হিমালয়ঘেঁষা নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকে পড়া শত শত শ্রমিককে উদ্ধারে জোরালো অভিযান শুরু হয়েছে। ধ্বংসস্তূপ, কাদা, পাথর ও পানিতে বন্ধ হয়ে যাওয়া সুড়ঙ্গগুলো খুলতে নেপালের উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে ভারত ও চীনের বিশেষজ্ঞরাও কাজ করছেন।
গত বুধবার নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসের পর বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্রোত নেমে আসে। এতে নেপালের উপত্যকার শহর ও গ্রামগুলোর বিস্তীর্ণ এলাকা বিপর্যস্ত হয়। সীমান্তের ওপারে চীনের তিব্বতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। নেপালি কর্মকর্তাদের হিসাবে, এখন পর্যন্ত ৯০৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৪ হাজার ২৪৭ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
১১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে নিখোঁজ ৯৩৩ শ্রমিক
উদ্ধার অভিযানের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশটির ১১টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। এসব প্রকল্পে কর্মরত ৯৩৩ জন শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের অনেকেই রাশুয়া ও নুওয়াকোট জেলার প্রায় ছয়টি সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সুড়ঙ্গগুলোর মুখ কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। উদ্ধারকারীরা ভারী খননযন্ত্র দিয়ে মাটি ও পাথর সরানোর পাশাপাশি নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ব্যবহার করছেন। অন্ধকার সুড়ঙ্গের ভেতরে পৌঁছাতে ব্যবহার করা হচ্ছে শক্তিশালী আলোকসজ্জা ও অন্যান্য উদ্ধার সরঞ্জাম।
নেপাল সেনাবাহিনী জানিয়েছে, দুটি সুড়ঙ্গে প্রবেশ করে এখন পর্যন্ত তিনটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে আরও কয়েকটি অংশ এখনো বিপুল পরিমাণ কাদা ও ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়ে আছে।
নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেট বলেন, বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ সুড়ঙ্গের ভেতরে জমে থাকায় উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়েছে। বর্তমানে তাঁদের প্রধান লক্ষ্য সুড়ঙ্গগুলো খুলে আটকে থাকা মানুষদের কাছে পৌঁছানো।
মৃতদেহের গণকবর, নিখোঁজদের খুঁজছেন স্বজনেরা
ভয়াবহ বন্যার পানির তোড়ে পাহাড় থেকে ভেসে আসা শত শত মরদেহের অনেকগুলোর এখনো পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। আর্দ্র ও উষ্ণ আবহাওয়ায় মরদেহগুলো দ্রুত পচতে শুরু করায় কর্তৃপক্ষকে কিছু মরদেহ অগভীর গণকবরে দাফন করতে হয়েছে।
অন্যদিকে নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে পরিবারগুলোর অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হচ্ছে। বন্যায় প্রায় ৯০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারেন বলে আন্তর্জাতিক রেডক্রসের হিসাব।
নেপালে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যাপক বিস্তার
২০০০ সালের পর থেকে নেপালে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। পাহাড়ি দেশটি হিমালয়ের নদীগুলোর পানিসম্পদ কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি প্রতিবেশী ভারতের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রির সম্ভাবনাও কাজে লাগাতে চাইছে।
পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে এসব প্রকল্পে দীর্ঘ সুড়ঙ্গ নির্মাণ করতে হয়। নদী ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে উচ্চতার বড় পার্থক্য কাজে লাগিয়ে পানির প্রবাহ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। ফলে বড় ধরনের বন্যা, ভূমিধস বা পাথরধস হলে এসব সুড়ঙ্গ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ এই বিপর্যয়কে নজিরবিহীন ও ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরি করাও এখনো কঠিন বলে জানিয়েছেন তিনি।
চীন ও ভারত থেকে নেওয়া হচ্ছে বিশেষজ্ঞ সহায়তা
সাধারণ উদ্ধার ও অনুসন্ধান কার্যক্রমে বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই বলে নেপাল আগে জানিয়েছিল। তবে সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে প্রযুক্তিগত দক্ষতার জন্য ভারত ও চীনের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।
চীন জানিয়েছে, তিব্বতের নেপাল সীমান্তবর্তী এলাকায় ২৩টি দেশের ২৬১ জন বিদেশি নাগরিকের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। একই সঙ্গে নেপালের ভূখণ্ডে প্রায় ১০০ চীনা নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না বলেও জানিয়েছে বেইজিং।
চীনের পক্ষ থেকে সুড়ঙ্গ উদ্ধারে বিশেষজ্ঞ পাঠানোর পাশাপাশি নেপালকে জরুরি অর্থ ও মানবিক সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে।
নতুন বন্যা ও হিমবাহ ধসের আশঙ্কা
উদ্ধার অভিযান বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে খারাপ আবহাওয়া ও নতুন করে বন্যার আশঙ্কায়। দুর্যোগের ফলে নেপাল-চীন সীমান্তে একটি হ্রদের মতো জলাধার তৈরি হয়েছে। সেটি উপচে পড়ায় নেপালের নদীগুলোতে আবারও পানির প্রবাহ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, গত সপ্তাহের হিমবাহ ধসে তৈরি হওয়া বিশাল গর্তের আশপাশের আরও কিছু হিমবাহ এখনো ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। আকাশ থেকে ধারণ করা ছবিতে নদীর দুই তীরে একাধিক ভূমিধসের চিহ্ন দেখা গেছে। এসব স্থানে নতুন ভূমিধস ও নতুন জলাধার তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
চীনের পক্ষ থেকে দুর্যোগটির পেছনে দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে হিমবাহের অস্থিতিশীলতাকে দায়ী করা হয়েছে। তিব্বতি মালভূমিতে এ ধরনের হিমবাহ ও বরফস্তর-সম্পর্কিত দুর্যোগ ক্রমেই নতুন ও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে বলেও দেশটি জানিয়েছে।
তথ্য আদান-প্রদান নিয়ে নেপালের উদ্বেগ
নেপালের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এ বছরের শুরুতে দুর্যোগ মোকাবিলা সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে বৈঠকের পরও হিমবাহের ঝুঁকি ও পানির স্তর সম্পর্কে চীনের কাছ থেকে পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায়নি। তাঁদের আশঙ্কা, প্রয়োজনীয় তথ্য দ্রুত আদান-প্রদান না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগের পূর্বাভাস ও প্রস্তুতি ব্যাহত হতে পারে।
তবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা নিয়মিতভাবেই নেপালকে আবহাওয়া ও নদীর পানির তথ্য দিয়ে আসছে এবং ভবিষ্যতেও দুর্যোগ মোকাবিলায় নেপালকে জোরালোভাবে সহায়তা করবে।
এদিকে নেপালের উদ্ধারকারীদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কাদা, পাথর ও ধ্বংসস্তূপে বন্ধ হয়ে থাকা সুড়ঙ্গগুলো দ্রুত খুলে ফেলা। কারণ প্রতিটি ঘণ্টা পেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিখোঁজ শ্রমিকদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও হিমবাহ ধসের ঘটনায় শত শত মানুষের নিখোঁজ থাকার মধ্যেই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকে থাকা ৯৩৩ শ্রমিককে উদ্ধারের অভিযান এখন দেশটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধার তৎপরতায় পরিণত হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















