ভারতের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী পরিবারের দীর্ঘ ইতিহাস, ব্যক্তিগত শোক, ক্ষমতার অন্তরালের সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক উত্তরাধিকার—সবকিছু নিয়েই এবার নিজের ভাষ্যে কথা বলতে চলেছেন সোনিয়া গান্ধী। তাঁর আত্মজীবনী ‘বিলংগিং: আ জার্নি অব লাভ’ নভেম্বরে প্রকাশিত হওয়ার কথা। বইটি প্রকাশের আগেই ভারতীয় রাজনীতিতে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
রাজনীতিতে অনিচ্ছুক এক নারীর উত্থান
১৯৯৮ সালে ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের সভাপতি হওয়ার সময় সোনিয়া গান্ধী ছিলেন অনেকের কাছেই রহস্যময় এক রাজনৈতিক চরিত্র। ইতালিতে জন্ম নেওয়া এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর স্ত্রী সোনিয়া দীর্ঘদিন রাজনীতির আলো থেকে নিজেকে দূরে রেখেছিলেন। কিন্তু কংগ্রেসের নেতৃত্ব গ্রহণের পর ধীরে ধীরে তিনি দলের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নেতায় পরিণত হন।
প্রকাশকের তথ্য অনুযায়ী, আত্মজীবনীর শুরু ১৯৬৫ সালের ক্যামব্রিজে। তখন ১৯ বছর বয়সী ইতালীয় তরুণী সোনিয়া মাইনো প্রেমে পড়েন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর নাতি রাজীব গান্ধীর। শৈশবের ইতালি থেকে শুরু করে প্রেম, সংসার, রাজনৈতিক ক্ষমতা, নির্বাসন ও ভয়াবহ ব্যক্তিগত ক্ষতির মধ্য দিয়ে তাঁর ভারতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে পৌঁছে যাওয়ার গল্প উঠে আসবে বইটিতে।
ইন্দিরা ও রাজীবের মৃত্যু

সোনিয়ার জীবনের সবচেয়ে গভীর ট্র্যাজেডিগুলোর একটি ছিল ১৯৮৪ সালে শাশুড়ি ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ড। নিজের দেহরক্ষীদের গুলিতে আহত ইন্দিরাকে তিনি হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন। সাত বছর পর ১৯৯১ সালে আত্মঘাতী হামলায় নিহত হন তাঁর স্বামী রাজীব গান্ধী। এই দুই হত্যাকাণ্ড শুধু গান্ধী পরিবারের জীবনই বদলে দেয়নি, ভারতীয় রাজনীতির গতিপথও পাল্টে দিয়েছিল।
আত্মজীবনীতে তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—রাজীবের রাজনীতিতে প্রবেশ ঠেকাতে তিনি কেন এতটা চেষ্টা করেছিলেন, সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে তাঁর ভয় কতটা গভীর ছিল এবং শেষ পর্যন্ত কেন তিনি মনে করলেন গান্ধী পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধরে রাখা প্রয়োজন।
২০০৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ কেন ফিরিয়ে দিয়েছিলেন?
আত্মজীবনীর সবচেয়ে আলোচিত অংশ হতে পারে ২০০৪ সালের সেই সিদ্ধান্ত। কংগ্রেস নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের সুযোগ পাওয়ার পর দলের নেতা ও জোটসঙ্গীদের সমর্থন থাকা সত্ত্বেও সোনিয়া গান্ধী নিজে প্রধানমন্ত্রী হননি। তাঁর পরিবর্তে মনমোহন সিংকে প্রধানমন্ত্রী করা হয়।
তাঁর বিদেশি জন্মপরিচয় কি এই সিদ্ধান্তের পেছনে বড় কারণ ছিল? নাকি পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে ভয় কাজ করেছিল? তৎকালীন কংগ্রেস নেতা নাটবর সিংয়ের স্মৃতিকথায় বলা হয়েছিল, সোনিয়ার ছেলে রাহুল গান্ধী মায়ের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন এবং দাদি ইন্দিরা ও বাবা রাজীবের মতো পরিণতি তাঁর মায়েরও হতে পারে বলে আশঙ্কা করেছিলেন। সোনিয়ার আত্মজীবনী এই ঘটনার নতুন কোনো ব্যাখ্যা দেয় কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বিদেশি পরিচয় নিয়ে বিতর্ক
ভারতের রাজনীতিতে সোনিয়ার ইতালীয় জন্মপরিচয় বহু বছর ধরে বিতর্কের কেন্দ্র ছিল। বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছিল, বিদেশে জন্ম নেওয়া একজন ব্যক্তি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন কি না। ২০০৪ সালে বিজেপি নেত্রী সুষমা স্বরাজ প্রকাশ্যে বলেছিলেন, সোনিয়া প্রধানমন্ত্রী হলে তা দেশের জন্য অপমান হবে এবং তিনি পদত্যাগ করে কঠোর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নেবেন।

আত্মজীবনীতে সোনিয়া কি এই দীর্ঘ বিতর্কের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরবেন? তিনি কি কখনো ভারত ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভেবেছিলেন? এসব প্রশ্নের উত্তরও পাঠকদের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে।
কংগ্রেসের ক্ষমতায় ফেরা এবং ‘অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ’
সোনিয়ার নেতৃত্বে কংগ্রেস ২০০৪ ও ২০০৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে জয় পায়। তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার তথ্য জানার অধিকার এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তার মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করে। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে দুর্নীতির অভিযোগ, নীতিগত অচলাবস্থা এবং নেতৃত্বকেন্দ্রিক সমালোচনা সরকারকে দুর্বল করে।
সমালোচকেরা সোনিয়াকে সরকারের ‘দূরবর্তী নিয়ন্ত্রক’ হিসেবে দেখতেন। তাঁদের প্রশ্ন ছিল, প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ওপর তাঁর প্রকৃত প্রভাব কতটা ছিল। অন্যদিকে তাঁর সমর্থকদের মতে, জটিল জোট সরকারকে একসঙ্গে ধরে রাখার প্রধান রাজনৈতিক শক্তি ছিলেন সোনিয়াই।
রাহুল না প্রিয়াঙ্কা—উত্তরাধিকার কার হাতে?
২০১৭ সালে সোনিয়া কংগ্রেসের নেতৃত্ব ছেলে রাহুল গান্ধীর হাতে তুলে দেন। কিন্তু রাহুল দলকে আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে পারেননি—গান্ধী পরিবারের রাজনৈতিক পতনের আলোচনায় এটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তাহলে কেন রাহুলকেই রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী হিসেবে বেছে নেওয়া হলো, যখন তাঁর বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকেও অনেকেই বেশি স্বাভাবিক ও আকর্ষণীয় রাজনৈতিক মুখ হিসেবে দেখতেন? প্রিয়াঙ্কা আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রবেশ করেন ২০১৯ সালে। আত্মজীবনীতে এই পারিবারিক সিদ্ধান্তের কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় কি না, সেটিও কৌতূহলের বিষয়।

বফর্স থেকে পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার
রাজীব গান্ধীর সময়ের বহুল বিতর্কিত বফর্স কেলেঙ্কারি নিয়েও সোনিয়া কী লিখবেন, তা নিয়ে আগ্রহ রয়েছে। এই ঘটনায় রাজীব সরকারের ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং ইতালীয় ব্যবসায়ী ওত্তাভিও কোয়াত্রোক্কির সঙ্গে গান্ধী পরিবারের সম্পর্ক নিয়েও দীর্ঘদিন বিতর্ক চলেছে। সোনিয়া সে সময় কী জানতেন এবং ঘটনাটিকে কীভাবে দেখেছিলেন—বইটি হয়তো সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে।
‘বিলংগিং’—শুধু রাজনীতির হিসাব নয়
সোনিয়ার আত্মজীবনীর নামই হয়তো বইটির মূল সুর সম্পর্কে সবচেয়ে বড় ইঙ্গিত দিচ্ছে—‘বিলংগিং’, অর্থাৎ কোনো পরিবার, দেশ ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের সঙ্গে নিজের গভীর সম্পর্কের অনুভূতি।
কংগ্রেস যখন একের পর এক নির্বাচনী ধাক্কা সামলাচ্ছে এবং গান্ধী পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হচ্ছে, তখন সোনিয়ার আত্মজীবনী শুধু রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের বই নাও হতে পারে। বরং এটি হতে পারে এমন এক নারীর ব্যক্তিগত ব্যাখ্যা, যিনি ইতালির ছোট শহরের জীবন থেকে ভারতের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাজনৈতিক পরিবারের কেন্দ্রে পৌঁছেছেন এবং শেষ পর্যন্ত সেই পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিজের কাঁধে নিয়েছেন।
সোনিয়ার নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর পরিবারকে নিয়ে অনেক কিছু লেখা হলেও তাঁদের প্রেরণা, কর্মকাণ্ড এবং মানবিক দুর্বলতার গভীরে খুব কম লেখাই পৌঁছেছে। তাই নভেম্বরে বইটি প্রকাশের পর ভারতের রাজনীতির বহু পুরোনো প্রশ্ন নতুন করে আলোচনায় আসতে পারে।





সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















