চীনের বিপুল বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য আর টেকসই নয় বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। বৈশ্বিক বাণিজ্য ভারসাম্য ফেরাতে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের শর্ত নতুন করে পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনে আরও বাণিজ্যিক বাধা আরোপের জন্য জি২০ভুক্ত দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
চীনের ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত নিয়ে উদ্বেগ
রোববার যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের অ্যাশভিলে জি২০-এর অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরদের বৈঠকের আগে এক সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট বলেন, চীনের বর্তমান রপ্তানিনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।
তিনি বলেন, বিশ্বের পক্ষে এমন একটি চীনা অর্থনীতি মেনে নেওয়া সম্ভব নয়, যার বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার। চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ায় দেশটি অতিরিক্ত রপ্তানির মাধ্যমে সেই দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বেসেন্টের মতে, চীনকে রপ্তানিনির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ ভোগ ও চাহিদা বাড়ানোর দিকে অর্থনীতিকে পুনর্বিন্যাস করতে হবে।

চীনা পণ্যের প্রবাহ নিয়ে অন্য দেশগুলোও চাপে
চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমলেও দেশটির অতিরিক্ত পণ্য রপ্তানির চাপ বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে গিয়ে পড়ছে বলে মনে করেন বেসেন্ট।
বিশেষ করে ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার বাজারে চীনা পণ্যের প্রবাহ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চীনের অনেক পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ এবং কিছু পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে নিজেদের বাজার অনেকটাই সুরক্ষিত করেছে।
বেসেন্ট বলেন, অন্যান্য শিল্পোন্নত দেশগুলোকেও এখন চীনা আমদানির চাপ মোকাবিলায় কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। চীনকে রপ্তানি কমিয়ে অভ্যন্তরীণ চাহিদা শক্তিশালী করার জন্য উৎসাহিত করতে অন্য দেশগুলোরও নিজেদের বাণিজ্যনীতি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশকে চীনের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্কের শর্তগুলো নতুন করে পরীক্ষা করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য ঘাটতি কমেছে
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে ৭৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে।
২০২৫ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পর আরোপ করা শুল্ক এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে আগাম শুল্কের আশঙ্কায় আমদানিকারকেরা ২০২৫ সালের শুরুর দিকে অতিরিক্ত পণ্য আমদানি করায় তুলনামূলক হিসাবটিতে কিছুটা প্রভাব পড়েছে।

নতুন মুদ্রা চুক্তির ধারণায় আপত্তি
চীনের মুদ্রা ইউয়ানের মূল্য বাড়াতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বেসেন্ট। কিছু অর্থনীতিবিদ ও ইউরোপীয় নেতারা এমন উদ্যোগের পক্ষে মত দিলেও তিনি মনে করেন, শুধু মুদ্রার বিনিময় হার পরিবর্তন করে মূল বাণিজ্য সমস্যার সমাধান করা যাবে না।
১৯৮৫ সালের ‘প্লাজা চুক্তি’র মতো নতুন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের ধারণাকেও তিনি বাস্তব সমস্যার পাশ কাটানোর সহজ পথ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, চীনের অতিরিক্ত শিল্প ভর্তুকি এবং দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদাই বৈশ্বিক বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতার মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে।
ট্রাম্প-শি বৈঠকের আগে শুল্ক কমানোর আলোচনা
আগামী সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে দুই দেশের কর্মকর্তারা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়—এমন কিছু পণ্যের ওপর শুল্ক কমানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাবেন।

বেসেন্ট জানিয়েছেন, উভয় পক্ষই প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয় এমন পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহারের সুযোগ খুঁজতে পারে।
এর পাশাপাশি শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি যাতে রাষ্ট্রীয় নয় এমন ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর হাতে না পড়ে, সে বিষয়েও দুই দেশ নিরাপত্তা বিধি নিয়ে আলোচনা করবে।
নতুন করে শুল্কনীতি সাজাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির ওপর সাম্প্রতিক আইনি ধাক্কার পর ট্রাম্প প্রশাসন নতুন করে শুল্ক কাঠামো সাজানোর চেষ্টা করছে। দেশটির সর্বোচ্চ আদালত জরুরি আইন ব্যবহার করে আরোপ করা বিস্তৃত শুল্ক বাতিল করার পর নতুন পথে এগোতে হচ্ছে ওয়াশিংটনকে।
জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র জোরপূর্বক শ্রমসংক্রান্ত তদন্তের আওতায় চীনা পণ্যের ওপর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। অতিরিক্ত শিল্প উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে আরেকটি তদন্তের ভিত্তিতে আরও শুল্ক আরোপের প্রস্তুতিও চলছে।
অ্যাশভিলের জি২০ সম্মেলনে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর প্যান গংশেংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন বেসেন্ট। তবে বৈঠকে কী নিয়ে আলোচনা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি তিনি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















