সারাক্ষণ মোবাইলের পর্দায় নেতিবাচক খবর, উদ্বেগ আর অস্থিরতার মধ্যে ডুবে থাকার বদলে গাছপালা, মাটি আর ফুলের কাছে ফিরছেন একদল তরুণ। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে জন্ম নেওয়া তরুণদের মধ্যে বাগান করা এখন শুধু শখ নয়, বরং মানসিক স্বস্তি, সৃজনশীলতা ও সামাজিক যোগাযোগের নতুন মাধ্যম হয়ে উঠছে।
শোক সামলাতে বাগানের আশ্রয়
৩১ বছর বয়সী হান্না ম্যাথিউজের কাছে বাগান হয়ে উঠেছিল কঠিন সময় পার হওয়ার আশ্রয়। এক বছরের ব্যবধানে বাবা ও দাদিকে হারানোর পর তিনি নিজের বাড়ির বাগানে সময় কাটাতে শুরু করেন।
হান্না জানান, মন যখন নানা চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠত, তখন ভোরে উঠে আগাছা পরিষ্কার করতে শুরু করতেন তিনি। ধীরে ধীরে বাগানের কাজ তার দৈনন্দিন জীবনের আনন্দের অংশ হয়ে ওঠে।
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার অনুসারীর সংখ্যা ৭০ হাজারের বেশি। তার মতে, বাগানকেন্দ্রিক অনলাইন সম্প্রদায় দ্রুত বড় হচ্ছে। নেতিবাচক খবর আর উদ্বেগে ভরা পর্দার জগতে বাগানের ছবি ও গল্প মানুষকে কিছুটা প্রশান্তি দিতে পারে।

অতিরিক্ত প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ
হান্নার জন্ম ১৯৯৫ সালে। তার প্রজন্ম এমন এক সময়ে বড় হয়েছে, যখন একদিকে ছিল প্রযুক্তির আগের সরল জীবন, অন্যদিকে দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে ডিজিটাল সংস্কৃতি।
তার মতে, রান্না, সেলাই ও বাগান করার মতো হাতে-কলমে কাজগুলো অতিরিক্ত প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের বিরুদ্ধে এক ধরনের নীরব প্রত্যাখ্যান। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের কারণে তরুণদের জন্য বর্তমান সময়ও সহজ নয়।
এই পরিস্থিতিতে নিজের ছোট্ট জায়গাটুকুর ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার অনুভূতি বাগান থেকে পাওয়া যায় বলে মনে করেন তিনি। বাড়ির উঠান না থাকলেও জানালার ধারে কয়েকটি টব কিংবা রান্নাঘরের পাশে ছোট গাছ দিয়েই শুরু করা সম্ভব।
মহামারির সময় শুরু, এখন বড় সম্প্রদায়
৩২ বছর বয়সী নাওমি সন্ডার্স মহামারির সময় বাগান করা শুরু করেছিলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তার বাড়িতে তিন শতাধিক গাছের সংগ্রহ তৈরি হয়।
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের গাছপালা ও সবজি চাষের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে শুরু করেন। তখন বাগানকেন্দ্রিক বিষয়বস্তু এতটা জনপ্রিয় ছিল না। সময়ের সঙ্গে তার অনুসারী বাড়তে থাকে এবং সম্প্রতি তিনি চেলসি ফুল প্রদর্শনীতেও নিজের কাজ তুলে ধরার সুযোগ পান।

নাওমির মতে, তরুণেরা এখন ফোন কিছুক্ষণের জন্য নামিয়ে রাখার প্রয়োজন আগের চেয়ে বেশি অনুভব করছেন। বাগানকে ঘিরে তৈরি হওয়া অনলাইন সম্প্রদায়ের আরেকটি বিশেষ দিক হলো—এখানে মানুষ একে অপরের সাফল্য দেখতে চায় এবং জ্ঞান, বীজ ও গাছের কলম ভাগ করে নেয়।
একটুখানি বাগান, একটুখানি নিজের সময়
৩৭ বছর বয়সী র্যাচেল গ্রিফিথসের কাছেও বাগান কঠিন সময় পার হওয়ার অবলম্বন হয়ে উঠেছিল। মহামারির সময় চারপাশের পরিস্থিতি যখন অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল, তখন তিনি বাগানের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হন।
দুই সন্তানের মা র্যাচেল জানান, নিজের জন্য সময় বের করার ক্ষেত্রে বাগান ছিল সহজ একটি পথ। বাইরে যেতে, কারও সঙ্গে দেখা করতে কিংবা বিশেষ প্রস্তুতি নিতে হতো না। সন্তান ঘুমিয়ে পড়লে মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্যও তিনি বাগানে গিয়ে নিজের মতো করে কিছুটা সময় কাটাতে পারতেন।
চরম গরমের সময়ও নিজের বাগানকে তিনি পরিবারের জন্য আশার জায়গা হিসেবে দেখেছেন। তার বিশ্বাস, একজন মানুষ একা পৃথিবী বদলে দিতে না পারলেও প্রত্যেকে নিজের জায়গা থেকে ছোট ছোট কিছু উদ্যোগ নিলে তার সম্মিলিত প্রভাব বড় হতে পারে।
তরুণদের নতুন সামাজিক আড্ডা
২৬ বছর বয়সী জর্জিয়া ফেদারস্টোন কাজের কারণে নতুন এলাকায় যাওয়ার পর পরিচিত মানুষ তৈরি করার উপায় খুঁজছিলেন। তখন তিনি নারীদের জন্য একটি বাগান ক্লাব গড়ে তোলেন।
তার মতে, প্রচলিত অনেক বাগান ক্লাবেই অভিজ্ঞ ও বয়স্ক মানুষের প্রাধান্য রয়েছে। ফলে নতুন প্রজন্মের অনেকেই সেখানে নিজেদের স্বচ্ছন্দ মনে করেন না।
মাত্র দুই মাসের মধ্যে তার গড়ে তোলা দলের আলোচনাগোষ্ঠীতে ৪৫০ জনের বেশি মানুষ যুক্ত হয়েছেন। তারা স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন, গাছপালা নিয়ে কথা বলছেন এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছেন।

জর্জিয়ার ভাষায়, তরুণ প্রজন্মের অনেকেই প্রতি সপ্তাহান্তে পানশালায় যাওয়ার পুরোনো অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষকে একই সঙ্গে সংযুক্ত ও বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। তার বিপরীতে বাগান মানুষকে বাস্তব জীবনে একে অপরের কাছে নিয়ে আসছে।
মাটির কাছে ফিরে আসার নতুন আকর্ষণ
তরুণদের বাগানমুখী হওয়ার পেছনে তাই শুধু গাছ লাগানোর আনন্দ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানসিক প্রশান্তি, নিজের হাতে কিছু সৃষ্টি করার আনন্দ, প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক এবং বাস্তব সামাজিক যোগাযোগের আকাঙ্ক্ষা।
বাগানের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—এর জন্য বিশাল জায়গা কিংবা বিপুল অর্থের প্রয়োজন নেই। একটি ছোট টব, কয়েকটি বীজ এবং নিয়মিত একটু সময় দিয়েও শুরু করা যায়।
ডিজিটাল দুনিয়ার অবিরাম নেতিবাচকতার মধ্যে তাই মাটি খোঁড়া, বীজ বোনা আর নতুন পাতা গজানোর অপেক্ষা তরুণদের কাছে হয়ে উঠছে এক ধরনের নীরব স্বস্তি। পর্দার অসীম স্ক্রলিংয়ের বদলে তারা এখন জীবন্ত কিছু বড় হতে দেখার আনন্দ খুঁজে নিচ্ছেন।


সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















