যুক্তরাষ্ট্রে চলতি বছর নিশ্চিত হাম আক্রান্তের সংখ্যা ২ হাজার ৭৭৭ ছাড়িয়েছে—এই শতাব্দীতে যা সর্বোচ্চ এবং ২০২৫ সালের পুরো বছরের চেয়েও বেশি। এমন পরিস্থিতিতে পেনসিলভানিয়ায় হাম-সংশ্লিষ্ট দুটি মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসা নিঃসন্দেহে গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকেত। কিন্তু মৃত্যুর খবরটি প্রকাশের পর যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, সেটি রোগের বিস্তারের চেয়েও আলাদা এক সংকটকে সামনে এনেছে: জনস্বাস্থ্য বিষয়ে মানুষের আস্থা কতটা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে।
পেনসিলভানিয়ার গভর্নর জশ শাপিরো ২৫ আগস্ট দুটি হাম-সংশ্লিষ্ট মৃত্যুর কথা জানান। তাঁর ভাষায়, দুজনই টিকা নেননি এবং হামজনিত মৃত্যু পুরোপুরি প্রতিরোধযোগ্য। কিন্তু পরবর্তী দুই দিনে পেনসিলভানিয়া স্বাস্থ্য বিভাগ, ল্যাঙ্কাস্টার কাউন্টির করোনার দপ্তর, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র এবং স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিষয়ক মন্ত্রী রবার্ট এফ. কেনেডি জুনিয়রের বক্তব্যে দেখা দেয় অসামঞ্জস্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই মতবিরোধ আরও তীব্র হয়ে ছড়িয়ে পড়ে।
এখানেই মূল সমস্যাটি। এমন সময়ে যখন রোগের সংক্রমণ বেশি, অথচ সরকার ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর আস্থা কম, তখন একটি মৃত্যুর তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে সামান্য অস্পষ্টতাও বড় ধরনের অবিশ্বাস তৈরি করতে পারে। তাই জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব শুধু দ্রুত তথ্য দেওয়া নয়; তথ্যটি কতটা নিশ্চিত, কী জানা গেছে এবং কী এখনো জানা যায়নি—সবকিছু পরিষ্কারভাবে জানানো।
ল্যাঙ্কাস্টার কাউন্টির ঘটনাই বিষয়টি স্পষ্ট করে। সেখানে হাম পরীক্ষায় পজিটিভ পাওয়া একটি নবজাতকের মৃত্যু হয়েছিল। শিশুটির মৃত্যুর তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে প্লীহায় ক্ষত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়, আর হামকে মৃত্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি কারণ হিসেবে মৃত্যুসনদে রাখা হয়েছিল। কিন্তু কাউন্টির করোনার পরে বলেন, তিনি মনে করেন না হাম শিশুটির মৃত্যুর জন্য দায়ী ছিল। অন্য মৃত্যুটিও করোনারের এখতিয়ারে ছিল না।
এখানে সতর্ক ভাষার প্রয়োজন ছিল। হাম শনাক্ত হওয়া এবং হাম সরাসরি মৃত্যুর কারণ হওয়া এক বিষয় নয়। নবজাতকের ক্ষেত্রে প্লীহায় ক্ষত জন্মের সময়ের আঘাতের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে; আবার হামের সঙ্গে এর কোনো যোগও থাকতে পারে। কোন ব্যাখ্যাটি সঠিক, তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।
গভর্নরের বক্তব্যের সমস্যাও এখানেই। তিনি হয়তো টিকাবিরোধী প্রচারণার ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে সতর্ক করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু একটি নবজাতককে ‘টিকা না নেওয়া ব্যক্তি’ হিসেবে উপস্থাপন করা বিভ্রান্তিকর হতে পারে, কারণ ওই বয়সে শিশুটির টিকা নেওয়ার যোগ্যতাই ছিল না। জনস্বাস্থ্য বার্তায় এমন সূক্ষ্ম বিষয় বাদ পড়লে তা মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির বদলে উল্টো সন্দেহ ও ক্ষোভ বাড়াতে পারে।
আরও উদ্বেগের বিষয়, অতিরিক্ত তথ্য চাওয়া হলে রাজ্য স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা গোপনীয়তার কারণ দেখিয়ে তা দিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। অবশ্যই মৃত ব্যক্তিদের পরিচয় সুরক্ষিত রাখা জরুরি। কিন্তু বয়সের সাধারণ পরিসর, অন্য রোগ ছিল কি না, হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন কি না কিংবা সম্ভাব্য সংস্পর্শের তথ্য—এসব সাধারণভাবে জানানো সম্ভব ছিল, পরিচয় প্রকাশ না করেই। যখন কর্তৃপক্ষ কিছু তথ্য প্রকাশ করে এবং অন্য তথ্যের ক্ষেত্রে নীরব থাকে, তখন সেই ফাঁকটিই নানা ধরনের অনুমানের জায়গা তৈরি করে।
এই শূন্যস্থানই দ্রুত পূরণ করেছে টিকাবিরোধী মহল। কেনেডি এবং তাঁর সমর্থকেরা ঘোষণার অসঙ্গতিগুলো সামনে এনে প্রশ্ন তুলেছেন, এমনকি মৃত্যুগুলো আদৌ ঘটেছিল কি না, তা নিয়েও সন্দেহ উসকে দিয়েছেন। কেনেডি ও শাপিরোর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্য বাকযুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও রাজনৈতিক করে তুলেছে। পরে রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রও ঘোষিত তথ্যের ‘অসঙ্গতি’ নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
এটি কেবল একটি প্রশাসনিক ভুলের গল্প নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান জনস্বাস্থ্য বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে তথ্যের সামান্য অস্পষ্টতাও ষড়যন্ত্রতত্ত্বের জন্য জায়গা করে দেয়। বিশেষ করে টিকাদান যখন রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে, তখন প্রতিটি বক্তব্যকে অতিরিক্ত সতর্কতার সঙ্গে তৈরি করতে হয়।
রাজনীতির ভাষা এখানে জনস্বাস্থ্যের ভাষাকে ছাপিয়ে গেলে ক্ষতি হয়
শাপিরোর উদ্দেশ্য বোঝা কঠিন নয়। হাম-এর মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে মৃত্যু ঘটলে তিনি সম্ভবত কেনেডি ও ট্রাম্প প্রশাসনের টিকাবিষয়ক অবস্থানকে দায়ী করার রাজনৈতিক সুযোগ দেখেছেন। কিন্তু জনস্বাস্থ্য সংকটের মুহূর্তে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করার ভাষা সেই মানুষদের আরও দূরে ঠেলে দিতে পারে, যাদের আস্থা অর্জন করাই সবচেয়ে জরুরি।
কেনেডির আচরণও সমস্যামুক্ত নয়। জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত বক্তব্যের অসঙ্গতি বা অনিশ্চয়তাকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করলে মানুষের সংশয় আরও গভীর হয়। কোনো তথ্যের মধ্যে সত্যিই অস্পষ্টতা থাকলে তার সমাধান হওয়া উচিত তদন্ত ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে, অনুমান কিংবা রাজনৈতিক প্রচারণার মাধ্যমে নয়।
পেনসিলভানিয়ার হাম সংক্রমণ দ্রুত শেষ হয়ে যাবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। ফলে এখনো আস্থা পুনর্গঠনের সুযোগ আছে। এর জন্য নতুন কোনো কৌশল আবিষ্কারের প্রয়োজনও নেই। সংকটকালীন জনস্বাস্থ্য যোগাযোগের দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত নীতিগুলোই যথেষ্ট।
প্রথমে তথ্য দিতে হবে, সঠিক তথ্য দিতে হবে এবং বিশ্বাসযোগ্য থাকতে হবে। মানুষের উদ্বেগকে স্বীকার করতে হবে, কী করণীয় তা স্পষ্ট করতে হবে এবং সংশয়ী মানুষকেও সম্মানের সঙ্গে কথা বলতে হবে। এর সঙ্গে আরও চারটি বিষয় অপরিহার্য: স্বচ্ছতা, ধারাবাহিকতা, অনিশ্চয়তা স্বীকার করা এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা।
জনগণের কাছে তথ্য দেওয়ার দায়িত্ব একজন নির্ধারিত রাজ্য স্বাস্থ্য কর্মকর্তার হাতে থাকা উচিত। নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ের সময় আগে থেকেই জানানো যেতে পারে। প্রতিটি আপডেটের কেন্দ্রে থাকা উচিত সংক্রমণ ঠেকাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। কোনো তথ্য নিশ্চিত না হলে সেটিও স্পষ্ট করে বলা দরকার।
‘আমরা এখনো এটি জানি না, তবে কীভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি, সেটি জানি’—এই ধরনের বক্তব্য দুর্বলতার লক্ষণ নয়। বরং সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে কীভাবে সমাধানের দিকে এগোনো হচ্ছে, তা জানানো জনসাধারণের কাছে প্রশাসনের সক্ষমতা ও সততার প্রমাণ হতে পারে।
হাম-সংশ্লিষ্ট মৃত্যু সম্পর্কে জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। কিন্তু সেই তথ্য এমনভাবে দিতে হবে, যাতে তা নতুন বিভ্রান্তির জন্ম না দেয়। পেনসিলভানিয়ার কর্মকর্তারা বলতে পারতেন—এটি একটি অস্বাভাবিক ঘটনা; শিশুটির শরীরে হামের সংক্রমণের প্রমাণ ছিল এবং রোগটি মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, কিন্তু ভাইরাসটির প্রকৃত ভূমিকা এখনো নিশ্চিত নয়। করোনারের সঙ্গে কাজ করে বিষয়টি নির্ধারণ করা হচ্ছে এবং নতুন তথ্য পাওয়া গেলে তা জানানো হবে।
এ ধরনের বক্তব্য হয়তো রাজনৈতিকভাবে কম নাটকীয়। কিন্তু জনস্বাস্থ্যের জন্য তা অনেক বেশি কার্যকর।
কারণ বাস্তবে পেনসিলভানিয়ার স্বাস্থ্যকর্মীরা যে কাজটি করছেন, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। চলতি আগস্টে রাজ্যের কর্মীরা হাম, মাম্পস ও রুবেলার টিকার ২ হাজার ১০০টির বেশি ডোজ দিয়েছেন, যা জুলাইয়ের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি। তারা সংক্রমিত রোগীদের শনাক্ত করছেন, অসুস্থ পরিবারগুলোকে পরামর্শ দিচ্ছেন এবং টিকা না নেওয়া মানুষদের পাশাপাশি টিকা নিতে আগ্রহীদেরও সহায়তা করছেন।
এই কাজই মানুষের মনোযোগের কেন্দ্র হওয়া উচিত। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার জন্য মৃত্যুর তথ্য ব্যবহার করা নয়। জনস্বাস্থ্য সংকটে কে বিতর্কে জিতল, সেটি শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষ সত্য তথ্য পেল কি না, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিল কি না এবং পরবর্তী সংকটে কর্তৃপক্ষকে বিশ্বাস করার মতো যথেষ্ট কারণ তৈরি হলো কি না।
র্যাচেল বেডার 



















