জাপানের ৪৭টি প্রদেশের মধ্যে ৪৫টি প্রদেশই দুর্যোগের সময় গাড়িতে আশ্রয় নেওয়া মানুষের সংখ্যা ও অবস্থান শনাক্ত করাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে। গাড়িতে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকার কারণে তাদের কাছে সময়মতো জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গাড়িতে আশ্রয় নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে
বড় ধরনের ভূমিকম্প বা অন্যান্য দুর্যোগের সময় অনেক মানুষ নির্ধারিত আশ্রয়কেন্দ্রে না গিয়ে নিজেদের গাড়িতেই অবস্থান করেন। আশ্রয়কেন্দ্রের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং পরবর্তী কম্পনের আশঙ্কাসহ নানা কারণে তারা এমন সিদ্ধান্ত নেন।
জুলাইয়ের শেষ দিকে কুমামোতো প্রদেশে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পরও বহু মানুষ গাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এতে প্রশাসনের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের অবস্থান শনাক্ত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
কোথায় আছেন, কতজন আছেন—জানাই বড় সমস্যা
আগস্টের মাঝামাঝি থেকে শেষভাগে জাপানের ৪৭টি প্রদেশের প্রশাসনের মধ্যে জরিপটি চালানো হয়। একাধিক সমস্যা উল্লেখ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল এবং সব প্রদেশই এতে সাড়া দেয়।
তোচিগি ও টোকিও ছাড়া বাকি সব প্রদেশ গাড়িতে আশ্রয় নেওয়া মানুষের সংখ্যা ও অবস্থান নির্ধারণকে সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অনেক ক্ষেত্রে আশ্রয়ের স্থান নির্দিষ্ট নয়। কেউ এক জায়গায় গাড়ি রাখছেন, আবার কেউ পরিস্থিতি অনুযায়ী অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছেন। ফলে প্রশাসনের পক্ষে তাদের অবস্থান নিয়মিতভাবে অনুসরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে নোতো উপদ্বীপে ভয়াবহ ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা থাকা ইশিকাওয়া প্রদেশ জানিয়েছে, অন্যের বাড়িতে বা গাড়িতে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের শনাক্ত করা বিশেষভাবে কঠিন। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই প্রশাসন তাদের স্বেচ্ছায় দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করে।
স্বাস্থ্য ও ত্রাণ পৌঁছানো নিয়েও উদ্বেগ
অবস্থান শনাক্ত করার পর দ্বিতীয় বড় সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে আশ্রয় নেওয়া মানুষের শারীরিক অবস্থা এবং তাদের কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন তা বোঝা। ৪৪টি প্রদেশ এই বিষয়টি উল্লেখ করেছে।
এ ছাড়া পর্যাপ্ত ত্রাণ, প্রয়োজনীয় জনবল এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিষয়টি ৪০টি করে প্রদেশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে ধরা পড়েছে।
এহিমে প্রদেশ জানিয়েছে, গাড়িতে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের খুঁজে বের করতে কর্মকর্তাদের সরাসরি বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে গাড়িগুলো পর্যবেক্ষণ করতে হয়। অন্যদিকে নাগাসাকি প্রদেশ বলেছে, আশ্রয়স্থলগুলো বিচ্ছিন্ন ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকায় প্রয়োজনীয় মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছানো আরও কঠিন হয়ে যায়।

নির্দিষ্ট গাড়ি-আশ্রয় এলাকা চায় হোক্কাইদো
হোক্কাইদো প্রশাসন দুর্যোগের সময় গাড়িতে আশ্রয় নেওয়া মানুষের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে। এমন এলাকায় আশ্রয় নেওয়া মানুষদের অবস্থান সহজে শনাক্ত করার পাশাপাশি তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তাও দেওয়া সম্ভব হবে।
তবে শুধু অবস্থান শনাক্ত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। ভিন্ন পরিবেশে থাকা মানুষের জন্য ভিন্ন ধরনের সহায়তার ব্যবস্থাও প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তীব্র গরম ও ঠান্ডার ঝুঁকি
হিয়োগো প্রদেশ গাড়িতে অবস্থানরত মানুষের জন্য অতিরিক্ত গরম ও ঠান্ডা মোকাবিলার ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। কুমামোতো ভূমিকম্পের পর গাড়িতে অবস্থানকারী কয়েকজনের অতিরিক্ত গরমে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর আশঙ্কার কথা সামনে এসেছিল।
নাগানো প্রদেশ বলেছে, দুর্যোগের সরাসরি আঘাতের বাইরেও বিভিন্ন কারণে মানুষের মৃত্যু ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় জরুরি। একই সঙ্গে তথ্য সংগ্রহ ও তা পরস্পরের মধ্যে দ্রুত ভাগ করে নেওয়ার ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে।
স্বস্তির জায়গা বেছে নেওয়ার অধিকার থাকা উচিত
ওসাকা মহানগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক তাকু সুগানো মনে করেন, মানুষকে তাদের কাছে সবচেয়ে নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক মনে হওয়া জায়গায় আশ্রয় নেওয়া থেকে বিরত রাখা উচিত নয়।
তবে তার মতে, মূল প্রশ্ন হলো—গাড়িতে বা অন্যত্র আশ্রয় নেওয়া মানুষদের কীভাবে শনাক্ত করা হবে এবং শনাক্ত হওয়ার পর তাদের জন্য কী ধরনের সহায়তা ও বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হবে।
জাপানের এই জরিপ স্পষ্ট করে দিয়েছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় শুধু নির্ধারিত আশ্রয়কেন্দ্রের ওপর নির্ভর করলেই চলবে না। গাড়িতে আশ্রয় নেওয়া মানুষের বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে তাদের শনাক্তকরণ, স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, ত্রাণ সরবরাহ এবং প্রয়োজনভিত্তিক সহায়তার জন্য নতুন ও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি।
দুর্যোগের সময় গাড়িতে আশ্রয় নেওয়া মানুষের সংখ্যা ও অবস্থান শনাক্ত করাই এখন জাপানের ৪৫টি প্রদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















