সিডনির সমুদ্রসৈকতে বিশালাকার সাদা হাঙরের আক্রমণের শিকার হওয়ার পরও হাল ছাড়েননি ৩৪ বছর বয়সী লেয়া স্টুয়ার্ট। নিজের জীবন বাঁচাতে চার মিটার দীর্ঘ হাঙরের মুখে একের পর এক ঘুষি মেরে শেষ পর্যন্ত প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন তিনি। ভয়াবহ ওই ঘটনায় তাঁর একটি হাত কেটে ফেলতে হয়েছে।
গত ১৩ জুন সকালে সিডনির পূর্বাঞ্চলের কুজি সৈকতে সাঁতার কাটার সময় লেয়া হাঙরটির হামলার শিকার হন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় তিনি সংকটাপন্ন অবস্থায় ছিলেন। চিকিৎসার অংশ হিসেবে শেষ পর্যন্ত তাঁর একটি হাত কেটে ফেলতে হয়।
হাঙরের মুখ মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার দূরে
হামলার ভয়াবহ মুহূর্তের কথা সম্প্রতি প্রথমবারের মতো গণমাধ্যমে জানিয়েছেন লেয়া। তিনি বলেন, হঠাৎ তিনি বিশাল সাদা হাঙরটিকে দেখতে পান। প্রাণভয়ে তিনি চিৎকার করতে থাকেন। তাঁর আশা ছিল, উদ্ধারকারীরা চিৎকার শুনে দ্রুত সেখানে ছুটে আসবেন কিংবা জলযান নিয়ে এসে হাঙরটিকে তাড়িয়ে দেবেন।
কিন্তু প্রায় এক মিনিট পেরিয়ে গেলেও কেউ সেখানে পৌঁছাননি। এর মধ্যেই হাঙরটি তাঁর মুখের প্রায় ৩০ সেন্টিমিটারের মধ্যে চলে আসে। লেয়ার চোখে ভেসে ওঠে হাঙরের ছোট কালো চোখ এবং ভয়ংকর মুখ।
হাঙরটি যখন মুখ খুলতে শুরু করে, তখন লেয়া বুঝতে পারেন, আর অপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তাঁর মনে হয়, হাঙরটি তাঁর মুখে কামড় বসাতে যাচ্ছে। তাই মাথা বাঁচাতে তাঁকে নিজের শরীরের কোনো একটি অঙ্গ ঝুঁকির মধ্যে ফেলেই প্রতিরোধ করতে হবে।
‘কোন অঙ্গটি হারাতে রাজি?’
ডানহাতি লেয়া সেই মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেন বাঁ হাত দিয়েই আঘাত করবেন। তাঁর নিজের ভাষায়, মনে প্রশ্ন এসেছিল—‘কোন অঙ্গটি হারাতে আমি রাজি?’
এরপর তিনি হাঙরটির মুখে বাঁ হাত দিয়ে ঘুষি মারতে শুরু করেন। ভয়াবহ লড়াইয়ের সেই কয়েকটি মুহূর্ত তাঁর কাছে যেন ধীরগতিতে ঘটছিল। তিনি অনুভব করছিলেন, যেন কোনো বিশাল ডাইনোসরের সঙ্গে লড়াই করছেন।
লেয়া জানান, তাঁর মনে তখন একটাই কথা ছিল—কোনোভাবেই তিনি তাঁর এক বছরের মেয়েকে ছেড়ে যেতে চান না। মেয়ের কথা মনে করে তিনি শরীর ঘুরিয়ে হাঙরটিকে বারবার ঘুষি মারতে থাকেন।
তিনি বলেন, হাঙরটি এতটাই বড় ছিল যে সেটিকে ঘুষি মারা যেন ইটের দেয়ালে আঘাত করার মতো মনে হচ্ছিল।
মেয়ের কথা মনে করেই মৃত্যুকে হার
হাঙরটি লেয়ার বাঁ হাত ও উরুতে ভয়াবহ কামড় দেয়। পরে উদ্ধারকারীরা তাঁকে সৈকত থেকে হাসপাতালে নিয়ে যান। প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ ও আঘাতে তিনি কখনো জ্ঞান হারাচ্ছিলেন, আবার কখনো জ্ঞান ফিরে পাচ্ছিলেন।
সেই অবস্থায় তাঁর মনে হচ্ছিল, জীবন যেন ধীরে ধীরে শরীর ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও তিনি তাঁর এক বছরের মেয়ে অগাস্টের কথা ভাবছিলেন।
লেয়া বলেন, তাঁর মনে হয়েছিল, তিনি যদি মারা যান, তাহলে তাঁর মেয়ে মাকে ছাড়াই বড় হবে। এই চিন্তা তিনি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না। মেয়েকে মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত হতে দেবেন না—এই তীব্র আকাঙ্ক্ষাই যেন তাঁকে মৃত্যুর বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি দেয়।
নতুন জীবন শুরু করার প্রত্যয়
ভয়াবহ সেই ঘটনার পর কয়েক সপ্তাহ তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। শরীরে স্থায়ী পরিবর্তন এলেও লেয়া বলছেন, তিনি নিজের প্রতিবন্ধকতাকে জীবনের পথে বাধা হতে দিতে চান না।
বিশেষ করে মেয়েকে কোলে তুলে নেওয়ার মতো সাধারণ কাজ এখন তাঁর জন্য কঠিন হয়ে গেছে। মেয়ে যখন দুই হাত বাড়িয়ে মায়ের কোলে উঠতে চায়, তখন তাকে তুলে নিতে না পারার কষ্ট তাঁকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়।
তবু লেয়া মনে করেন, তিনি জীবনের দ্বিতীয় সুযোগ পেয়েছেন। এই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে নিজের সেরাটা দেওয়ার জন্য তিনি লড়াই চালিয়ে যেতে চান।
হাঙরের হামলার শিকার এক নারী হিসেবে নয়, বরং হাঙরের মুখে ঘুষি মেরে জীবন ফিরে পাওয়া একজন মানুষ হিসেবেই নিজেকে দেখতে চান লেয়া। তাঁর কাছে এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা শুধু বেঁচে ফেরার গল্প নয়, বরং অসীম সাহস ও মাতৃত্বের শক্তির এক অনন্য উদাহরণ।
কন্যার জন্য মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে লড়াই করা সেই নারী আজ বলছেন, তিনি আগের সেই মানুষটি আর নন। ভয়াবহ ঘটনার অন্য প্রান্ত থেকে তিনি ফিরে এসেছেন নতুন এক শক্তি ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে।
সিডনির সমুদ্রসৈকতের সেই দিন তাঁকে বদলে দিয়েছে। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় এখন আর শুধু হাঙরের হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া নারী নয়—তিনি সেই মা, যিনি নিজের মেয়ের কাছে ফিরে আসতে মৃত্যুকেও হার মানিয়েছেন।
সিডনিতে হাঙরের ভয়াবহ হামলা, মেয়েকে বাঁচিয়ে রাখার আকাঙ্ক্ষা এবং বিশাল সাদা হাঙরের মুখে ঘুষি মেরে মায়ের অবিশ্বাস্যভাবে বেঁচে ফেরার কাহিনি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















