ইংল্যান্ডের পেসার অলি রবিনসনের দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের পেছনে অস্ট্রেলিয়ারই একটি পুরোনো কৌশলের বড় ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করছেন সাবেক ইংলিশ ক্রিকেটার ও ধারাভাষ্যকার জোনাথন অ্যাগনিউ। তাঁর মতে, উইকেটের একেবারে কাছে দাঁড়িয়ে উইকেটকিপিং করার কৌশল রবিনসনের বোলিংয়ের শক্তিকে আরও কার্যকর করে তুলেছে।
স্বাভাবিক প্রতিভার বোলার রবিনসন
ইংল্যান্ডের হয়ে রবিনসনের অভিষেকের পাঁচ বছর পরও অ্যাগনিউয়ের মূল্যায়ন বদলায়নি। তাঁর চোখে রবিনসন এখনো দেখা সবচেয়ে স্বাভাবিক প্রতিভার পেসারদের একজন।
রবিনসনের বোলিংকে যান্ত্রিক বলা হলেও সেটি নেতিবাচক অর্থে নয়। বরং তাঁর বোলিংয়ের ছন্দ, পুনরাবৃত্তি ও নিখুঁত নিয়ন্ত্রণই তাঁকে আলাদা করেছে। অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি পেসার গ্লেন ম্যাকগ্রার সঙ্গে তাঁর বোলিংয়ের মিলও টেনেছেন অ্যাগনিউ।
রবিনসনের রানআপে স্বাভাবিক ছন্দ রয়েছে, তাঁর বোলিং অ্যাকশন মসৃণ এবং কবজির অবস্থানও অত্যন্ত নিখুঁত। চলতি গ্রীষ্মের পরিবেশও তাঁর জন্য আদর্শ হয়ে উঠেছে। লর্ডসে দ্বিতীয় টেস্টে ইংল্যান্ড জয়ের পর তিন ম্যাচে তাঁর শিকার দাঁড়িয়েছে ২৩ উইকেটে।
বল যেন নিজের মতো করেই কাজ করছে
বর্তমান পরিস্থিতিতে রবিনসনকে উইকেট পাওয়ার জন্য অতিরিক্ত কিছু করতে হচ্ছে না। তিনি বলকে স্বাভাবিকভাবে হাত থেকে বের করে দিচ্ছেন, আর বল কখনো ভেতরে ঢুকছে, কখনো বাইরে যাচ্ছে, আবার কখনো পিচে পড়ে সামান্য দিক পরিবর্তন করছে।
অ্যাগনিউয়ের মতে, রবিনসনের জন্য এটি একজন বোলারের সবচেয়ে আনন্দের সময়—যখন মনে হয় চোখ বন্ধ করেও দৌড়ে এসে বল করলেও উইকেট পাওয়া সম্ভব।
অস্ট্রেলিয়ার কৌশল এবার ইংল্যান্ডের অস্ত্র
রবিনসনের সাফল্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে অ্যাগনিউ তুলে ধরেছেন উইকেটকিপারের অবস্থান। অ্যাশেজ সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার অ্যালেক্স ক্যারি পেসারদের বিপক্ষে উইকেটের খুব কাছে দাঁড়িয়ে কিপিং করে দারুণ সাফল্য পেয়েছিলেন।
ইংল্যান্ড এখন সেই কৌশলই রবিনসনের ক্ষেত্রে ব্যবহার করছে।
উইকেটকিপার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকলে ব্যাটার রবিনসনের দিকে এগিয়ে এসে বল খেলতে পারতেন। কিন্তু জেমি স্মিথ উইকেটের কাছে থাকায় ব্যাটার সেই ঝুঁকি নিতে পারছেন না। সামান্য এগোলেই স্টাম্পড হওয়ার সম্ভাবনা থাকছে।
ফলে রবিনসন এক গজ বেশি লেংথে বল করতে পারছেন। এতে বাতাসে বলের সুইং করার জন্য বাড়তি সময় মিলছে। একই সঙ্গে তুলনামূলক লম্বা লেংথের কারণে বলের স্টাম্পে আঘাত করার সম্ভাবনাও বাড়ছে।
জেমি স্মিথের উন্নতিও বড় কারণ

তবে এই কৌশল সফল করতে দক্ষ উইকেটকিপার প্রয়োজন। অ্যাগনিউ তাই জেমি স্মিথেরও প্রশংসা করেছেন।
অ্যাশেজে স্মিথের কিপিংয়ে বেশ কিছু সমস্যা দেখা গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর উন্নতি স্পষ্ট। উইকেটকিপিং কোচ সারাহ টেলর অনুশীলনে তাঁকে কঠোরভাবে প্রস্তুত করছেন।
অনুশীলনের একটি বিশেষ কৌশলে টেনিস বল র্যাকেট দিয়ে স্মিথের দিকে দ্রুত আঘাত করে পাঠানো হয়। সামনে ব্যাটারের উপস্থিতি ধরে নিয়ে বল এদিক-ওদিক ছুটে গেলে নিচু হয়ে সেটি ধরার অনুশীলন করেন স্মিথ।
এই পরিশ্রমের ফল মাঠেও দেখা যাচ্ছে।
এবার কঠিন পরীক্ষার পালা
রবিনসনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সহায়ক পরিবেশ না থাকলেও তিনি কি একই সাফল্য ধরে রাখতে পারবেন?
দক্ষিণ আফ্রিকায় শীতের মৌসুমে তিন টেস্টের সিরিজে তাঁকে অপেক্ষাকৃত শক্ত ও সমতল উইকেট এবং উষ্ণ আবহাওয়ার মুখোমুখি হতে হবে। এমন পরিস্থিতি তাঁর ফিটনেস ও বোলিংয়ের কার্যকারিতা দুটিই পরীক্ষা করবে।
ব্যাটারদের জন্য সহায়ক উইকেটে ইংল্যান্ড অতীতে রবিনসনকে টেস্ট দল থেকে বাদ দিয়েছে। কিন্তু অ্যাগনিউয়ের মতে, এবার তাঁকে নিয়মিত সুযোগ দেওয়ার সময় এসেছে। তিনি সেই অধিকার অর্জন করেছেন।
ইংল্যান্ডের পরিকল্পনা এখন রবিনসনের গতি আরও স্থিতিশীল করা। বর্তমানে তিনি ঘণ্টায় প্রায় ৮২ মাইল গতিতে শুরু করলেও পরে তা কমে ৭৭ বা ৭৮ মাইলে নেমে আসে। যদি পুরো স্পেলে প্রায় ৮২ মাইল গতি ধরে রাখতে পারেন, তাহলে বাড়তি বাউন্সের মাধ্যমে কিছুটা কমে যাওয়া সুইংয়ের প্রভাবও পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

বার্মিংহামে আক্রমণ ভাঙতে চান না অ্যাগনিউ
তৃতীয় টেস্টে রবিনসন, জোফ্রা আর্চার, গাস অ্যাটকিনসন ও জশ টাংকে বিশ্রাম না দেওয়ার জন্য ইংল্যান্ডের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন অ্যাগনিউ।
তাঁর মতে, ইংল্যান্ডের নতুন পেস আক্রমণ সত্যিকারের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। দলে মূলধারার স্পিনার না থাকলেও রবিনসন প্রয়োজন হলে স্পিনারের মতো রান আটকে রাখার দায়িত্ব পালন করতে পারেন। লর্ডস টেস্টে তাঁর ওভারপ্রতি রান দেওয়ার হার ছিল মাত্র ১.২৯।
অ্যাগনিউয়ের মতে, এই মুহূর্তে দলটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো জয়ের ধারায় থাকা এবং একই সঙ্গে চার পেসারের একসঙ্গে বোলিং করার অভ্যাস তৈরি করা।
অধিনায়ক জো রুটকেও শিখতে হবে কোন বোলারকে কীভাবে সবচেয়ে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়।
রবিনসনকে নেতা করে এই পেস আক্রমণই এখন ইংল্যান্ডের সেরা আক্রমণ—এমনটাই মনে করেন অ্যাগনিউ। তাঁর পরামর্শ, বার্মিংহামেই নয়, সামনে আরও কঠিন পরীক্ষাতেও এই আক্রমণ ধরে রাখা উচিত।
অ্যাগনিউয়ের মতে, এখন এই সমন্বয় ভেঙে ফেলার কোনো কারণ নেই।
অলি রবিনসনের প্রত্যাবর্তন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; সঠিক কৌশল, উন্নত উইকেটকিপিং এবং ধারাবাহিক সুযোগ পেলে ইংল্যান্ডের পেস আক্রমণ কতটা শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে, সেটিও তা দেখিয়ে দিচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















