পোড়া গাড়ি, ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসাবশেষ আর জনশূন্য রাস্তাজুড়ে যুদ্ধের ক্ষত। দূর থেকে ভেসে আসছে গোলন্দাজ হামলার শব্দ, আর আকাশে শোনা যাচ্ছে আক্রমণকারী চালকবিহীন বিমানের তীক্ষ্ণ গুঞ্জন। ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় শহর দ্রুজকিভকার বর্তমান বাস্তবতা এখন এমনই।
রুশ বাহিনী শহরটির মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। ধীরে ধীরে তারা আরও কাছে এগিয়ে আসছে। ভয়াবহ যুদ্ধের মধ্যেও হাতে গোনা কয়েকজন বেসামরিক মানুষ শহরটিতে রয়ে গেছেন। তাদের জীবন এখন প্রতিদিনই ঝুঁকির মধ্যে।
ধ্বংসের দীর্ঘ রেখা
দ্রুজকিভকার চিত্র ইউক্রেনের পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ যুদ্ধসীমার বিস্তৃত বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। রুশ বাহিনী যত এগিয়ে আসছে, ততই আবাসিক ভবন, বাজার, দোকান ও জনপদ ধ্বংস হয়ে পড়ছে।
অনেক শহর ও গ্রাম কার্যত বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠেছে। কোথাও ঘরবাড়ি নেই, কোথাও নেই পরিচিত সেই রাস্তা কিংবা বাজার। যুদ্ধের বিস্ফোরণে মানুষের বহু বছরের জীবন এক মুহূর্তেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে।
৫৬ বছর বয়সী ইরিনা লিতোভচেঙ্কো তাদেরই একজন, যিনি এখনও শহর ছাড়েননি। ভাঙা কাচ আর ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তিনি বলেন, এখন আর ঘুমাতে পারেন না। অপরিচিত কয়েকজন মানুষ তাকে আশ্রয় দিয়েছেন।
তার নিজের বাড়িটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। সেখানে একসময় ছিল তার জীবনের বহু স্মৃতি ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। কিন্তু একটি বিস্ফোরণেই সবকিছু যেন অস্তিত্বহীন হয়ে গেছে।
কৌশলগত দুর্গবেষ্টনীর পথে
দ্রুজকিভকা এমন একটি সড়কের ওপর অবস্থিত, যা ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শহরকে যুক্ত করেছে। এই শহরগুলোকে ঘিরে গড়ে ওঠা প্রতিরক্ষা বলয়কে ইউক্রেনের দুর্গবেষ্টনী হিসেবে দেখা হয়।
রাশিয়া পূর্ব ইউক্রেনের দোনবাস অঞ্চল পুরোপুরি দখল করতে চাইলে এই প্রতিরক্ষা বলয় ভেদ করা তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের যুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য এখনও দোনবাসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া।
তবে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর চার বছরেরও বেশি সময় পরও রুশ বাহিনী ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা পুরোপুরি ভেঙে দিতে পারেনি। তবু সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রায় সামনের সারির শহরগুলোতে ধ্বংসযজ্ঞ বাড়ছে।
আকাশজুড়ে চালকবিহীন বিমানের আতঙ্ক
দ্রুজকিভকায় কামানের বিস্ফোরণের শব্দে ইরিনা খুব একটা বিচলিত হন না। কিন্তু আকাশে চালকবিহীন বিমানের মৃদু গুঞ্জন শুনলেই তিনি থেমে যান এবং আশ্রয়ের জন্য গাছের নিচে চলে যান।
যুদ্ধসীমার আকাশে এখন হাজার হাজার রুশ ও ইউক্রেনীয় চালকবিহীন বিমান ঘুরে বেড়াচ্ছে। দূর থেকে পরিচালিত এসব যন্ত্র সামনের সারিতে থাকা লক্ষ্যবস্তু খুঁজে হামলা চালাচ্ছে।
চালকবিহীন বিমানের হামলা ঠেকাতে দ্রুজকিভকাসহ দুর্গবেষ্টনীর বিভিন্ন সড়কের ওপর জাল টাঙানো হয়েছে। একই সময়ে ইউক্রেনীয় সেনাদের কাছে রসদ পৌঁছে দেওয়া এবং আহতদের সরিয়ে নেওয়ার কাজে চালকবিহীন স্থলযানও ব্যবহার করা হচ্ছে।
‘আমাদের শহর আর নেই’
ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও কেউ কেউ শহর ছেড়ে যেতে রাজি নন। ৬৩ বছর বয়সী জোয়া পুড়ে যাওয়া একটি বাজারের দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে প্রয়োজনীয় কিছু খাদ্যপণ্য বিক্রি করেন।
যেকোনো মুহূর্তে বোমা এসে আঘাত করতে পারে—এ কথা তিনি জানেন। এমনকি তাতে তার মৃত্যু হতে পারে, সেটিও তিনি মেনে নিয়েছেন। কিন্তু জন্মভূমি ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।
ধ্বংস হয়ে যাওয়া শহরের দিকে তাকিয়ে জোয়া বলেন, দৃশ্যটি তাকে কাঁদতে বাধ্য করে। এখানেই তার জন্ম, এখানেই বেড়ে ওঠা। অথচ এখন চারপাশের সবকিছু এমনভাবে বদলে গেছে যে নিজের শহরটিকেই আর চিনতে পারছেন না।
দ্রুজকিভকার ধ্বংসাবশেষ তাই শুধু একটি শহরের যুদ্ধক্ষত নয়; এটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের মধ্যে আটকে থাকা হাজারো মানুষের হারিয়ে যাওয়া ঘর, স্মৃতি ও স্বাভাবিক জীবনের প্রতিচ্ছবি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















