০৭:২২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬
সুমাকের ঘ্রাণে মিষ্টি আলুর দারুণ পদ, সঙ্গে সবুজ তাহিনি সস কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাজনিত সাইবার ঝুঁকিই বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতার সবচেয়ে বড় তাৎক্ষণিক হুমকি জাকারবার্গের ‘জনগণের জন্য এআই’ গল্পে কেন আস্থা রাখা কঠিন এআইয়ের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে নিজস্ব গ্যাস টারবাইনের যন্ত্রাংশ তৈরি করবে স্পেসএক্স আফগানিস্তানের সংকটের বহুমাত্রিক চিত্র: দারিদ্র্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ইরান থেকে পালানো দুই নারীসহ প্রায় ২৪ জনকে মধ্য আফ্রিকায় পাঠাতে চায় ট্রাম্প প্রশাসন মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে সোনার খনিতে ভয়াবহ ধস, প্রাণ গেল ৪৯ জনের মার্কিন প্রযুক্তির ওপর ইউক্রেনের ড্রোন যুদ্ধের গভীর নির্ভরতা, বাড়ছে উদ্বেগ ভেনেজুয়েলার তেল পেলেই কমবে না যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানির দাম, বলছেন বিশ্লেষকেরা মার্কিন গোয়েন্দা-ঘনিষ্ঠ বিনিয়োগে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জার্মান ড্রোন কোম্পানির উত্থান

ইউরোপকে বাঁচাতে শুধু বিশেষজ্ঞের টেবিল নয়, দরকার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত

ইউরোপের অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়। বরং সমস্যাটি এতটাই গভীর যে, ইউরোপের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত প্রায় সবাই এখন একমত—প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন কমছে, বিনিয়োগের গতি যথেষ্ট নয় এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এই বাস্তবতার মধ্যেই গত সপ্তাহে আত্মপ্রকাশ করেছে ‘রাইন গ্রুপ’—ইউরোপকে আবার উদ্ভাবন, প্রবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার পথে ফেরানোর লক্ষ্যে গঠিত এক বেসরকারি উদ্যোগ।

উদ্যোগটির নেতৃত্বে আছেন ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক প্রেসিডেন্ট মারিও দ্রাঘি এবং প্রযুক্তি উদ্যোক্তা প্যাট্রিক কলিসন। নির্বাহী পরিচালক হিসেবে আছেন অর্থনীতিবিদ ও সাবেক ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য লুইস গারিকানো। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, সাবেক মন্ত্রী, নিয়ন্ত্রক এবং গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত এই প্ল্যাটফর্ম ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক ও করপোরেট সমাবেশ।

কিন্তু এখানেই প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো যে কাজ করার কথা, সেটি কেন একটি বেসরকারি গোষ্ঠীকে করতে হচ্ছে? আরও বড় প্রশ্ন হলো, ইউরোপের সংকট কি আসলেই এমন একটি প্রযুক্তিগত সমস্যা, যার সমাধান বিশেষজ্ঞদের হাতে তুলে দিলেই হবে?

সমস্যার স্বীকৃতি আছে, রাজনৈতিক সমাধান কোথায়?

দ্রাঘির ইউরোপীয় প্রতিযোগিতা নিয়ে বহুল আলোচিত প্রতিবেদনে সমস্যাগুলো স্পষ্টভাবে উঠে এসেছিল। কিন্তু দুই বছর পরও তার বহু সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি। যৌথ ঋণ, শিল্পে ভর্তুকি, পুঁজিবাজারের একীকরণ কিংবা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সহজ করার মতো পদক্ষেপ শুধু অর্থনৈতিক দক্ষতার বিষয় নয়। এগুলো ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ক্ষমতা, ব্যয় ও সুবিধার বণ্টন বদলে দিতে পারে। একইভাবে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যেও তৈরি করতে পারে বিজয়ী ও ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ।

অতএব, এসব সংস্কার থেমে আছে বিশেষজ্ঞের অভাবের কারণে নয়। রাজনৈতিক মতবিরোধই মূল বাধা। অথচ রাইন গ্রুপের প্রাথমিক বক্তব্যে মনে হচ্ছে, সমস্যাটিকে আবারও প্রযুক্তিগত অদক্ষতার জায়গা থেকে দেখা হচ্ছে—যেন সঠিক নীতিপত্র, সঠিক বিশেষজ্ঞ এবং সঠিক নেতৃত্ব পেলেই ইউরোপের অচলাবস্থা কেটে যাবে।

এটি বিপজ্জনক সরলীকরণ।

ইউরোপের জন্য আসল প্রশ্ন শুধু কীভাবে দ্রুত প্রবৃদ্ধি বাড়ানো যায়, তা নয়। প্রশ্ন হলো—কী ধরনের অর্থনীতি ও সমাজ ইউরোপ গড়ে তুলতে চায়?

আমেরিকার অনুকরণ কি সমাধান?

রাইন গ্রুপের প্রতিষ্ঠাকালীন বক্তব্যে একটি পরিসংখ্যান বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে—বিশ্বের ৫০টি বৃহত্তম প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মাত্র চারটি ইউরোপীয়। সংখ্যাটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগের কারণ হতে পারে। কিন্তু এই পরিসংখ্যানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সমস্যাটিকে একটি নির্দিষ্ট পথে সংজ্ঞায়িত করে দেয়।

যদি ইউরোপের দুর্বলতার প্রধান মাপকাঠি হয় আমেরিকার মতো বিশাল প্রযুক্তি কোম্পানির অভাব, তাহলে সমাধানও স্বাভাবিকভাবেই হবে আরও বড় কোম্পানি তৈরি করা, দ্রুত ইউনিকর্ন বাড়ানো, পুঁজি কেন্দ্রীভূত করা এবং বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ কমানো।

কিন্তু ইউরোপের লক্ষ্য কি সত্যিই এমন একটি অর্থনীতি তৈরি করা, যেখানে সবচেয়ে বড় কোম্পানির বাজারমূল্যই সাফল্যের প্রধান মানদণ্ড?

ইউরোপের শক্তির অনেক কিছুই শেয়ারবাজারের মূল্যায়ন দিয়ে মাপা যায় না। রয়েছে শক্তিশালী গবেষণা অবকাঠামো, বিস্তৃত শিল্পভিত্তি, দক্ষ শ্রমশক্তি, সর্বজনীন জনসেবা, প্রতিযোগিতা রক্ষার শক্তিশালী আইন এবং উন্নত ডিজিটাল জনপরিকাঠামো। এগুলো কোনো অতিরিক্ত বোঝা নয়, বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি।

সামাজিক সুরক্ষা, শ্রমিকের অধিকার কিংবা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে শুধু অর্থনৈতিক খরচ হিসেবে দেখলে ইউরোপ নিজের গুরুত্বপূর্ণ সুবিধাগুলোকেই দুর্বল করবে। সামাজিক নিরাপত্তা মানুষকে পরিবর্তনের সময় টিকে থাকার সক্ষমতা দেয়, রাষ্ট্রের ওপর আস্থা বাড়ায় এবং সামাজিক সংহতি বজায় রাখে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের সময়ে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি যখন শ্রমবাজার ও সামাজিক কাঠামো বদলে দিচ্ছে, তখন দুর্বল সামাজিক সুরক্ষা ও অপেক্ষাকৃত শিথিল প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ কী ধরনের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা সে সম্পর্কে কিছু ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইউরোপের তুলনামূলক শক্তিশালী সামাজিক কাঠামো তাই কেবল ব্যয় নয়; ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত ধাক্কা সামাল দেওয়ার একটি সক্ষমতাও হতে পারে।PRESS RELEASE – Successful Round Table “The Savings of Europeans and the  Future of Europe” – CERSTE – CENTRE EUROPÉEN DES RECHERCHES  SOCIO-ÉCONOMIQUES, TECHNOLOGIQUES ET ENVIRONNEMENTALES

ইউরোপের সব কণ্ঠ কোথায়?

রাইন গ্রুপের আরেকটি দুর্বলতা তার প্রতিনিধিত্বের কাঠামোতে। তালিকাভুক্ত ৫৫ সদস্যের মধ্যে ২০০৪ সালের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়া দেশগুলোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত সদস্য মাত্র একজন—এস্তোনিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট টুমাস হেনড্রিক ইলভেস। পোল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্র, রোমানিয়া, লিথুয়ানিয়া, স্লোভাকিয়া বা বুলগেরিয়ার কোনো প্রতিনিধি নেই।

এটি নিছক ভৌগোলিক অসমতা নয়। মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর অনেকগুলোই দ্রুত অর্থনৈতিকভাবে এগিয়েছে, ডিজিটাল রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি করেছে এবং প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক নির্ভরতার সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার সম্পর্ক সবচেয়ে তীব্রভাবে উপলব্ধি করে।

তাহলে ইউরোপের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় তাদের ভূমিকা কোথায়? আবারও কি পশ্চিম ইউরোপের অভিজাত মহল নীতি নির্ধারণ করবে, আর পূর্ব ও মধ্য ইউরোপের দেশগুলো শুধু সেই নীতির বাস্তবায়নকারী হয়ে থাকবে?

সামাজিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নও এড়ানো যায় না। গ্রুপটির সদস্যদের বড় অংশই ব্যাংকিং, বিনিয়োগ ও করপোরেট জগতের সঙ্গে যুক্ত—অর্থাৎ সম্ভাব্য সংস্কারের ফলে যারা প্রত্যক্ষভাবে লাভবান হতে পারেন, তাদের উপস্থিতিই বেশি। অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠন, নাগরিক সমাজ কিংবা সাধারণ ভোক্তাদের প্রতিনিধিত্ব কোথায়?

ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকা সবসময় নিরপেক্ষ দক্ষতার প্রমাণ নয়। কখনো কখনো সেটিই হয়ে ওঠে দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতা। বিদ্যমান ব্যবস্থার সবচেয়ে প্রভাবশালী অংশের প্রতিনিধিরাই যদি সেই ব্যবস্থা বদলের নকশা করেন, তাহলে তারা কি সত্যিই বিকল্প পথ কল্পনা করতে পারবেন?

স্বচ্ছতা ছাড়া জননীতি নয়

রাইন গ্রুপ যে একটি বেসরকারি সংগঠন হিসেবে কাজ করছে, তা নিজে কোনো অপরাধ নয়। চ্যাথাম হাউস রুলসের অধীনে আলোচনা করাও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যে সংগঠন ইউরোপের জননীতি প্রভাবিত করতে চায়, তার ক্ষেত্রে স্বেচ্ছায় আরও বেশি স্বচ্ছতা দেখানো উচিত।

কারা এর সদস্য, তাদের স্বার্থ কোথায়, কোন নীতিতে কারা লাভবান হতে পারেন এবং কোন প্রস্তাব কীভাবে তৈরি হচ্ছে—এসব প্রশ্নের উত্তর যত পরিষ্কার হবে, উদ্যোগটির বিশ্বাসযোগ্যতাও তত বাড়বে।

এখানে দ্রাঘির ভূমিকা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তার দীর্ঘ কর্মজীবন দেখিয়েছে, ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতার পরও একটি বন্ধ দরজার বেসরকারি প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরতা ইউরোপের উদারপন্থী প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর আস্থার সংকটকেও প্রকাশ করে।

ধারণাটি যেন এমন—সরকারগুলো যদি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে না পারে, তাহলে ‘সঠিক’ মানুষদের একত্র হয়ে তাদের পথ দেখাতে হবে।

কিন্তু গণতন্ত্রে সমস্যার সমাধান কেবল সঠিক মানুষ বাছাইয়ের বিষয় নয়। মতভেদ, স্বার্থের সংঘাত, আপস এবং রাজনৈতিক বিতর্কও নীতিনির্ধারণের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এগুলোকে পাশ কাটিয়ে বিশেষজ্ঞ-নির্ভর সমাধান তৈরি করলে তা হয়তো দ্রুত মনে হবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তার বৈধতা দুর্বল হতে পারে।

ইউরোপকে আমেরিকা হতে হবে না

রাইন গ্রুপ ইউরোপের জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু তার জন্য প্রথমেই দরজা খুলতে হবে। পূর্ব ও মধ্য ইউরোপকে আলোচনার কেন্দ্রে আনতে হবে, শ্রমিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে হবে এবং সদস্যদের স্বার্থ ও সম্ভাব্য নীতিগত প্রভাব সম্পর্কে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইউরোপকে নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে তাদের মডেলকে গ্রহণ করা বন্ধ করতে হবে।

ইউরোপের অর্থনৈতিক গতিশীলতা বাড়ানোর প্রয়োজন অবশ্যই আছে। প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে ইউরোপকে নিজের সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য বিসর্জন দিয়ে আমেরিকার একটি দুর্বল সংস্করণে পরিণত হতে হবে।

ইউরোপের সামনে আসল চ্যালেঞ্জ অন্য কারও মতো হয়ে ওঠা নয়। বরং তার নিজস্ব শক্তিগুলোকে কাজে লাগিয়ে এমন একটি নতুন অর্থনৈতিক মডেল তৈরি করা, যা একই সঙ্গে উদ্ভাবনী, প্রতিযোগিতামূলক, সামাজিকভাবে স্থিতিশীল এবং গণতান্ত্রিকভাবে বৈধ।

ইউরোপকে আরও বেশি আমেরিকার মতো হওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন আরও কার্যকর, আরও আত্মনির্ভর এবং নিজের মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি ইউরোপ হয়ে ওঠার।

জনপ্রিয় সংবাদ

সুমাকের ঘ্রাণে মিষ্টি আলুর দারুণ পদ, সঙ্গে সবুজ তাহিনি সস

ইউরোপকে বাঁচাতে শুধু বিশেষজ্ঞের টেবিল নয়, দরকার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত

০৬:০৪:৩৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬

ইউরোপের অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়। বরং সমস্যাটি এতটাই গভীর যে, ইউরোপের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত প্রায় সবাই এখন একমত—প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন কমছে, বিনিয়োগের গতি যথেষ্ট নয় এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এই বাস্তবতার মধ্যেই গত সপ্তাহে আত্মপ্রকাশ করেছে ‘রাইন গ্রুপ’—ইউরোপকে আবার উদ্ভাবন, প্রবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার পথে ফেরানোর লক্ষ্যে গঠিত এক বেসরকারি উদ্যোগ।

উদ্যোগটির নেতৃত্বে আছেন ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক প্রেসিডেন্ট মারিও দ্রাঘি এবং প্রযুক্তি উদ্যোক্তা প্যাট্রিক কলিসন। নির্বাহী পরিচালক হিসেবে আছেন অর্থনীতিবিদ ও সাবেক ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য লুইস গারিকানো। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, সাবেক মন্ত্রী, নিয়ন্ত্রক এবং গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত এই প্ল্যাটফর্ম ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক ও করপোরেট সমাবেশ।

কিন্তু এখানেই প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো যে কাজ করার কথা, সেটি কেন একটি বেসরকারি গোষ্ঠীকে করতে হচ্ছে? আরও বড় প্রশ্ন হলো, ইউরোপের সংকট কি আসলেই এমন একটি প্রযুক্তিগত সমস্যা, যার সমাধান বিশেষজ্ঞদের হাতে তুলে দিলেই হবে?

সমস্যার স্বীকৃতি আছে, রাজনৈতিক সমাধান কোথায়?

দ্রাঘির ইউরোপীয় প্রতিযোগিতা নিয়ে বহুল আলোচিত প্রতিবেদনে সমস্যাগুলো স্পষ্টভাবে উঠে এসেছিল। কিন্তু দুই বছর পরও তার বহু সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি। যৌথ ঋণ, শিল্পে ভর্তুকি, পুঁজিবাজারের একীকরণ কিংবা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সহজ করার মতো পদক্ষেপ শুধু অর্থনৈতিক দক্ষতার বিষয় নয়। এগুলো ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ক্ষমতা, ব্যয় ও সুবিধার বণ্টন বদলে দিতে পারে। একইভাবে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যেও তৈরি করতে পারে বিজয়ী ও ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ।

অতএব, এসব সংস্কার থেমে আছে বিশেষজ্ঞের অভাবের কারণে নয়। রাজনৈতিক মতবিরোধই মূল বাধা। অথচ রাইন গ্রুপের প্রাথমিক বক্তব্যে মনে হচ্ছে, সমস্যাটিকে আবারও প্রযুক্তিগত অদক্ষতার জায়গা থেকে দেখা হচ্ছে—যেন সঠিক নীতিপত্র, সঠিক বিশেষজ্ঞ এবং সঠিক নেতৃত্ব পেলেই ইউরোপের অচলাবস্থা কেটে যাবে।

এটি বিপজ্জনক সরলীকরণ।

ইউরোপের জন্য আসল প্রশ্ন শুধু কীভাবে দ্রুত প্রবৃদ্ধি বাড়ানো যায়, তা নয়। প্রশ্ন হলো—কী ধরনের অর্থনীতি ও সমাজ ইউরোপ গড়ে তুলতে চায়?

আমেরিকার অনুকরণ কি সমাধান?

রাইন গ্রুপের প্রতিষ্ঠাকালীন বক্তব্যে একটি পরিসংখ্যান বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে—বিশ্বের ৫০টি বৃহত্তম প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মাত্র চারটি ইউরোপীয়। সংখ্যাটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগের কারণ হতে পারে। কিন্তু এই পরিসংখ্যানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সমস্যাটিকে একটি নির্দিষ্ট পথে সংজ্ঞায়িত করে দেয়।

যদি ইউরোপের দুর্বলতার প্রধান মাপকাঠি হয় আমেরিকার মতো বিশাল প্রযুক্তি কোম্পানির অভাব, তাহলে সমাধানও স্বাভাবিকভাবেই হবে আরও বড় কোম্পানি তৈরি করা, দ্রুত ইউনিকর্ন বাড়ানো, পুঁজি কেন্দ্রীভূত করা এবং বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ কমানো।

কিন্তু ইউরোপের লক্ষ্য কি সত্যিই এমন একটি অর্থনীতি তৈরি করা, যেখানে সবচেয়ে বড় কোম্পানির বাজারমূল্যই সাফল্যের প্রধান মানদণ্ড?

ইউরোপের শক্তির অনেক কিছুই শেয়ারবাজারের মূল্যায়ন দিয়ে মাপা যায় না। রয়েছে শক্তিশালী গবেষণা অবকাঠামো, বিস্তৃত শিল্পভিত্তি, দক্ষ শ্রমশক্তি, সর্বজনীন জনসেবা, প্রতিযোগিতা রক্ষার শক্তিশালী আইন এবং উন্নত ডিজিটাল জনপরিকাঠামো। এগুলো কোনো অতিরিক্ত বোঝা নয়, বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি।

সামাজিক সুরক্ষা, শ্রমিকের অধিকার কিংবা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে শুধু অর্থনৈতিক খরচ হিসেবে দেখলে ইউরোপ নিজের গুরুত্বপূর্ণ সুবিধাগুলোকেই দুর্বল করবে। সামাজিক নিরাপত্তা মানুষকে পরিবর্তনের সময় টিকে থাকার সক্ষমতা দেয়, রাষ্ট্রের ওপর আস্থা বাড়ায় এবং সামাজিক সংহতি বজায় রাখে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের সময়ে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি যখন শ্রমবাজার ও সামাজিক কাঠামো বদলে দিচ্ছে, তখন দুর্বল সামাজিক সুরক্ষা ও অপেক্ষাকৃত শিথিল প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ কী ধরনের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা সে সম্পর্কে কিছু ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইউরোপের তুলনামূলক শক্তিশালী সামাজিক কাঠামো তাই কেবল ব্যয় নয়; ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত ধাক্কা সামাল দেওয়ার একটি সক্ষমতাও হতে পারে।PRESS RELEASE – Successful Round Table “The Savings of Europeans and the  Future of Europe” – CERSTE – CENTRE EUROPÉEN DES RECHERCHES  SOCIO-ÉCONOMIQUES, TECHNOLOGIQUES ET ENVIRONNEMENTALES

ইউরোপের সব কণ্ঠ কোথায়?

রাইন গ্রুপের আরেকটি দুর্বলতা তার প্রতিনিধিত্বের কাঠামোতে। তালিকাভুক্ত ৫৫ সদস্যের মধ্যে ২০০৪ সালের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়া দেশগুলোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত সদস্য মাত্র একজন—এস্তোনিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট টুমাস হেনড্রিক ইলভেস। পোল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্র, রোমানিয়া, লিথুয়ানিয়া, স্লোভাকিয়া বা বুলগেরিয়ার কোনো প্রতিনিধি নেই।

এটি নিছক ভৌগোলিক অসমতা নয়। মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর অনেকগুলোই দ্রুত অর্থনৈতিকভাবে এগিয়েছে, ডিজিটাল রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি করেছে এবং প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক নির্ভরতার সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার সম্পর্ক সবচেয়ে তীব্রভাবে উপলব্ধি করে।

তাহলে ইউরোপের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় তাদের ভূমিকা কোথায়? আবারও কি পশ্চিম ইউরোপের অভিজাত মহল নীতি নির্ধারণ করবে, আর পূর্ব ও মধ্য ইউরোপের দেশগুলো শুধু সেই নীতির বাস্তবায়নকারী হয়ে থাকবে?

সামাজিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নও এড়ানো যায় না। গ্রুপটির সদস্যদের বড় অংশই ব্যাংকিং, বিনিয়োগ ও করপোরেট জগতের সঙ্গে যুক্ত—অর্থাৎ সম্ভাব্য সংস্কারের ফলে যারা প্রত্যক্ষভাবে লাভবান হতে পারেন, তাদের উপস্থিতিই বেশি। অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠন, নাগরিক সমাজ কিংবা সাধারণ ভোক্তাদের প্রতিনিধিত্ব কোথায়?

ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকা সবসময় নিরপেক্ষ দক্ষতার প্রমাণ নয়। কখনো কখনো সেটিই হয়ে ওঠে দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতা। বিদ্যমান ব্যবস্থার সবচেয়ে প্রভাবশালী অংশের প্রতিনিধিরাই যদি সেই ব্যবস্থা বদলের নকশা করেন, তাহলে তারা কি সত্যিই বিকল্প পথ কল্পনা করতে পারবেন?

স্বচ্ছতা ছাড়া জননীতি নয়

রাইন গ্রুপ যে একটি বেসরকারি সংগঠন হিসেবে কাজ করছে, তা নিজে কোনো অপরাধ নয়। চ্যাথাম হাউস রুলসের অধীনে আলোচনা করাও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যে সংগঠন ইউরোপের জননীতি প্রভাবিত করতে চায়, তার ক্ষেত্রে স্বেচ্ছায় আরও বেশি স্বচ্ছতা দেখানো উচিত।

কারা এর সদস্য, তাদের স্বার্থ কোথায়, কোন নীতিতে কারা লাভবান হতে পারেন এবং কোন প্রস্তাব কীভাবে তৈরি হচ্ছে—এসব প্রশ্নের উত্তর যত পরিষ্কার হবে, উদ্যোগটির বিশ্বাসযোগ্যতাও তত বাড়বে।

এখানে দ্রাঘির ভূমিকা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তার দীর্ঘ কর্মজীবন দেখিয়েছে, ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতার পরও একটি বন্ধ দরজার বেসরকারি প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরতা ইউরোপের উদারপন্থী প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর আস্থার সংকটকেও প্রকাশ করে।

ধারণাটি যেন এমন—সরকারগুলো যদি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে না পারে, তাহলে ‘সঠিক’ মানুষদের একত্র হয়ে তাদের পথ দেখাতে হবে।

কিন্তু গণতন্ত্রে সমস্যার সমাধান কেবল সঠিক মানুষ বাছাইয়ের বিষয় নয়। মতভেদ, স্বার্থের সংঘাত, আপস এবং রাজনৈতিক বিতর্কও নীতিনির্ধারণের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এগুলোকে পাশ কাটিয়ে বিশেষজ্ঞ-নির্ভর সমাধান তৈরি করলে তা হয়তো দ্রুত মনে হবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তার বৈধতা দুর্বল হতে পারে।

ইউরোপকে আমেরিকা হতে হবে না

রাইন গ্রুপ ইউরোপের জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু তার জন্য প্রথমেই দরজা খুলতে হবে। পূর্ব ও মধ্য ইউরোপকে আলোচনার কেন্দ্রে আনতে হবে, শ্রমিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে হবে এবং সদস্যদের স্বার্থ ও সম্ভাব্য নীতিগত প্রভাব সম্পর্কে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইউরোপকে নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে তাদের মডেলকে গ্রহণ করা বন্ধ করতে হবে।

ইউরোপের অর্থনৈতিক গতিশীলতা বাড়ানোর প্রয়োজন অবশ্যই আছে। প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে ইউরোপকে নিজের সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য বিসর্জন দিয়ে আমেরিকার একটি দুর্বল সংস্করণে পরিণত হতে হবে।

ইউরোপের সামনে আসল চ্যালেঞ্জ অন্য কারও মতো হয়ে ওঠা নয়। বরং তার নিজস্ব শক্তিগুলোকে কাজে লাগিয়ে এমন একটি নতুন অর্থনৈতিক মডেল তৈরি করা, যা একই সঙ্গে উদ্ভাবনী, প্রতিযোগিতামূলক, সামাজিকভাবে স্থিতিশীল এবং গণতান্ত্রিকভাবে বৈধ।

ইউরোপকে আরও বেশি আমেরিকার মতো হওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন আরও কার্যকর, আরও আত্মনির্ভর এবং নিজের মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি ইউরোপ হয়ে ওঠার।