দিনের বেলায় পদ্মা নদীর তীরে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর সদীপুর নৌঘাটসংলগ্ন এলাকা অনেকটাই নির্জন। সবুজ ত্রিপলের নিচে পড়ে থাকে পুরোনো ব্যাটারির স্তূপ। তবে রাত নামলেই বদলে যায় দৃশ্যপট। শুরু হয় পুরোনো ব্যাটারি ভাঙা ও পুড়িয়ে সীসা আহরণের কাজ।
কুমারখালী উপজেলার চরসাদীপুর ইউনিয়নের দেলোয়ার হোসেনের ইটভাটা এলাকায় পদ্মার উত্তর তীরে গড়ে উঠেছে এই অবৈধ ব্যাটারি রিসাইক্লিং কারখানা। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় দেড় মাস ধরে রাতের আঁধারে চলছে কারখানাটির কার্যক্রম। সেখানে শত শত পুরোনো লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি ভেঙে কয়লা ও কাঠের আগুনে পোড়ানো হচ্ছে। এতে আশপাশে ছড়িয়ে পড়ছে বিষাক্ত ধোঁয়া।
রাতে আসে ব্যাটারিভর্তি ট্রাক
কারখানায় কর্মরত কয়েকজন শ্রমিক পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, পাবনার মনির হোসেন নামের এক ব্যক্তি কারখানাটির মালিক। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সহযোগিতায় তিনি এটি পরিচালনা করছেন বলে তাদের দাবি।

এক স্থানীয় কৃষক জানান, রাত সাড়ে ১১টার পর পুরোনো ব্যাটারিবোঝাই ট্রাক সেখানে আসতে শুরু করে। রাত ১২টার দিকে ব্যাটারি পোড়ানোর কাজ শুরু হয়। দিনের বেলায় অবশ্য কারখানাটি প্রায় বন্ধই থাকে।
পদ্মার তীরবর্তী কৃষিজমি নিয়ে শঙ্কা
কারখানাটির কার্যক্রম নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে রয়েছেন নদীতীরের কৃষকেরা। ওই এলাকায় শত শত বিঘা জমিতে কলা, সবজিসহ বিভিন্ন ফসল চাষ হয়। স্থানীয়দের আশঙ্কা, ব্যাটারি পোড়ানোর ধোঁয়া, দূষিত ধুলা ও বিভিন্ন রাসায়নিক মাটি ও পানিতে মিশে কৃষিজমির ক্ষতি করতে পারে।
এক কৃষক অভিযোগ করেন, অবিলম্বে ব্যবস্থা না নিলে নদীতীরের জমিতে উৎপাদিত কলা ও সবজিসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
স্থানীয় বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
কারখানাটি পরিচালনায় চরসাদীপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হাফিজুর রহমান টিক্কা এবং বিএনপির কর্মী জালাল ও হজরত সহযোগিতা করছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় এক কৃষক। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন টিক্কা।
তিনি বলেন, সেখানে কী হচ্ছে তা তিনি জানেন না এবং কারখানার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এ বিষয়ে মনিরের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।

চরসাদীপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গোলাম আজমও দলীয় নেতা-কর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, প্রায় ১৫ দিন আগে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সেখানে গিয়ে শ্রমিকদের সরিয়ে দিয়েছিলেন। বর্তমানে কারখানাটি চলছে কি না, তা তিনি জানেন না।
কারখানার মালিকের স্বীকারোক্তি
অভিযোগের বিষয়ে মনির হোসেন স্বীকার করেন, সেখানে ব্যাটারি পোড়ানো ও সীসা আহরণের কাজ হচ্ছে। ফোনে তিনি জানান, প্রায় দেড় মাস ধরে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ‘ম্যানেজ’ করে কারখানাটি চালানো হচ্ছে। তবে তার দাবি, এ কাজ লাভজনক নয় এবং প্রবল বাতাসের কারণে অনেক দিন কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কুষ্টিয়া কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (সিনিয়র কেমিস্ট) হাবিবুল বাসার জানান, ব্যাটারিতে সালফিউরিক অ্যাসিডসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর উপাদান থাকে। ব্যাটারি ভেঙে সীসা আহরণ করলে বাতাসে সীসার মাত্রা বাড়ে, যা পরিবেশ ও মাটির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় দুই মাস ধরে কারখানাটি চললেও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে কুমারখালী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাভিদ সারওয়ার জানিয়েছেন, অবৈধ কারখানাটিতে শিগগিরই অভিযান চালানো হবে। এদিকে পদ্মার তীরের কৃষকেরা জমি, পানি ও ফসল দূষণের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে আছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















