উত্তর সাইপ্রাসের উপকূলে ভয়াবহ ফেরি দুর্ঘটনায় নিজের দুই সন্তানকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন আয়তেন বিসের। রোববার কিরেনিয়া বন্দরের কাছে ফেরিটি উল্টে যাওয়ার সময় ১২ বছরের মেয়ে মিরায়কে নিজের হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরেছিলেন তিনি। কিন্তু দুর্ঘটনার তীব্র ধাক্কায় একটি স্যুটকেস তার ওপর পড়ে গেলে মেয়েকে ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। শেষ মুহূর্তে মেয়ের পা ধরে ফেললেও ফেরির ছড়িয়ে পড়া তেল ও ডিজেলের কারণে পা পিছলে মিরায় মায়ের হাত থেকে সাগরে হারিয়ে যায়।
সোমবার পর্যন্ত মিরায় ও তার ছয় বছরের ভাই মেহমেত আসাফসহ প্রায় ২০ জন নিখোঁজ রয়েছেন। দুর্ঘটনায় অন্তত আটজনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজদের সন্ধানে সাগরে তল্লাশি চালাচ্ছে উদ্ধারকারী দল। দুর্ঘটনাস্থলের পানির গভীরতা ৫০০ মিটারেরও বেশি হওয়ায় উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
‘মা, হাত ছাড়বে না’
মেয়েকে হারানোর সেই ভয়াবহ মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন আয়তেন। তিনি জানান, মিরায় বারবার তাকে হাত না ছাড়ার কথা বলছিল। মায়ের হাতও মেয়েকে ছাড়েনি। কিন্তু উল্টে যাওয়া ফেরির ভেতর থেকে ছিটকে আসা একটি স্যুটকেসের আঘাতে পরিস্থিতি বদলে যায়।
মেয়ের পা ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। কিন্তু ফেরির ইঞ্জিনের তেল ও ডিজেলে চারপাশ এতটাই পিচ্ছিল হয়ে গিয়েছিল যে মেয়ের পা তার হাত থেকে পিছলে যায়।
আয়তেন বলেন, চারপাশে যেন তেলের আস্তরণ ছিল। তাদের পা বারবার পিছলে যাচ্ছিল। সেই পিচ্ছিল অবস্থার মধ্যেই মেয়েটি তার হাত থেকে বেরিয়ে যায়।
২৬৭ যাত্রী নিয়ে উল্টে যায় ফেরি
ফেরিটিতে মোট ২৬৭ জন যাত্রী ও কর্মী ছিলেন। কিরেনিয়া থেকে তুরস্কের মেরসিন প্রদেশের তাসুজু বন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করার কিছুক্ষণ পরই এটি বিপদে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফেরিটি হঠাৎ প্রচণ্ডভাবে দুলতে শুরু করে। এরপর সমুদ্রের ওপর আছড়ে পড়ে এবং এর সামনের একটি অংশ ফেটে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। প্রবল ঢেউ ও উত্তাল সমুদ্রের মধ্যেই ফেরিটি উল্টে যায়।
দুর্ঘটনার পর অনেক যাত্রী উল্টে যাওয়া ফেরির খোলের ওপর আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেন। পরে পাশ দিয়ে যাওয়া নৌযান ও উপকূলরক্ষীরা তাদের উদ্ধার করেন।
গভীর সমুদ্রে চলছে তল্লাশি
ফেরিটি এখন সমুদ্রের তলদেশে পড়ে আছে। সেখানে কেউ আটকা পড়ে আছেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু দৃশ্যেও ফেরিটি উল্টে যাওয়ার সময় একটি অংশে মানুষ আটকে থাকার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
তুরস্ক থেকে ডুবুরি দলও উদ্ধার অভিযানে যোগ দিয়েছে। নিখোঁজের সংখ্যা নিয়ে কর্মকর্তাদের বক্তব্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। কেউ ১৯ জন, আবার কেউ ১৮ জন নিখোঁজ থাকার কথা জানিয়েছেন।
সমুদ্রের পানিতে এখনো দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশে বিভিন্ন ধ্বংসাবশেষ ভাসতে দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে কালো রঙের একটি স্যুটকেস এবং ফেরি থেকে ভেঙে পড়া একটি ধাতব অংশও রয়েছে।
বন্দরের বাইরে স্বজনদের অপেক্ষা
কিরেনিয়া বন্দরের বাইরে নিখোঁজদের স্বজনেরা উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করছেন। কেউ নীরবে কাঁদছেন, কেউ বারবার মুঠোফোনে নতুন কোনো খবর এসেছে কি না দেখছেন।
আয়তেনও সোমবার বন্দরের বাইরে একটি চেয়ারে বসে সন্তানের খবরের অপেক্ষায় ছিলেন। দীর্ঘ সময় কান্নার কারণে তার চোখ ফুলে প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
তার স্বামী হায়রি বিসের জানান, সবকিছু এত দ্রুত ঘটেছিল যে তারা সন্তানদের বাঁচানোর মতো সময়ই পাননি। তাদের তিন সন্তানের মধ্যে একজন বেঁচে গেলেও বাকি দুই সন্তান এখন নিখোঁজ।
তিনি বলেন, তারা অনেক চেষ্টা করেও সন্তানদের রক্ষা করতে পারেননি। দুই সন্তানকে এই দ্বীপেই রেখে যেতে হচ্ছে—এই বাস্তবতা তাদের জন্য অসহনীয়।
আটক ফেরির ক্যাপ্টেন ও কর্মীরা
দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে ফেরিটির ক্যাপ্টেন ও কর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে কর্তৃপক্ষ। শনিবার সাইপ্রাসে ভয়াবহ ঝড় হয়েছিল এবং রোববারও সমুদ্র ছিল উত্তাল। তবে ঠিক কী কারণে ফেরিটি উল্টে গেল, তা তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে।
নিখোঁজ সন্তানদের ফিরে পাওয়ার আশায় এখনো কিরেনিয়া বন্দরের বাইরে অপেক্ষা করছেন আয়তেন ও অন্য স্বজনেরা। উত্তাল সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে তাদের একটাই প্রত্যাশা—হয়তো কোনো এক মুহূর্তে উদ্ধারকারী দল তাদের প্রিয়জনদের জীবিত খুঁজে পাবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















