হংকংয়ে একের পর এক কুকুরের হামলার ঘটনার পর বিপজ্জনক কুকুর নিয়ন্ত্রণে সরকারি অভিযান জোরদার হয়েছে। আর এরই প্রভাবে কুকুরের বংশগত পরিচয় যাচাইয়ের পরীক্ষার চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে প্রাণীকল্যাণ সংগঠনগুলো আশঙ্কা করছে, কঠোর অভিযানের কারণে অনেক মালিক আতঙ্কে পোষা কুকুর রাস্তায় ছেড়ে দিতে পারেন।
হামলার পর কুকুরের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন
সাম্প্রতিক একটি ঘটনায় ৩৩ বছর বয়সী একটি পোষা প্রাণী প্রশিক্ষণকেন্দ্রের মালিককে একটি মিশ্র জাতের লড়াকু কুকুর আক্রমণ করে। পরে ওই নারীকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। কুকুরটি নিবন্ধনের সময় মিশ্র জাতের সাধারণ কুকুর হিসেবে নথিভুক্ত ছিল।
ঘটনার পর হংকংয়ের কুকুর নিবন্ধন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, বর্তমানে মালিকের নিজের দেওয়া তথ্যের ওপর অনেকটাই নির্ভর করে কুকুরের জাত নির্ধারণ করা হয়। অথচ নিষিদ্ধ লড়াকু জাতের কুকুরের সঙ্গে জিনগত মিল থাকা একটি কুকুরও সাধারণ মিশ্র জাত হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছিল।
জিনগত পরীক্ষার চাহিদা কয়েক গুণ

প্রাণী চিকিৎসাসেবার সঙ্গে যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক মাক চি-হো জানিয়েছেন, সরকারি অভিযান জোরদার হওয়ার পর অনেক মালিক তাদের কুকুরের জিনগত পরীক্ষা করাতে আসছেন। এতে কিছু পরীক্ষাকেন্দ্রে কাজের চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
পোষা প্রাণীর জিনগত পরীক্ষা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ক্লেমেন্ট লাই ইয়াত-লুং জানান, গত এক সপ্তাহে তাদের কাছে প্রতিদিন প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি পরীক্ষার বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে। অথচ সাধারণ সময়ে এমন অনুসন্ধানের সংখ্যা থাকে প্রায় ১০টি।
বিশেষ করে মিশ্র জাতের কুকুরের মালিকেরা বেশি উদ্বিগ্ন। তাদের আশঙ্কা, সরকারি কর্মকর্তারা কুকুরের জাত নিয়ে সন্দেহ করলে সেটি জব্দ করতে পারেন। তাই জিনগত পরীক্ষার মাধ্যমে কুকুরটি নিষিদ্ধ কোনো জাতের নয়—এমন প্রমাণ হাতে রাখতে চাইছেন তারা।
চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পরীক্ষার ফল দেওয়ার সময়ও কমিয়ে আনা হয়েছে। আগে যেখানে প্রায় ৩০ দিন লাগত, এখন তা ১০ দিনের মধ্যে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ছুটে বেড়ানো কুকুর নিয়ে বড় আশঙ্কা
প্রাণীকল্যাণকর্মীদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, কঠোর অভিযান কুকুর পরিত্যাগের ঘটনা বাড়িয়ে দিতে পারে।
প্রাণীকল্যাণ নিয়ে কাজ করা একটি সংগঠনের সমন্বয়কারী লাউ চুন-হোই জানিয়েছেন, এক মাসের ব্যবধানে কুকুর পরিত্যাগের ঘটনা প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। তিনি নিজেই ১৬টি এমন ঘটনা সামলেছেন বলে জানান।
তার মতে, সন্দেহভাজন লড়াকু কুকুর হঠাৎ জব্দ করার ঘটনায় অনেক মালিক আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। দীর্ঘ সময় আটকে রাখলে কুকুরের আচরণেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, লড়াকু কুকুর নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। তবে বর্তমান অভিযান খুব দ্রুত ও আকস্মিকভাবে চালানো হচ্ছে। এতে মালিকেরা কী করবেন, তা বুঝতে পারছেন না।
এক বছরের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব

পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রাণীকল্যাণ সংগঠনটি এক বছরের একটি সুযোগ রাখার প্রস্তাব দিয়েছে। এই সময়ের মধ্যে মালিকেরা নিজেদের কুকুরের মধ্যে লড়াকু জাতের বৈশিষ্ট্য আছে বলে মনে করলে তা স্বেচ্ছায় কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারবেন।
লাউয়ের মতে, প্রতিটি কুকুরকে নতুন করে পরীক্ষা করা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ হংকংয়ে বিপুলসংখ্যক মিশ্র জাতের কুকুর রয়েছে। একটি কুকুরের মাথা তুলনামূলক বড় বা শরীর শক্তিশালী হলেই তাকে লড়াকু কিংবা বিপজ্জনক কুকুর হিসেবে চিহ্নিত করার ঝুঁকি রয়েছে।
নিবন্ধন ব্যবস্থায় পরিবর্তনের দাবি
আইনপ্রণেতা চান, কুকুরের জাত নির্ধারণে ছবি বিশ্লেষণ ও জিনগত পরীক্ষার মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করা হোক। পাশাপাশি কোনো কুকুরকে বিপজ্জনক বা নিষিদ্ধ জাত হিসেবে চিহ্নিত করা হলে মালিকের আপিলের সুস্পষ্ট ব্যবস্থাও থাকা উচিত।
তিনি আরও বলেন, চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে অবৈধভাবে কুকুর আনা এবং অনুমোদনহীন প্রজননও সমস্যাটিকে জটিল করছে। কিছু দোকান গ্রাহকদের কীভাবে বিধিনিষেধ এড়িয়ে কুকুর আনা যায়, সে বিষয়ে পরামর্শ দেয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
হংকংয়ের আইন অনুযায়ী, মূল ভূখণ্ড থেকে আনা সব কুকুর ও বিড়ালকে বাধ্যতামূলকভাবে ৩০ দিনের কোয়ারেন্টিনে রাখতে হয়। লাইসেন্স ছাড়া লড়াকু কুকুর আমদানি, প্রজনন, বিক্রি বা পালন নিষিদ্ধ।
নিষিদ্ধ লড়াকু কুকুরের মালিকের কাছে প্রাণীটি নির্বীজ করা হয়েছে—এমন পশুচিকিৎসা সনদ না থাকলেও অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার হংকং ডলার জরিমানা এবং ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
এ ছাড়া ২০ কেজি বা তার বেশি ওজনের কুকুরকে জনসমক্ষে সর্বোচ্চ দুই মিটার দৈর্ঘ্যের দড়ি দিয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখার নিয়ম রয়েছে। এই বিধি ভাঙলে সর্বোচ্চ তিন মাস কারাদণ্ড ও ২৫ হাজার হংকং ডলার জরিমানার বিধান রয়েছে।
কুকুরের হামলার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী জন লি কা-চিউ বিপজ্জনক কুকুর সংক্রান্ত আইন ও শাস্তির বিধান পর্যালোচনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















