০২:১৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬
কৃষিঋণের ১ হাজার কোটি টাকার তহবিলের বড় অংশ অন্য খাতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে অনিয়ম পরপর দুই দিন ডেঙ্গু রোগীর রেকর্ড, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২ হাজার ৪০২ জন নতুন শিক্ষাবর্ষের আগে রুশ হামলায় ইউক্রেনের ধ্বংস ১ কোটি ২০ লাখ বই উত্তর সাইপ্রাসের উপকূলে ফেরি ডুবে নিহত ৮, নিখোঁজ ১৮ মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে মারধরের অভিযোগ যুবদল নেতার বিরুদ্ধে দেশের বাজারে স্বর্ণের দামে পতন, ভরিতে কমলো ৪ হাজার ৪৭৪ টাকা ফতুল্লা থানার গারদে মোবাইল হাতে ১০ আসামি, ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের ভিডিও ভাইরাল গুরুতর অসুস্থ শিশুর বাবা-মায়ের ১২ সপ্তাহ বেতনসহ ছুটির দাবি সালমান এফ রহমানের পক্ষে ট্রাইব্যুনালে লড়তে বিদেশি আইনজীবীর আবেদন মোবাইলের বিষণ্ন স্ক্রলিং ছেড়ে বাগানেই শান্তি খুঁজছেন তরুণেরা

সন্তানদের মধ্যে অর্থের বৈষম্যেই কি ভাঙে পরিবারের সম্পর্ক?

এক সন্তানকে বাড়ি কেনার জন্য বড় অঙ্কের অর্থ দেওয়া হয়েছে, অথচ অন্য সন্তানকে প্রয়োজনে ঋণও দেওয়া হচ্ছে না—এমন পরিস্থিতি অনেক পরিবারেই ভাই-বোনের মধ্যে ক্ষোভ ও দূরত্ব তৈরি করতে পারে। অর্থের এই বৈষম্য অনেক সময় শুধু টাকার হিসাব থাকে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে যায় ভালোবাসা, গুরুত্ব পাওয়া এবং ন্যায্যতার অনুভূতি।

টাকা নয়, আসল সমস্যা অন্য জায়গায়

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাই-বোনের মধ্যে অর্থ নিয়ে বিরোধের পেছনে প্রকৃত কারণ প্রায়ই টাকা নয়। বাবা-মা একজনকে বেশি আর অন্যজনকে কম সহায়তা করলে কেউ কেউ সেটিকে পক্ষপাতিত্ব, কম ভালোবাসা কিংবা নিজের প্রতি অবমূল্যায়ন হিসেবে দেখতে পারেন।

আবার বাবা-মায়ের সিদ্ধান্তের পেছনে বাস্তব কারণও থাকতে পারে। কোনো সন্তানের আয় কম হতে পারে, অসুস্থতার কারণে তার বেশি সহায়তা দরকার হতে পারে, কিংবা বাড়ির ক্রমবর্ধমান দামের কারণে নিজের ঘর কেনার জন্য তার তুলনামূলক বেশি অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু এসব কারণ সন্তানদের কাছে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা না করা হলে ভুল বোঝাবুঝি ও ক্ষোভ তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে।

একই পরিবারে ভিন্ন অভিজ্ঞতা

লন্ডনে অর্থ খাতে কর্মরত ২৬ বছর বয়সী এলিস জানান, তার পরিবারে ভাই-বোনেরা বিভিন্ন সময়ে বাবা-মায়ের কাছ থেকে ভিন্ন মাত্রায় আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন। তবে বিষয়টি তাদের মধ্যে কোনো সমস্যা তৈরি করেনি।

অন্যদিকে সাত ভাই-বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট তাশা জানান, তার ভাই-বোনদের মধ্যে বাবা-মায়ের পক্ষপাতিত্ব নিয়ে মতবিরোধ হয়েছে। যদিও তার নিজের ধারণা, বাবা-মা সবাইকে সমানভাবেই দেখেন।

তার মতে, অনিশ্চয়তা ও ঈর্ষা মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হতে পারে। কখনো কেউ কিছুদিন কথা না বলে নিজের অনুভূতি সামলে নেন, পরে আবার আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করেন।

উত্তরাধিকারেও পুরোনো ক্ষোভ ফিরে আসে

সমস্যা আরও জটিল হতে পারে বাবা-মায়ের সম্পত্তি বণ্টনের সময়। কোনো সন্তান যদি জীবদ্দশায় বাড়ি কেনার জন্য অন্যদের তুলনায় বেশি অর্থ পেয়ে থাকে এবং বাবা-মা বলে থাকেন যে ভবিষ্যৎ সম্পত্তি বণ্টনে সেটি বিবেচনায় নেওয়া হবে, কিন্তু পরে উত্তরাধিকারে সবাইকে সমান অংশ দেওয়ার কথা লেখা থাকে, তখন পুরোনো ক্ষোভ আবার সামনে আসতে পারে।

পারিবারিক বিরোধ নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের মতে, বাবা-মায়ের উচিত জীবিত থাকতেই সন্তানদের কাছে নিজেদের ইচ্ছা ও সিদ্ধান্তের বিষয়টি পরিষ্কার করে বলা। এতে ভবিষ্যতে ভুল বোঝাবুঝি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

অর্থ নিয়ে কথা না বললে বাড়ে ক্ষোভ

তবে সব পরিবারে অর্থ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা সহজ নয়। প্রতিবেদনে জন নামের এক ব্যক্তি জানান, তাদের পরিবারে বেতন, সঞ্চয় কিংবা আর্থিক সহায়তা—কোনো বিষয়েই অর্থ নিয়ে আলোচনা করা হয় না। নিজের অনুভূতির কথা বলার চেষ্টা করলেও বাবা-মা বিষয়টি এড়িয়ে যান।

এ কারণে তিনি ভবিষ্যৎ আর্থিক পরিকল্পনা এমনভাবে করছেন, যেন বাবা-মায়ের কাছ থেকে কোনো উত্তরাধিকার পাবেন না। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, বাবা-মা অসুস্থ হয়ে পড়লে বা নিজেদের আর্থিক ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা হারালে তার কাছ থেকেই সহযোগিতা প্রত্যাশা করা হতে পারে।

ভাইয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো থাকলেও বাবা-মায়ের তৈরি করা আর্থিক ভারসাম্যহীনতার কারণে তার মধ্যে ক্ষোভ রয়ে গেছে।

সমাধানের পথ খোলা রাখাই জরুরি

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, ভাই-বোনের মধ্যে অর্থ নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে প্রথমেই বোঝার চেষ্টা করতে হবে—বিতর্কটি আসলে অর্থ নিয়ে, নাকি সমান গুরুত্ব ও ন্যায্য আচরণ পাওয়ার অনুভূতি নিয়ে।

একই সঙ্গে অন্য ভাই-বোনের আর্থিক অবস্থা কিংবা বাবা-মায়ের সিদ্ধান্তের কারণ সম্পর্কে অনুমান না করে খোলামেলা ও সম্মানজনক আলোচনা করা জরুরি। বাবা-মায়েরও উচিত সন্তানদের ভিন্নভাবে আর্থিক সহায়তা করার কারণ স্পষ্টভাবে জানানো।

আলোচনা বারবার ব্যর্থ হলে পারিবারিক পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে সরাসরি আইনি পথে যাওয়ার আগে মধ্যস্থতার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করাও কার্যকর হতে পারে।

সম্পর্ক রক্ষাই শেষ কথা

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাই-বোনের মধ্যে তীব্র বিরোধ তৈরি হলেও অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক বন্ধন পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না। বিরোধের মূল কারণটি চিহ্নিত করে সেটি নিয়ে কথা বলতে পারলে সম্পর্ক আবার স্বাভাবিক হওয়ার সুযোগ থাকে।

অর্থের চেয়ে বড় হয়ে উঠতে পারে অবহেলার অনুভূতি। তাই সন্তানদের মধ্যে আর্থিক সহায়তার পার্থক্য থাকলেও তার কারণ স্পষ্ট করে বলা এবং প্রত্যেকের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়াই পারে পরিবারে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষোভ ঠেকাতে।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

কৃষিঋণের ১ হাজার কোটি টাকার তহবিলের বড় অংশ অন্য খাতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে অনিয়ম

সন্তানদের মধ্যে অর্থের বৈষম্যেই কি ভাঙে পরিবারের সম্পর্ক?

১২:৫৯:৪০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬

এক সন্তানকে বাড়ি কেনার জন্য বড় অঙ্কের অর্থ দেওয়া হয়েছে, অথচ অন্য সন্তানকে প্রয়োজনে ঋণও দেওয়া হচ্ছে না—এমন পরিস্থিতি অনেক পরিবারেই ভাই-বোনের মধ্যে ক্ষোভ ও দূরত্ব তৈরি করতে পারে। অর্থের এই বৈষম্য অনেক সময় শুধু টাকার হিসাব থাকে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে যায় ভালোবাসা, গুরুত্ব পাওয়া এবং ন্যায্যতার অনুভূতি।

টাকা নয়, আসল সমস্যা অন্য জায়গায়

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাই-বোনের মধ্যে অর্থ নিয়ে বিরোধের পেছনে প্রকৃত কারণ প্রায়ই টাকা নয়। বাবা-মা একজনকে বেশি আর অন্যজনকে কম সহায়তা করলে কেউ কেউ সেটিকে পক্ষপাতিত্ব, কম ভালোবাসা কিংবা নিজের প্রতি অবমূল্যায়ন হিসেবে দেখতে পারেন।

আবার বাবা-মায়ের সিদ্ধান্তের পেছনে বাস্তব কারণও থাকতে পারে। কোনো সন্তানের আয় কম হতে পারে, অসুস্থতার কারণে তার বেশি সহায়তা দরকার হতে পারে, কিংবা বাড়ির ক্রমবর্ধমান দামের কারণে নিজের ঘর কেনার জন্য তার তুলনামূলক বেশি অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু এসব কারণ সন্তানদের কাছে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা না করা হলে ভুল বোঝাবুঝি ও ক্ষোভ তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে।

একই পরিবারে ভিন্ন অভিজ্ঞতা

লন্ডনে অর্থ খাতে কর্মরত ২৬ বছর বয়সী এলিস জানান, তার পরিবারে ভাই-বোনেরা বিভিন্ন সময়ে বাবা-মায়ের কাছ থেকে ভিন্ন মাত্রায় আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন। তবে বিষয়টি তাদের মধ্যে কোনো সমস্যা তৈরি করেনি।

অন্যদিকে সাত ভাই-বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট তাশা জানান, তার ভাই-বোনদের মধ্যে বাবা-মায়ের পক্ষপাতিত্ব নিয়ে মতবিরোধ হয়েছে। যদিও তার নিজের ধারণা, বাবা-মা সবাইকে সমানভাবেই দেখেন।

তার মতে, অনিশ্চয়তা ও ঈর্ষা মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হতে পারে। কখনো কেউ কিছুদিন কথা না বলে নিজের অনুভূতি সামলে নেন, পরে আবার আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করেন।

উত্তরাধিকারেও পুরোনো ক্ষোভ ফিরে আসে

সমস্যা আরও জটিল হতে পারে বাবা-মায়ের সম্পত্তি বণ্টনের সময়। কোনো সন্তান যদি জীবদ্দশায় বাড়ি কেনার জন্য অন্যদের তুলনায় বেশি অর্থ পেয়ে থাকে এবং বাবা-মা বলে থাকেন যে ভবিষ্যৎ সম্পত্তি বণ্টনে সেটি বিবেচনায় নেওয়া হবে, কিন্তু পরে উত্তরাধিকারে সবাইকে সমান অংশ দেওয়ার কথা লেখা থাকে, তখন পুরোনো ক্ষোভ আবার সামনে আসতে পারে।

পারিবারিক বিরোধ নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের মতে, বাবা-মায়ের উচিত জীবিত থাকতেই সন্তানদের কাছে নিজেদের ইচ্ছা ও সিদ্ধান্তের বিষয়টি পরিষ্কার করে বলা। এতে ভবিষ্যতে ভুল বোঝাবুঝি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

অর্থ নিয়ে কথা না বললে বাড়ে ক্ষোভ

তবে সব পরিবারে অর্থ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা সহজ নয়। প্রতিবেদনে জন নামের এক ব্যক্তি জানান, তাদের পরিবারে বেতন, সঞ্চয় কিংবা আর্থিক সহায়তা—কোনো বিষয়েই অর্থ নিয়ে আলোচনা করা হয় না। নিজের অনুভূতির কথা বলার চেষ্টা করলেও বাবা-মা বিষয়টি এড়িয়ে যান।

এ কারণে তিনি ভবিষ্যৎ আর্থিক পরিকল্পনা এমনভাবে করছেন, যেন বাবা-মায়ের কাছ থেকে কোনো উত্তরাধিকার পাবেন না। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, বাবা-মা অসুস্থ হয়ে পড়লে বা নিজেদের আর্থিক ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা হারালে তার কাছ থেকেই সহযোগিতা প্রত্যাশা করা হতে পারে।

ভাইয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো থাকলেও বাবা-মায়ের তৈরি করা আর্থিক ভারসাম্যহীনতার কারণে তার মধ্যে ক্ষোভ রয়ে গেছে।

সমাধানের পথ খোলা রাখাই জরুরি

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, ভাই-বোনের মধ্যে অর্থ নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে প্রথমেই বোঝার চেষ্টা করতে হবে—বিতর্কটি আসলে অর্থ নিয়ে, নাকি সমান গুরুত্ব ও ন্যায্য আচরণ পাওয়ার অনুভূতি নিয়ে।

একই সঙ্গে অন্য ভাই-বোনের আর্থিক অবস্থা কিংবা বাবা-মায়ের সিদ্ধান্তের কারণ সম্পর্কে অনুমান না করে খোলামেলা ও সম্মানজনক আলোচনা করা জরুরি। বাবা-মায়েরও উচিত সন্তানদের ভিন্নভাবে আর্থিক সহায়তা করার কারণ স্পষ্টভাবে জানানো।

আলোচনা বারবার ব্যর্থ হলে পারিবারিক পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে সরাসরি আইনি পথে যাওয়ার আগে মধ্যস্থতার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করাও কার্যকর হতে পারে।

সম্পর্ক রক্ষাই শেষ কথা

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাই-বোনের মধ্যে তীব্র বিরোধ তৈরি হলেও অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক বন্ধন পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না। বিরোধের মূল কারণটি চিহ্নিত করে সেটি নিয়ে কথা বলতে পারলে সম্পর্ক আবার স্বাভাবিক হওয়ার সুযোগ থাকে।

অর্থের চেয়ে বড় হয়ে উঠতে পারে অবহেলার অনুভূতি। তাই সন্তানদের মধ্যে আর্থিক সহায়তার পার্থক্য থাকলেও তার কারণ স্পষ্ট করে বলা এবং প্রত্যেকের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়াই পারে পরিবারে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষোভ ঠেকাতে।