মিশরের পশ্চিমাঞ্চলীয় মরুভূমির আবু তারতুর মালভূমিতে প্রায় ৭ কোটি বছরের পুরোনো একটি সমৃদ্ধ হাঙরের জীবাশ্মভাণ্ডারের সন্ধান পেয়েছেন কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। গবেষকদের ভাষায়, এটি একটি ‘হাঙরের কবরস্থান’, যা ক্রিটেশিয়াস যুগের শেষভাগে ওই অঞ্চলজুড়ে থাকা উষ্ণমণ্ডলীয় সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছে।
আন্ডারগ্র্যাজুয়েট গবেষণা থেকে আন্তর্জাতিক প্রকল্প
এই আবিষ্কারের সূত্রপাত একটি স্নাতক পর্যায়ের ভূতত্ত্ব প্রকল্প থেকে। মিশরের ফসফেট কোম্পানির ভূতত্ত্ববিদ এল-হুসেইন ইব্রাহিম কিছু শিলার নমুনা কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভার্টিব্রেট প্যালিওন্টোলজি ল্যাবরেটরিতে নিয়ে আসেন। পরে ভূতত্ত্বের শিক্ষার্থী তারেক ইয়াসিন ওই নমুনা নিয়ে স্নাতক প্রকল্প শুরু করেন। প্রকল্পটির তত্ত্বাবধানে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদেল-গাওয়াদ।
আবু তারতুরে পরবর্তী মাঠপর্যায়ের গবেষণায় আরও নমুনা সংগ্রহ এবং জীবাশ্মসমৃদ্ধ ফসফেট স্তর পরীক্ষা করা হয়। ধীরে ধীরে প্রকল্পটি বড় আকারের গবেষণায় রূপ নেয়। পরে এতে সুইজারল্যান্ডের জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের জীবাশ্ম বিশেষজ্ঞরাও যুক্ত হন।
একই এলাকায় সাত প্রজাতির হাঙর
গবেষণার প্রথম ফল প্রকাশিত হয় ২০২৪ সালে Historical Biology জার্নালে। এতে বিলুপ্ত ল্যামনিফর্ম হাঙরের দুটি প্রজাতির ৪৯টি জীবাশ্ম দাঁত শনাক্ত করা হয়। এগুলো হলো Scapanorhynchus cf. rapax এবং Cretoxyrhina cf. mantelli। আবু তারতুরের ডুই ফরমেশন থেকে ল্যামনিফর্ম হাঙরের প্রথম বর্ণনাও ছিল এটি।
গবেষকেরা জানান, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে Cretoxyrhina mantelli-এর সবচেয়ে সাম্প্রতিক পরিচিত উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে এখানে। কিছু দাঁতের আকার বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হয়, Scapanorhynchus প্রজাতির কোনো কোনো হাঙরের দৈর্ঘ্য প্রায় ৬ দশমিক ৭ মিটার পর্যন্ত হতে পারে।
চলতি মাসে Cretaceous Research জার্নালে প্রকাশিত দ্বিতীয় গবেষণায় আরও ১৪টি জীবাশ্ম দাঁতের কথা তুলে ধরা হয়। এগুলো পাঁচটি বিলুপ্ত প্রজাতির প্রতিনিধিত্ব করে। এর মধ্যে তিনটি প্রজাতি মিশরে প্রথমবারের মতো শনাক্ত হয়েছে।
দুই গবেষণা মিলিয়ে আবু তারতুরে পরিচিত ল্যামনিফর্ম হাঙরের প্রজাতির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাতটিতে, যা পাঁচটি গণের অন্তর্ভুক্ত। ফলে এটি মিশরে শনাক্ত হওয়া সবচেয়ে সমৃদ্ধ হাঙরের জীবাশ্মস্থলগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।
প্রাচীন সমুদ্রের সমৃদ্ধ বাস্তুতন্ত্র
গবেষকদের মতে, প্রায় ৭ কোটি বছর আগে আবু তারতুর অঞ্চলটি উষ্ণমণ্ডলীয় থেকে উপউষ্ণমণ্ডলীয় একটি পুষ্টিসমৃদ্ধ ও অত্যন্ত উৎপাদনশীল সমুদ্রের অংশ ছিল। সেখানে ছোট মাছ থেকে শুরু করে মাঝারি আকারের শিকারি, বিশাল হাঙর এবং অন্যান্য সামুদ্রিক শিকারি প্রাণীর বসবাস ছিল।
তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, পাওয়া জীবাশ্মগুলো একই সময় ও একই পরিবেশে বসবাসকারী হাঙরের সমষ্টি নাও হতে পারে। ভিন্ন সময় ও পরিবেশে জমা হওয়া জীবাশ্মও একত্রে এই স্তরে সংরক্ষিত হয়ে থাকতে পারে।
কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ সামি আবদেল সাদেক বলেছেন, এই আবিষ্কার ভূবিজ্ঞান ও জীবাশ্মবিদ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার সক্ষমতাকে তুলে ধরে। বিজ্ঞান অনুষদের ডিন সোহেইর রমাদানও এটিকে মিশর ও আফ্রিকার মেরুদণ্ডী প্রাণীর জীবাশ্মের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
দুই গবেষণায় ব্যবহৃত সব নমুনা ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভার্টিব্রেট প্যালিওন্টোলজি ল্যাবরেটরিতে সংরক্ষিত রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিশরের পশ্চিম মরুভূমির বিভিন্ন এলাকায় ডাইনোসর, উড়ন্ত সরীসৃপ, প্রাচীন স্তন্যপায়ী ও জলজ স্তন্যপায়ী প্রাণীর জীবাশ্মও আবিষ্কৃত হয়েছে।
প্রায় ৭ কোটি বছরের পুরোনো এই হাঙরের জীবাশ্মভাণ্ডার মিশরের প্রাচীন সমুদ্রের পরিবেশ ও উত্তর আফ্রিকার সামুদ্রিক জীবনের বিবর্তন সম্পর্কে গবেষণার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
প্রাচীন হাঙরের জীবাশ্ম
মিশরের আবু তারতুরে প্রায় ৭ কোটি বছরের পুরোনো হাঙরের জীবাশ্মস্থল আবিষ্কৃত হয়েছে, যেখানে সাত প্রজাতির বিলুপ্ত হাঙরের জীবাশ্ম দাঁত পাওয়া গেছে।
মিশরের পশ্চিম মরুভূমির আবু তারতুরে প্রায় ৭ কোটি বছরের পুরোনো হাঙরের জীবাশ্মভাণ্ডার আবিষ্কার করেছেন গবেষকেরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















