ গ্যাসনির্ভর। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, কিন্তু গ্যাস নেই—এমন একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
আগস্টে বিদ্যুৎ ঘাটতি ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাওয়ার খবরও এসেছে। এর পেছনে ছিল বাড়তি চাহিদা, গ্যাস সরবরাহের সংকট এবং কয়লাভিত্তিক উৎপাদনে বিঘ্ন।
অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে ৬২টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার খবর এসেছে। গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির ঘাটতি এবং কিছু কেন্দ্রের কারিগরি সমস্যার কারণে উৎপাদন কমেছে।
একটি পোশাক কারখানায় কয়েক ঘণ্টার বিদ্যুৎ বিভ্রাট মানে শুধু উৎপাদন কমে যাওয়া নয়। এর অর্থ শ্রমিকদের অতিরিক্ত কাজের সময়, ডিজেলচালিত জেনারেটরের বাড়তি খরচ, পণ্য পাঠাতে বিলম্ব এবং বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে সরবরাহ চুক্তি বাস্তবায়নে ঝুঁকি।
একটি ইস্পাত কারখানা বা সিরামিক কারখানার ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। উৎপাদন প্রক্রিয়া মাঝপথে বন্ধ হলে কাঁচামাল নষ্ট হতে পারে, যন্ত্রপাতির ক্ষতি হতে পারে এবং পুনরায় উৎপাদন শুরু করতে বড় সময় লাগতে পারে।
তাই বিদেশি বিনিয়োগকারীর কাছে বিদ্যুৎ শুধু একটি সেবা নয়। এটি বিনিয়োগ থেকে মুনাফা পাওয়ার পুরো হিসাবের অংশ।
গ্যাস সংকটের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ডলারের সংকটও
বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাস।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন দীর্ঘদিন ধরে চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। ঘাটতি পূরণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু আমদানি করা এই গ্যাসের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে ওঠানামা করে এবং এর জন্য বৈদেশিক মুদ্রা প্রয়োজন।
অর্থাৎ গ্যাস সংকটের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত তিনটি বিষয়—ডলার, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এবং বিদ্যুৎ।
ডলার সংকট হলে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানিতে সমস্যা হতে পারে।
গ্যাস কমলে গ্যাসচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে।
বিদ্যুৎ কমলে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয়।
শিল্প উৎপাদন কমলে রপ্তানি ও বিনিয়োগ কমে।
রপ্তানি কমলে ডলারের সরবরাহের ওপরও চাপ পড়ে।
এটি একটি দুষ্টচক্র—একটি সংকট অন্যটিকে আরও বড় করে।
বিশ্বব্যাংক এই ঝুঁকিকে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে যে বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির অর্থায়ন সহজ করতে ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের জ্বালানি খাতের নিরাপত্তা জোরদারের প্রকল্প নিয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসে বিশ্বব্যাংক অতিরিক্ত সহায়তার মাধ্যমে পেট্রোবাংলার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির অর্থপ্রদানের নিরাপত্তা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়।
লক্ষ্য হচ্ছে আরও পূর্বানুমানযোগ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস আমদানির ব্যবস্থা তৈরি করা।
বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প কাঠামো অনুযায়ী, সাত বছরে নতুন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানিতে ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বেসরকারি মূলধন আকর্ষণের লক্ষ্য রয়েছে।
এখানেই বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ ও বড় ঝুঁকি—দুটিই পাশাপাশি রয়েছে।
জ্বালানি সংকট এখন শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রের সমস্যা নয়
আগস্টের গ্যাস সংকট ইতোমধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রের বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে। শিল্পকারখানা, পরিবহন এবং আবাসিক গ্রাহকরাও চাপ অনুভব করছেন।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গ্যাসের ব্যবহার ব্যাপক—বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা, শিল্প, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং গৃহস্থালি—সবখানেই এর প্রয়োজন।
ফলে গ্যাসের ঘাটতি হলে একসঙ্গে একাধিক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
একটি বিদেশি কোম্পানি যদি বাংলাদেশে একটি বড় রাসায়নিক কারখানা বা বস্ত্র প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা স্থাপনের কথা ভাবে, তখন শুধু জমির দাম বা শ্রমিকের মজুরি দিয়ে হিসাব হবে না।
তাকে জানতে হবে—কারখানার জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সংযোগ পাওয়া যাবে কি না, চুক্তিতে উল্লেখ করা গ্যাস সরবরাহ বাস্তবে কতটা নির্ভরযোগ্য, গ্যাসের চাপ কমে গেলে উৎপাদন বন্ধ হবে কি না এবং ভবিষ্যতে গ্যাসের দাম কতটা বাড়তে পারে।
এই অনিশ্চয়তা বিনিয়োগের ঝুঁকি এবং প্রত্যাশিত মুনাফার চাপ বাড়িয়ে দেয়।
জ্বালানির ৯৫ শতাংশই আমদানিনির্ভর
২০২৬ সালের মার্চে রয়টার্স জানিয়েছিল, বাংলাদেশ তার প্রায় ৯৫ শতাংশ জ্বালানি প্রয়োজন আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সময় এই নির্ভরতা বড় ঝুঁকি তৈরি করে।
জ্বালানি সংকটের মধ্যে সরকার জ্বালানি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে বাধ্য হয়। যানবাহনের জ্বালানি বিক্রিতে সীমা আরোপ করা হয় এবং পেট্রোল পাম্প খোলার সময় কমানো হয়।
এমনকি মার্চে বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে ৬ লাখ মেট্রিক টন পর্যন্ত ডিজেল আমদানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা ছাড় চেয়েছিল বলে রয়টার্স জানায়।
একই সময়ে দেশটি ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান, অ্যাঙ্গোলা ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করছিল।
একটি দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্যময় করা অবশ্যই ভালো। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও গভীর।
দেশটির নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদন সীমিত, আমদানির প্রয়োজন বেশি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ রয়েছে।
তাই আন্তর্জাতিক তেলের দাম বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বেড়ে গেলে বাংলাদেশকে একই সঙ্গে দুটি চাপ সামলাতে হয়—বেশি ডলার খরচ এবং বেশি ভর্তুকি ও মূল্যস্ফীতির চাপ।
জ্বালানির দাম বাড়ালে মূল্যস্ফীতি বাড়বে।
দাম না বাড়ালে ভর্তুকি বাড়বে।
ভর্তুকি বাড়লে বাজেটের চাপ বাড়বে।
আর বাজেটের চাপ বাড়লে উন্নয়ন প্রকল্প ও সামাজিক ব্যয়ে জায়গা সংকুচিত হতে পারে।
এই পুরো হিসাবটি বিদেশি বিনিয়োগকারীরা খুব কাছ থেকে দেখেন।
জ্বালানি আমদানির জন্য অতিরিক্ত কয়েক বিলিয়ন ডলার
মার্চে রয়টার্স জানিয়েছিল, বাংলাদেশ জ্বালানি ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির সংকট সামাল দিতে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি আন্তর্জাতিক অর্থায়ন খুঁজছিল। দেশটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থায়ন করপোরেশন এবং এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের সঙ্গে অর্থায়ন নিয়ে কাজ করছিল।
বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি হিসাবের ভিত্তিতে এপ্রিলেও খবর আসে, মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত জ্বালানি ও সার আমদানির বিল পরিশোধে অতিরিক্ত ২ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে।
এই সংখ্যাগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দেখায়—বাংলাদেশ শুধু বিদেশি বিনিয়োগ চাইছে না; একই সময়ে জ্বালানি কেনার জন্যও বিদেশি অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে।
এটি বিনিয়োগকারীর কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকেত।
কারণ একটি অর্থনীতির বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের ওপর যদি জ্বালানি, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, সার এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানির চাপ থাকে, তাহলে নতুন বিদেশি বিনিয়োগকারীর মূলধন ও মুনাফা দেশে ফেরত নেওয়ার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কাছে বাংলাদেশ এখন শুধু প্রবৃদ্ধির গল্প নয়
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ২০২৬ সালের মূল্যায়নে বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ঝুঁকি উঠে এসেছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের প্রকৃত মোট দেশজ উৎপাদন প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে।
এটি বিনিয়োগকারীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
৯ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতি থাকলে স্থানীয় মুদ্রায় বিনিয়োগের প্রকৃত মুনাফা হিসাব করা কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ে।
অর্থাৎ বিদেশি বিনিয়োগকারীর সামনে তিনটি ব্যয়ের চাপ তৈরি হতে পারে—উচ্চ মূল্যস্ফীতি, উচ্চ জ্বালানি ব্যয় এবং মুদ্রার বিনিময় হারজনিত ঝুঁকি।
এর বিপরীতে বাংলাদেশকে এমন কিছু সুবিধা দিতে হবে, যা এই ঝুঁকিগুলো সামাল দিতে পারে। যেমন কম শ্রম ব্যয়, বড় অভ্যন্তরীণ বাজার, রপ্তানির সুযোগ, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, কর সুবিধা, দীর্ঘমেয়াদি জমি ও জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার নিশ্চয়তা।
ব্যাংকের বাইরে ৩ দশমিক ৩৬ ট্রিলিয়ন টাকা
প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলোর একটি হলো ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে নগদ অর্থের দ্রুত বৃদ্ধি।
জুন ২০২৬ শেষে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৩৬ ট্রিলিয়ন টাকা, যা এক বছর আগে ছিল ২ দশমিক ৯৬ ট্রিলিয়ন টাকা। একই সময়ে বিস্তৃত অর্থ সরবরাহ বেড়েছে ১১ দশমিক ১১ শতাংশ। কিন্তু ব্যাংকের বাইরে নগদের বৃদ্ধি ছিল তার চেয়ে দ্রুত।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই প্রবণতা পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সতর্কতামূলকভাবে বেশি নগদ অর্থ ধরে রাখার প্রবণতার ইঙ্গিত দিতে পারে।
এটি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে ব্যাংকের আমানত সংগ্রহ দুর্বল হতে পারে এবং উৎপাদনশীল ঋণ দেওয়ার জন্য ব্যাংকের হাতে অর্থ কমে যেতে পারে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীর কাছে এটি একটি দ্বিতীয় স্তরের ঝুঁকি।
কারণ বিদেশি বিনিয়োগ কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থা নয়। বিদেশি কোম্পানি স্থানীয় ব্যাংকের মাধ্যমে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন দেয়, কার্যকরী মূলধন নেয়, সরবরাহকারীদের অর্থ দেয়, ঋণপত্র খোলে এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে।
যদি স্থানীয় আর্থিক ব্যবস্থা দুর্বল থাকে, তাহলে বিদেশি কোম্পানির পরিচালন ব্যয় বাড়ে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, ব্যাংকিং খাতও বড় বাধা
বিশ্বব্যাংক জুন ২০২৬-এ বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত শক্তিশালী করতে ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন অনুমোদন করে।
তাদের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ ২০২৬ শেষে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার গড় ছিল ৭ দশমিক ৯ শতাংশ।
এটি একটি বড় পার্থক্য।
একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী যদি দেখেন যে দেশের ব্যাংকিং খাতে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঋণ খেলাপি বা সমস্যাগ্রস্ত, তাহলে তিনি বুঝবেন যে স্থানীয় ঋণ ব্যবস্থাপনা, ব্যাংক পরিচালনা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতায় কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে।
এখানে বাংলাদেশের সংস্কারের প্রয়োজন শুধু ব্যাংকার বা অর্থনীতিবিদদের জন্য নয়। এটি বিদেশি বিনিয়োগের জন্যও জরুরি।
চীন ও জাপান এখনও সম্ভাবনা দেখছে
চীন বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর আগ্রহ দেখিয়েছে। নতুন জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং সবুজ অর্থনীতির মতো ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর কথা চীনা নেতৃত্বের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।
চীনের সরকারি তথ্যেও বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের সম্ভাব্য ক্ষেত্র হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যান, ব্যাটারি, উচ্চপ্রযুক্তির বস্ত্র এবং চট্টগ্রামভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর কথা উঠে এসেছে।
এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চীনা বিনিয়োগকারীরা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো এবং উৎপাদন অর্থনীতির হিসাব দিয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন করেন।
জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের আরেকটি দিক হলো দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন অর্থায়ন।
২০২৬ সালে বাংলাদেশ ও জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি সই করেছে। এর লক্ষ্য দুই দেশের পণ্য ও সেবা বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর করা।
জাপান একই সময়ে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতার জন্য সহজ শর্তে ঋণও দিচ্ছে।
অর্থাৎ দুই দেশের আগ্রহ বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগের সংকেত।
কিন্তু বিনিয়োগকারীর প্রশ্ন একই থাকে—
বিদ্যুৎ থাকবে কি?
গ্যাস থাকবে কি?
বন্দর সচল থাকবে কি?
চুক্তি টিকবে কি?
মুনাফা দেশে ফেরত নেওয়া যাবে কি?
আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারীরা এখনও আশাবাদী—তবে শর্তসাপেক্ষে
বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের কর্মকাণ্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত দেয়।
তারা বাংলাদেশকে ছেড়ে যাচ্ছে না।
বরং তারা বলছে—সংস্কার করলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
বিশ্বব্যাংক জ্বালানি নিরাপত্তায় অর্থ দিচ্ছে। ব্যাংকিং খাতেও অর্থ দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংস্কারের ওপর জোর দিচ্ছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি, অর্থনীতির বহুমুখীকরণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে।
এটি বাংলাদেশের জন্য একটি সুযোগের জানালা।
কিন্তু এই সুযোগের জানালা চিরস্থায়ী নয়।
‘হাসিনা ফ্যাক্টর’: ডিসেম্বর কি বিনিয়োগের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে?
এখন রাজনৈতিক প্রশ্নে আসা যাক।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তিনি ডিসেম্বর বাংলাদেশে ফিরবেন। রয়টার্স জানিয়েছে, তিনি আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করেছেন এবং আগস্টে সেই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
এটি বিনিয়োগকারীর কাছে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক ঝুঁকি।
কিন্তু হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিজে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করবে—এমন কথা বলা যায় না।
সংকট তৈরি হবে যদি প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংঘাত, পরিবহন ব্যাহত হওয়া, বন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়া, কারখানা বন্ধ হওয়া, ব্যাংকিং কার্যক্রমে বিঘ্ন অথবা প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
অর্থাৎ বিনিয়োগকারীর কাছে ‘হাসিনা ফ্যাক্টর’ মূলত একটি ঘটনাভিত্তিক ঝুঁকি।
ডিসেম্বরের আগে কোনো বিদেশি কোম্পানির বিনিয়োগ কমিটি তখন প্রশ্ন করতে পারে—ডিসেম্বরে পরিস্থিতি খারাপ হলে কী হবে?
যদি উত্তর হয়—কারখানা চলবে, ব্যাংক চলবে, বন্দর চলবে, চুক্তি বহাল থাকবে, বৈদেশিক মুদ্রা পাওয়া যাবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর থাকবে—তাহলে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণযোগ্য।
কিন্তু উত্তর যদি অস্পষ্ট হয়, বিনিয়োগ কমিটি সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে পারে।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি: রাজনৈতিক ও জ্বালানি সংকট একসঙ্গে
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটি হলো, রাজনৈতিক এবং জ্বালানি ঝুঁকি আলাদা আলাদা নয়।
ধরা যাক, ডিসেম্বর রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ল। একই সময়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়ে গেল। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ল। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হলো।
তারপর শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমল।
রপ্তানি আয় কমল।
ডলার প্রবাহ কমল।
এতে জ্বালানি আমদানি আরও কঠিন হলো।
এটি এমন একটি সংকট তৈরি করতে পারে, যেখানে একটি সমস্যা অন্যটিকে আরও শক্তিশালী করে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীর কাছে এই পরিস্থিতি একটি সাধারণ রাজনৈতিক ঝুঁকির তুলনায় অনেক বেশি বিপজ্জনক। কারণ তখন সমস্যাটি শুধু সরকার বা রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না—সরাসরি নগদ প্রবাহের ওপর আঘাত আসে।

বাংলাদেশের বড় সুবিধা এখনও আছে
সব সংকটের পরও বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার ভৌগোলিক অবস্থান।
দেশটি ভারত, চীন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কাছাকাছি।
বঙ্গোপসাগরে সরাসরি প্রবেশাধিকার আছে।
বড় শ্রমবাজার রয়েছে।
পোশাক রপ্তানির বিশাল সরবরাহব্যবস্থা আছে।
একটি বড় অভ্যন্তরীণ ভোক্তা বাজার তৈরি হয়েছে।
এবং চীনের বাইরে উৎপাদন ছড়িয়ে দেওয়ার কৌশলের কারণে কিছু বহুজাতিক কোম্পানি নতুন উৎপাদনকেন্দ্র খুঁজছে।
এই জায়গায় বাংলাদেশ এখনও প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে।
কিন্তু ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড এবং অন্যান্য এশীয় উৎপাদনকেন্দ্র একই বিনিয়োগের জন্য প্রতিযোগিতা করছে।
সুতরাং বাংলাদেশকে শুধু নিজের সম্ভাবনা দিয়ে নয়—প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় ভালো হতে হবে।
বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধানই হতে পারে বিনিয়োগ নীতির কেন্দ্র
বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য এখানে একটি বড় শিক্ষা আছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতিকে আলাদা রেখে বিদেশি বিনিয়োগ নীতি পরিচালনা করলে হবে না।
একজন বিনিয়োগকারীকে শুধু বলা যে ‘বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সংযোগ আছে’ যথেষ্ট নয়।
তাকে জানাতে হবে—
কত ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে।
বিদ্যুৎ সরবরাহ কতটা নির্ভরযোগ্য।
বিদ্যুতের দাম কীভাবে পরিবর্তিত হবে।
গ্যাস সরবরাহের চুক্তি কতটা কার্যকর।
তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের অর্থপ্রদানের নিশ্চয়তা কী।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি কেনার প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ।
এবং শিল্পাঞ্চলে আলাদা বিদ্যুৎ সঞ্চালন সক্ষমতা থাকবে কি না।
অর্থাৎ জ্বালানি সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা নিজেই একটি বিনিয়োগ প্রণোদনা।
বিদেশি অর্থায়ন আর বিদেশি বিনিয়োগ এক বিষয় নয়
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার।
বিশ্বব্যাংকের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস অর্থায়ন বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বাজেট সহায়তাকে বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ হিসেবে গণনা করা যাবে না।
এগুলো উন্নয়ন অর্থায়ন বা রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন।
বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ হলো বিদেশি কোম্পানির মালিকানা মূলধন, পুনর্বিনিয়োগ করা মুনাফা অথবা অন্য ধরনের সরাসরি ব্যবসায়িক বিনিয়োগ, যেখানে বিনিয়োগকারী ব্যবসার মালিকানা ও বাণিজ্যিক মুনাফার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকেন।
তবে উন্নয়ন অর্থায়ন বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
বিশ্বব্যাংক যদি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের অর্থপ্রদানের নিশ্চয়তা দেয়, তাহলে গ্যাস সরবরাহ স্থিতিশীল হতে পারে।
জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা যদি জ্বালানি অবকাঠামো উন্নত করে, তাহলে বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বাড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে সাহায্য করলে মুদ্রার ঝুঁকি কমতে পারে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক অবকাঠামোয় অর্থ দিলে পরিবহন ব্যয় কমতে পারে।
এরপর বেসরকারি বিদেশি বিনিয়োগ আসতে পারে।
অর্থাৎ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়ন বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগের বিকল্প নয়; সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে এটি বিদেশি বিনিয়োগের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
আগামী দুই বছর বাংলাদেশের জন্য নির্ণায়ক
বাংলাদেশের সামনে এখন কয়েকটি বড় পরীক্ষা।
প্রথম পরীক্ষা—ডিসেম্বর।
রাজনৈতিক উত্তেজনা কি সহিংসতায় রূপ নেবে, নাকি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে?
দ্বিতীয় পরীক্ষা—ব্যাংকিং সংস্কার।
ব্যাংকের খেলাপি ঋণ, পরিচালনব্যবস্থা এবং আমানতকারীদের আস্থা কত দ্রুত পুনর্গঠন করা সম্ভব?
তৃতীয় পরীক্ষা—জ্বালানি নিরাপত্তা।
বাংলাদেশ কি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও জ্বালানির জন্য শুধু আন্তর্জাতিক খোলাবাজারের ওপর নির্ভর করবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি, সরবরাহকারীর বৈচিত্র্য এবং দেশীয় অনুসন্ধান বাড়াবে?
চতুর্থ পরীক্ষা—বৈদেশিক মুদ্রা।
বিদেশি বিনিয়োগ আসার পাশাপাশি বিনিয়োগকারী যেন প্রয়োজনের সময় বৈধভাবে লভ্যাংশ ও মুনাফা নিজ দেশে ফেরত নিতে পারেন—এই নিশ্চয়তা কতটা শক্তিশালী করা যায়?
পঞ্চম পরীক্ষা—নীতির ধারাবাহিকতা।
আজ যে বিনিয়োগ চুক্তি করা হলো, পাঁচ বছর পর সরকার বদলালেও সেটি বহাল থাকবে কি?
বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নের উত্তর ‘হ্যাঁ’ হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশের সামনে মোটামুটি তিনটি পরিস্থিতি দেখা যায়।
প্রথম পরিস্থিতি—নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক পরিবর্তন। ডিসেম্বরের রাজনৈতিক উত্তেজনা থাকলেও তা সীমিত থাকে। ব্যাংকিং সংস্কার এগোয়। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ স্থিতিশীল হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের সংস্কার কর্মসূচি এগোয়। এই পরিস্থিতিতে বিদেশি বিনিয়োগ ধীরে ধীরে বাড়তে পারে।
দ্বিতীয় পরিস্থিতি—রাজনৈতিক অস্থিরতা, কিন্তু অর্থনৈতিক কার্যক্রম অব্যাহত। রাজনৈতিক সংঘাত হয়, কিন্তু বন্দর, ব্যাংক, বিদ্যুৎ ও শিল্প কার্যক্রম সচল থাকে। এ ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা হয়তো বাংলাদেশ ছেড়ে যাবেন না। বরং নতুন বিনিয়োগে বেশি ঝুঁকি-প্রিমিয়াম চাইবেন এবং সিদ্ধান্ত নিতে বেশি সময় নেবেন।
তৃতীয় পরিস্থিতি—রাজনৈতিক ও জ্বালানি ধাক্কা একসঙ্গে। ডিসেম্বরের রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে জ্বালানি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সংকট, বড় ধরনের লোডশেডিং, ব্যাংকিং চাপ এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকট একসঙ্গে দেখা দিলে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ দ্রুত কমে যেতে পারে।
এই তৃতীয় পরিস্থিতিই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক।
তাহলে বিদেশি বিনিয়োগ কি সম্ভব?
হ্যাঁ, সম্ভব।
কিন্তু বর্তমান অবস্থায় বাংলাদেশের জন্য বিদেশি বিনিয়োগের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হলো দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিনিয়োগ, স্বল্পমেয়াদি জল্পনাভিত্তিক মূলধনের পরিবর্তে।
চীন যদি ব্যাটারি বা নবায়নযোগ্য জ্বালানি কারখানা করে, জাপান যদি উৎপাদন বা সরবরাহ অবকাঠামোয় যায়, সৌদি বা অন্য উপসাগরীয় বিনিয়োগকারী যদি বন্দর অবকাঠামোয় যায়, কিংবা কোনো বহুজাতিক কোম্পানি যদি রপ্তানিমুখী কারখানা স্থাপন করে—তাহলে তাদের সিদ্ধান্ত মূলত ১০ থেকে ২০ বছরের সময়সীমায় হবে।
এই ধরনের বিনিয়োগ রাজনৈতিক ঝুঁকি সহ্য করতে পারে—যদি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো স্থিতিশীল থাকে।
বাংলাদেশের নীতি তাই হওয়া উচিত—যে মূলধন থাকবে, সেই মূলধনের মান বাড়ানো।
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক
বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের ভবিষ্যৎকে শুধু শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন দিয়ে ব্যাখ্যা করা ভুল হবে।
ডিসেম্বরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। এটি অস্বীকার করার উপায় নেই।
কিন্তু বিদেশি বিনিয়োগকারীর দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করবে আরও গভীর কিছু বিষয়—রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান কতটা শক্তিশালী, ব্যাংক কতটা নিরাপদ, চুক্তি কতটা সুরক্ষিত, বৈদেশিক মুদ্রা কতটা সহজলভ্য, করনীতি কতটা স্থিতিশীল এবং সরকার পরিবর্তনের পরও বিনিয়োগকারীর অধিকার কতটা অক্ষুণ্ন থাকে।
দেশের ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ ৩ দশমিক ৩৬ ট্রিলিয়ন টাকায় পৌঁছে যাওয়া যেমন দেশের মানুষের আস্থার সংকেত, তেমনি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি সংকট শিল্প খাতের আস্থার পরীক্ষা।
বাংলাদেশ যদি এই দুই আস্থার সংকট কাটাতে পারে, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি সত্ত্বেও বাজারটি আকর্ষণীয় থাকতে পারে।
কিন্তু যদি ডিসেম্বরের রাজনৈতিক উত্তেজনার সঙ্গে বিদ্যুৎ, গ্যাস, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, ডলার ও ব্যাংকিং সংকট একসঙ্গে গভীর হয়, তাহলে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধাগুলো দ্রুত ক্ষয় হতে পারে।
বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে বাংলাদেশের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস নিরাপত্তায় অর্থ দিচ্ছে এবং বেসরকারি মূলধন আকর্ষণের কাঠামো তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংস্কারের ওপর জোর দিচ্ছে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এই আস্থা কোনো খালি চেক নয়।
বাংলাদেশকে এখন প্রমাণ করতে হবে যে রাজনৈতিক সরকার বদলালেও বিদ্যুৎ থাকবে, গ্যাস থাকবে, ব্যাংক চলবে, চুক্তি টিকবে এবং বিনিয়োগকারীর অর্থের নিরাপত্তা থাকবে।
সেই নিশ্চয়তা দিতে পারলে ডিসেম্বরের ‘হাসিনা-প্রভাব’ একটি ঝুঁকি হলেও বিদেশি বিনিয়োগের দরজা বন্ধ করতে পারবে না।
আর যদি সেই নিশ্চয়তা দেওয়া না যায়, তাহলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে আসবেন কি না—তা নয়।
সমস্যা হবে, তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগের সিদ্ধান্তই পিছিয়ে দেবেন।
আন্তর্জাতিক পুঁজির বাজারে সেটিই অনেক সময় সবচেয়ে ব্যয়বহুল সিদ্ধান্ত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















