ইরানের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপে হামলা চালিয়ে সেটিকে ‘ছিন্নভিন্ন’ করে দেওয়ার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান। ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা বিস্ফোরণের ভিডিওটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে হামলার কয়েক ঘণ্টা পরও খার্গ দ্বীপে হামলার কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জাতীয় তেল কোম্পানির প্রধান নির্বাহী হামিদ বোভার্ড ট্রাম্পের দাবি নিয়ে উপহাস করে বলেন, খার্গের পরিস্থিতি শান্ত ও স্বাভাবিক রয়েছে। তেল কার্যক্রমও বন্ধ হয়নি। বরং কর্মীরা আগের ক্ষয়ক্ষতি মেরামত এবং স্থাপনাগুলোর আধুনিকায়নে কাজ করছেন।
ট্রাম্প রোববার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খার্গ দ্বীপের সঙ্গে বিস্ফোরণের একটি ভিডিও প্রকাশ করে লিখেছিলেন, ‘খার্গ দ্বীপ ছিন্নভিন্ন।’ তবে এর সঙ্গে হামলার সময়, স্থান বা ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি।
ভিডিও নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন
প্রকাশিত ভিডিওটি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সেটি কৃত্রিমভাবে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে পরিবর্তিত ছবি শনাক্ত করতে ব্যবহৃত প্রযুক্তির পরীক্ষাতেও ভিডিওটিতে কৃত্রিমভাবে তৈরি দৃশ্যের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
ইরানের উপকূলীয় খার্গ দ্বীপ দেশটির জ্বালানি ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি এই দ্বীপের মাধ্যমে পরিচালিত হতো। ফলে সেখানে বড় ধরনের হামলা হলে দেশটির তেল রপ্তানি, জ্বালানি বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে।
নতুন করে সরাসরি সংঘাত
জুলাইয়ের পর প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবার সামরিক হামলা-পাল্টা হামলা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের লারাক দ্বীপে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থার ওপর হামলা চালিয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর সদস্যরা হরমুজ প্রণালিতে রকেট ও সমুদ্র মাইন নিক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র এটিকে তাৎক্ষণিক হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে ‘সীমিত ও নির্ভুল’ হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে।
এর জবাবে ইরান জর্ডানে থাকা দুটি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছে। জর্ডানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করা আটটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।
ইরানের সেনাবাহিনী আরও দাবি করেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল মিনহাদ বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বিমানঘাঁটিতে হামলার খবরকে মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী আরও জানিয়েছে, উপসাগরীয় জলসীমায় একটি মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে বাড়ছে উত্তেজনা
হরমুজ প্রণালিতেও নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নৌ মাইনের আঘাতে একটি তেলবাহী সুপারট্যাংকারে আগুন ধরে যায় এবং সেটি সম্পূর্ণভাবে থেমে যায়।
ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর দাবি, জাহাজটি তাদের নির্ধারিত নিয়ম ভঙ্গ করে প্রণালিটি অতিক্রম করার চেষ্টা করছিল। ভবিষ্যতে নিয়ম অমান্যকারী অন্য জাহাজগুলোরও একই পরিণতি হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
অন্যদিকে ট্রাম্প এর আগে দাবি করেছিলেন, হরমুজ প্রণালিতে থাকা সব মাইন বিস্ফোরিত করা হয়েছে অথবা সরিয়ে ফেলা হয়েছে। নতুন করে কেউ মাইন স্থাপন করলে জাহাজ ধ্বংস করে দেওয়ারও হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন তিনি।
তবে ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালি খোলা রয়েছে—ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে ‘স্পষ্ট মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেছে। তাদের দাবি, ইরানের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজকে ওই জলপথে চলাচল করতে দেওয়া হচ্ছে না।
আরও নিষেধাজ্ঞার প্রস্তুতি যুক্তরাষ্ট্রের
সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপও বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, ইরানের ওপর নতুন করে গৌণ নিষেধাজ্ঞা প্রতি সপ্তাহেই ঘোষণা করা হতে পারে।
প্রাথমিকভাবে ইরানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনে যুক্ত ব্যাংকগুলোর ওপর নজর দেওয়া হচ্ছে। কোনো প্রতিষ্ঠান ইরানের অর্থ ব্যবস্থাকে সহায়তা করলে তাকে ডলারভিত্তিক আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করার পদক্ষেপও নেওয়া হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
এরই মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতে মিশরের একটি ব্যাংকের শাখাগুলোর ওপর ইরানের সঙ্গে কথিত আর্থিক সম্পর্কের অভিযোগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
তেল পরিবহনে বড় ঝুঁকি
হরমুজ প্রণালিতে সামরিক উত্তেজনা ও মাইন হামলার আশঙ্কায় জাহাজ চলাচলও কমে গেছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহান্তে দৃশ্যমান পণ্যবাহী জাহাজের সংখ্যা দিনে মাত্র পাঁচটিতে নেমে এসেছে বলে নৌযান চলাচলের তথ্য থেকে জানা গেছে। তবে কিছু জাহাজ হামলার ঝুঁকি এড়াতে স্বয়ংক্রিয় পরিচয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বন্ধ রাখায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
বিশ্বের অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেত। ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, তার দেশ যুদ্ধ চায় না। তবে কোনো ধরনের আগ্রাসনের মুখে ইরান নীরব থাকবে না এবং হামলাকারীদের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে জবাব দেবে।
Sarakhon Report 



















