১৯৯১ সাল। উগান্ডা তখনও দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও দারিদ্র্যের ক্ষত বয়ে চলেছে। রাজধানী কাম্পালার প্রধান সড়কগুলোতে বড় বড় গর্ত, অনেক ভবন যুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন বহন করছে, শিল্পনগরীগুলোর কারখানা বন্ধ, পণ্যসামগ্রীর সংকট তীব্র। এমন এক সময়ে দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হওয়ার মতো কারণ খুব বেশি ছিল না।
ঠিক সেই সময়েই উগান্ডায় প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেয় স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক গ্রুপ। ১৯৯১-৯২ সালে গ্রিন্ডলেজ ব্যাংক অব ইস্ট আফ্রিকা অধিগ্রহণের মাধ্যমে উগান্ডার বাজারে আসে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, যা পরবর্তীতে স্ট্যানবিক ব্যাংক উগান্ডা নামে দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
আজ সেই সিদ্ধান্তের ৩৫ বছর পূর্তি। পেছনে তাকালে দেখা যায়, এটি শুধু একটি ব্যাংকের উগান্ডায় ব্যবসা শুরুর গল্প নয়; বরং একটি সংকটগ্রস্ত অর্থনীতির পুনর্গঠনের সঙ্গে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি যাত্রার গল্প।
যখন উগান্ডার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা
১৯৯১ সালের উগান্ডাকে আজকের উগান্ডার সঙ্গে তুলনা করা কঠিন। কাম্পালা রোডের দুই পাশে তখন বেশির ভাগ ভবন ছিল একতলা। ছোট ব্যবসা, ভিডিও লাইব্রেরি, সাদা-কালো ছবির স্টুডিও, সেলুন ও দুগ্ধজাত পণ্যের দোকান ছিল শহরের পরিচিত দৃশ্য।
১৯৭৯ সালের যুদ্ধের ক্ষতও তখনও দৃশ্যমান। কাম্পালা রোডের কিছু ভবনের দেয়াল বিস্ফোরণে উড়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে নক্রুমাহ ও নাসের সড়কে ছিল বড় বড় গর্ত। ৪৫ কিলোমিটারের কাম্পালা-লুগাজি পথ পাড়ি দিতে গাড়িতে প্রায় তিন ঘণ্টা লাগত—যানজটের কারণে নয়, সড়কের দুরবস্থার কারণে।
দেশটির একসময়কার গুরুত্বপূর্ণ শিল্পনগরী জিনজা ও এমবালে তখন অনেকটাই নিস্তব্ধ। কয়েক বছর আগেই বহু কারখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস কফি উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল।
রাজনৈতিক পরিস্থিতিও ছিল নাজুক। উত্তরে তখনও সশস্ত্র সংঘাত চলছিল। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সংস্কারের কারণে বহু মানুষ চাকরি হারাচ্ছিলেন। এর মধ্যেই দেশটির ব্যাংকিং খাতে দেখা দিচ্ছিল বড় ধরনের সংকট, যা পরবর্তীতে পাঁচটি স্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে পতনের দিকে ঠেলে দেয় এবং কয়েকটি আন্তর্জাতিক ব্যাংকের কার্যক্রমও দুর্বল করে দেয়।
সাংবাদিক মাইকেল ওয়াকাবির স্মৃতিতে সেই সময়ের উগান্ডা ছিল গভীর হতাশার একটি দেশ। আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো অনেক শহর থেকে শাখা গুটিয়ে কাম্পালায় নিজেদের কার্যক্রম কেন্দ্রীভূত করছিল। একদিকে শিল্পকারখানা বন্ধ, অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলে সংঘাত—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল।
এমন সময়ে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের সিদ্ধান্ত
এই বাস্তবতার মধ্যেই স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক গ্রুপ উগান্ডায় প্রবেশ করে। ১৯৯১-৯২ সালে গ্রিন্ডলেজ ব্যাংক অব ইস্ট আফ্রিকা অধিগ্রহণের মাধ্যমে দেশটির ব্যাংকিং বাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি।
এটি ছিল এমন একটি বাজারে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত, যেখানে তাৎক্ষণিক সাফল্যের নিশ্চয়তা ছিল না। বরং ব্যাংকটির হিসাব ছিল দীর্ঘমেয়াদি।
মাইকেল ওয়াকাবির ভাষায়, সেই সময়ে উগান্ডায় বিনিয়োগ করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করতে হতো। অনেক প্রতিষ্ঠান দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা হারিয়েছিল। কিন্তু স্ট্যানবিক মনে করেছিল, পরিস্থিতি একসময় স্থিতিশীল হবে এবং অর্থনীতিকে পুনর্গঠন ও প্রবৃদ্ধির পথে নিতে শক্তিশালী আর্থিক সেবার প্রয়োজন হবে।
স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের আফ্রিকায় উপস্থিতির ইতিহাসও ছিল দীর্ঘ। ১৬০ বছরের বেশি সময় ধরে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসা করেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় তারা শুধু নিরাপদ ও নিশ্চিত বাজারেই বিনিয়োগ করেনি; বরং যেখানে দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা দেখেছে, সেখানেও ধৈর্য ও প্রতিশ্রুতি নিয়ে এগিয়েছে।
উগান্ডার ক্ষেত্রেও সেই দর্শনই কাজ করেছিল।
ব্যাংক থেকে দেশের উন্নয়নের অংশীদার
উগান্ডার অর্থনীতি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করলে স্ট্যানবিকের ভূমিকাও বদলাতে থাকে।
২০০২ সালে সরকার উগান্ডা কমার্শিয়াল ব্যাংকের বেসরকারীকরণ সম্পন্ন করে। দেশটির অর্থনৈতিক ইতিহাসে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এ সিদ্ধান্ত নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক হলেও ব্যাংকিং খাতের জন্য এটি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়।
স্ট্যানবিকের জন্যও এটি ছিল একটি মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। উগান্ডা কমার্শিয়াল ব্যাংক অধিগ্রহণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি আর শুধু একটি তুলনামূলক ছোট বা বিশেষায়িত ব্যাংক হিসেবে থাকেনি; দেশের অর্থনীতির আরও গভীরে প্রবেশের সুযোগ পায়।
ততদিনে উগান্ডার পুনর্গঠন প্রচেষ্টা ফল দিতে শুরু করেছে। অর্থনীতি বাড়ছিল, উদ্যোক্তা শ্রেণি নতুন করে সক্রিয় হচ্ছিল। কিন্তু শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন ছিল।
এই সময়েই স্ট্যানবিকের একটি ধারণা প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে—“Uganda is Home. We Drive Her Growth.”
অর্থাৎ উগান্ডাকে শুধু ব্যবসার বাজার হিসেবে নয়, নিজেদের ঘর হিসেবে দেখা। এই ধারণার সঙ্গে যুক্ত ছিল একটি বড় দায়িত্ব—দেশটির অর্থনৈতিক সাফল্যের সঙ্গে নিজেদের সাফল্যকে যুক্ত করা।
স্ট্যানবিক উগান্ডার সাবেক প্রধান নির্বাহী প্যাট্রিক মওয়েহেইরে মনে করেন, এই দর্শনের গুরুত্ব ছিল এর দায়িত্ববোধে। কোনো দেশকে যদি নিজের ঘর হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে সম্পর্কটি কেবল ব্যবসায়িক লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।
কৃষি থেকে জ্বালানি—অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে অর্থায়ন
৩৫ বছরে স্ট্যানবিক উগান্ডার অর্থনীতির বিভিন্ন উৎপাদনশীল খাতে গুরুত্বপূর্ণ অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। কৃষি, উৎপাদন, অবকাঠামো, বাণিজ্য ও জ্বালানি—বিভিন্ন খাতে ব্যাংকটির কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে।
শুধু বড় প্রতিষ্ঠান নয়, অর্থনীতির তুলনামূলক কম সুবিধাপ্রাপ্ত অংশের মানুষকেও আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনার চেষ্টা করেছে ব্যাংকটি। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আর্থিক সুযোগ তৈরি, গ্রামীণ এলাকার মানুষকে ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা, সঞ্চয়ভিত্তিক সংগঠনগুলোকে ঋণ দেওয়া এবং অনানুষ্ঠানিক ব্যবসাকে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় নিয়ে আসার মতো কার্যক্রমও এর অংশ হয়েছে।
তরুণদের উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবনী দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এর ফলে নারী, তরুণ ও কৃষকদের মতো জনগোষ্ঠীকে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নেতৃত্ব বদলেছে, বদলেছে ব্যাংকের ভূমিকাও
উগান্ডায় প্রথম দশক, অর্থাৎ ১৯৯১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত স্ট্যানবিকের নেতৃত্বে ছিলেন স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক গ্রুপের একাধিক কর্মকর্তা। এ বি মায়ার্স, ডেভ এডগার, জন মারে, জন মিলার ও অ্যান্থনি ক্লেনসমিচ—তাঁরা প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক ভিত্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখেন।
২০০১ সালে কিতিলি এমবাথি ব্যাংকটির প্রথম আফ্রিকান প্রধান নির্বাহী হন। উগান্ডা কমার্শিয়াল ব্যাংক অধিগ্রহণ ও একীভূতকরণের গুরুত্বপূর্ণ সময়টি তাঁর নেতৃত্বেই এগোয়।
এরপর ২০০৭ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন ফিলিপ ওদেরা। তাঁর পর প্যাট্রিক মওয়েহেইরে হন ব্যাংকটির প্রথম উগান্ডান প্রধান নির্বাহী। পরে অ্যান জুকো হন প্রথম নারী প্রধান নির্বাহী। সামুয়েল মওগেজা অন্তর্বর্তী সময়ে দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০২৫ সালে মুম্বা কেনেথ কালিফুংওয়া প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব নেন।
এই দীর্ঘ সময়ে ব্যাংককে সামলাতে হয়েছে একের পর এক পরিবর্তন—ব্যবসা সম্প্রসারণ, প্রতিষ্ঠান একীভূতকরণ, ডিজিটাল রূপান্তর, টেকসই উন্নয়ন এবং পরিবর্তিত গ্রাহক চাহিদা।
তবে প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য একই থেকেছে—উগান্ডার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে নিজেদের ভবিষ্যৎকে যুক্ত রাখা।

৩৫ বছরে একটি যৌথ যাত্রা
স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক গ্রুপের সেন্ট্রাল ও সাদার্ন আফ্রিকা অঞ্চলের প্রধান নির্বাহী ফ্রান্সিস কারুহাঙ্গার মতে, স্ট্যানবিকের ইতিহাসকে উগান্ডার উন্নয়নের ইতিহাস থেকে আলাদা করে দেখা যায় না।
দেশ যতটা বেড়েছে, ব্যাংকও ততটা বেড়েছে। উগান্ডার অর্থনীতির প্রতিটি বড় পরিবর্তনের সঙ্গে ব্যাংকটির বিবর্তনের একটি সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ফলে এটি শুধু একটি ব্যাংকের ৩৫ বছরের ব্যবসায়িক যাত্রা নয়; বরং একটি দেশের পরিবর্তনের সঙ্গে একটি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি এগিয়ে চলার গল্প।
আজকের উগান্ডা আর ১৯৯১ সালের উগান্ডা নয়। শিল্পায়ন, জ্বালানি খাতের উন্নয়ন, আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগ এবং দ্রুত বাড়তে থাকা জনসংখ্যা দেশটির সামনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
অবশ্য সম্ভাবনার সঙ্গে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এখন প্রশ্ন শুধু অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নয়; বরং কীভাবে সম্ভাবনাকে মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও টেকসই সমৃদ্ধিতে রূপ দেওয়া যায়।
স্ট্যানবিক উগান্ডা হোল্ডিং লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী মার্ক ওচিটি ওঙ্গোমের মতে, ৩৫ বছরের আসল গল্প হলো এই সময়ের মধ্যে উগান্ডার ব্যাপক পরিবর্তন। ব্যাংকটির যাত্রার গুরুত্বও তাই দেশের সামগ্রিক যাত্রার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।
ঝুঁকির সময়ে নেওয়া সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি ফল
১৯৯১ সালে যখন স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক উগান্ডায় প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল প্রবল। যুদ্ধের ক্ষত, দুর্বল অবকাঠামো, দারিদ্র্য, এইচআইভি/এইডসের ভয়াবহতা, শিল্পখাতের পতন এবং ব্যাংকিং সংকট—সব মিলিয়ে এটি ছিল ঝুঁকিপূর্ণ একটি বাজার।
কিন্তু ব্যাংকটি সেই সময়ের সংকটের চেয়ে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল।
৩৫ বছর পর সেই সিদ্ধান্তের ফলাফল অনেকটাই স্পষ্ট। যে দেশকে একসময় বহু প্রতিষ্ঠান অনিশ্চিত ভবিষ্যতের বাজার হিসেবে দেখেছিল, সেই দেশ আজ আফ্রিকার তুলনামূলক স্থিতিস্থাপক প্রবৃদ্ধির গল্পগুলোর একটি। আর স্ট্যানবিকও দেশটির বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।
তবে এই গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়তো ব্যবসায়িক মুনাফার বাইরে। বিনিয়োগ শুধু কোনো একটি বাজারে অর্থ ঢালার বিষয় নয়; কখনো কখনো সেটি একটি দেশের ভবিষ্যতের ওপর আস্থার প্রকাশও হতে পারে।
৩৫ বছর আগে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক গ্রুপ উগান্ডার সম্ভাবনার ওপর সেই আস্থাই দেখিয়েছিল। তখন হয়তো সিদ্ধান্তটি ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেটিই হয়ে উঠেছে একটি দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের ভিত্তি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















