১২:২৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সংযুক্ত আরব আমিরাতে হাইব্রিড-ইলেকট্রিক গাড়ির চাহিদা বাড়ছে, এগিয়ে টয়োটা-টেসলা-বিওয়াইডি নিখোঁজের পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার, সাত মাসে এখনো নিখোঁজ ২ হাজারের বেশি রিয়াদ বিমানবন্দরের কাছে ভয়াবহ আগুন, হুথি হামলার পর ব্যাপক ফ্লাইট বিপর্যয় সৌদি আরবের আকাশে বাড়ছে হুমকি, রিয়াদসহ গুরুত্বপূর্ণ শহরে জরুরি সতর্কতা ২০২৬ সালের বিশ্বের সেরা ২০ এয়ারলাইন, শীর্ষে সিঙ্গাপুর—কাতার দ্বিতীয়, এমিরেটস ষষ্ঠ ইরানের ৭ শর্ত, আলোচনার পথে কি যুক্তরাষ্ট্র–তেহরান? ইউক্রেন যুদ্ধে যৌন সহিংসতার ভয়াবহ চিত্র, জাতিসংঘের নথিতে ৮৯% অভিযোগ রাশিয়ার বিরুদ্ধে চীনের কাছে ১৩ গোল, এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের মেয়েদের কঠিন অভিষেক রাশিয়ায় ভোট, পুতিনের সামনে যুদ্ধের বার্তা ময়মনসিংহে গভীর রাতে বাসে আগুন, তদন্তে পুলিশ

ইউক্রেনকে সহায়তার স্বার্থপর যুক্তিও এখন ইউরোপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ

যুদ্ধের গতিপথ কত দ্রুত বদলে যেতে পারে, ইউক্রেন যুদ্ধ তার একটি বড় উদাহরণ। কয়েক মাস আগেও মনে হচ্ছিল, রাশিয়া যুদ্ধক্ষেত্রে খুব বেশি এগোতে পারছে না। সামনের সারিতে অগ্রগতি সীমিত ছিল, অথচ রুশ বাহিনী প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক হতাহতের মুখে পড়ছিল। একই সময়ে ইউক্রেন রাশিয়ার ভূখণ্ডের গভীরে হামলা চালিয়ে মস্কোর ওপর চাপ বাড়াচ্ছিল।

কিন্তু সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। রাশিয়া নতুন প্রযুক্তি এবং বাড়তি উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে ইউক্রেনের শহর, অবকাঠামো ও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থার ওপর হামলা বাড়িয়েছে। লক্ষ্য শুধু সামরিক স্থাপনা নয়; সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তোলা এবং দীর্ঘমেয়াদে ইউক্রেনের অর্থনীতি ও জনমনে চাপ সৃষ্টি করাও এই কৌশলের অংশ বলে মনে হচ্ছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে ইউক্রেন ভেঙে পড়ার মুখে। দেশটির সামনের সারির প্রতিরক্ষা এখনো শক্ত অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের নতুন প্রযুক্তি ও কৌশল ইউরোপের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে। কারণ ইউক্রেনে যে ধরনের যুদ্ধ চলছে, তা ভবিষ্যতের ইউরোপীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতির একটি নমুনা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

বদলে যাচ্ছে রাশিয়ার আকাশযুদ্ধ

রাশিয়া সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেনের শহর, সীমান্ত পারাপারের গুরুত্বপূর্ণ পথ এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অনেক দূরের অবকাঠামোতে বিমান ও ড্রোন হামলা জোরদার করেছে। এসব হামলায় নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ছে।

এর একটি উদাহরণ হলো ‘শাহেদ’ ড্রোন। আগে যেসব ড্রোনে প্রপেলারচালিত ইঞ্জিন ব্যবহার করা হতো, রাশিয়া এখন তার পরিবর্তে জেটচালিত সংস্করণ ব্যবহারের দিকে এগোচ্ছে। এগুলো মোকাবিলায় ইউক্রেনের আরও উন্নত ও ব্যয়বহুল প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োজন হতে পারে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে ড্রোন পরিচালনার পদ্ধতিতে। রাশিয়া ড্রোনগুলোর মধ্যে রেডিও রিলে ব্যবহার করে একটি ধরনের ‘জাল’ বা ‘মেশ’ যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি করছে। এর ফলে ড্রোন শুধু আগে থেকে নির্ধারিত স্থানে আঘাত করার পরিবর্তে চলমান লক্ষ্যবস্তুও শনাক্ত ও অনুসরণ করতে সক্ষম হতে পারে। রেলপথের মতো চলমান বা পরিবর্তনশীল লক্ষ্যবস্তু এতে বিশেষভাবে ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

রাশিয়া একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্টারলিংক ব্যবস্থার অনুরূপ নিজস্ব একটি স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি সফল হলে ২০২৭ সালে রাশিয়ার দূরপাল্লার হামলার সক্ষমতা আরও বাড়তে পারে—যদিও এর প্রকৃত সামরিক প্রভাব এখনই নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।

সংখ্যাই হয়ে উঠছে বড় শক্তি

রাশিয়ার আরেকটি বড় সুবিধা হলো বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরে রাশিয়ার জেটচালিত শাহেদ ড্রোনের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ২৪ হাজার।

একটি হিসাব অনুযায়ী, রাশিয়া প্রতি মাসে ১০০টির বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও ছুড়তে সক্ষম হতে পারে। ইউক্রেন এবং তার মিত্ররা যখন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও বিশেষ করে প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতিতে রয়েছে, তখন এই বিপুল অস্ত্রের ব্যবহার কিয়েভের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

তবে এসব অস্ত্রের ব্যবহারকে রাশিয়ার নিশ্চিত বিজয়ের পথ হিসেবে দেখার কারণ নেই। বেসামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করে সামরিকভাবে সরাসরি কতটা সুবিধা পাওয়া যায়, তা সীমিত। কিন্তু রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কৌশলের একটি সম্ভাব্য উদ্দেশ্য হতে পারে ইউক্রেনীয় জনগণের মধ্যে ভয় তৈরি করা, মনোবল দুর্বল করা এবং অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা।

মানুষ যদি নিরাপত্তার কারণে দেশ ছাড়তে থাকে, বিনিয়োগ ও অর্থের প্রবাহ কমে যায় এবং অর্থনীতি আরও দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের সামনের সারিতেও পড়তে পারে।

ইউক্রেনের ভেতরের চাপও বাড়ছে

যুদ্ধের বাইরের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও ইউক্রেনের জন্য সহজ নয়। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির বিরুদ্ধে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার অভিযোগ রয়েছে এবং দুর্নীতি নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়িত্বের সঙ্গে এসব রাজনৈতিক চাপ যুক্ত হলে সরকারের জন্য জনসমর্থন ধরে রাখা আরও কঠিন হতে পারে।

তাই ইউক্রেনের সামনে শুধু রুশ বাহিনীর মোকাবিলা করার প্রশ্ন নেই। একই সঙ্গে অর্থনীতি সচল রাখা, জনগণের মনোবল ধরে রাখা এবং প্রতিরক্ষা শিল্পকে দ্রুত সম্প্রসারণ করার প্রয়োজন রয়েছে।

শীতকাল পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। জ্বালানি ও অবকাঠামোর ওপর হামলা বাড়লে ইউক্রেনীয় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠবে। ফলে রাশিয়ার চাপ মোকাবিলায় ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

ইউরোপের সামনে বড় প্রশ্ন

এই পরিস্থিতিতে ইউরোপের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয়গুলোর একটি হলো ইউক্রেনকে দেওয়া সহায়তা দ্রুত বাস্তবায়ন করা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ন্যাটোর সদস্য দেশগুলো চলতি বছরে ইউক্রেনকে দ্বিপক্ষীয় সামরিক সহায়তা হিসেবে প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও সেই অর্থের একটি বড় অংশ এখনো বাস্তবে পৌঁছায়নি।

ইউক্রেনের সামরিক কর্মকর্তারা প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলারের বাজেট ঘাটতির কথা বলছেন। একই সময়ে তারা চলতি বছরে প্রায় এক কোটি ড্রোন তৈরির পরিকল্পনা করছে। অর্থাৎ যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে, কিন্তু সেই প্রয়োজন মেটাতে অর্থ ও সামরিক সরঞ্জামের জোগান এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইউক্রেনকে প্রায় ৯০ বিলিয়ন ইউরো সহায়তার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তার বাস্তবায়ন তুলনামূলকভাবে এগোচ্ছে। তবে ইউক্রেনের প্রয়োজন মেটাতে অর্থ দ্রুত ছাড় করার প্রয়োজন রয়েছে।

শুধু অস্ত্র নয়, দরকার শিল্প সক্ষমতা

ইউক্রেনকে অর্থ দেওয়ার প্রয়োজন শুধু রাষ্ট্রীয় বাজেট সচল রাখার জন্য নয়। যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি তৈরি করাও জরুরি।

ইউক্রেন ইতিমধ্যে ড্রোন ও অন্যান্য সামরিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নিজস্ব উদ্ভাবনের সক্ষমতা দেখিয়েছে। পশ্চিমা সহায়তা পাওয়া গেলে দেশটি ভবিষ্যতে তুলনামূলক কম খরচে নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির সক্ষমতা বাড়াতে পারে।

এটি ইউক্রেনের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ইউরোপের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত প্রযুক্তি ও কৌশল সম্পর্কে ইউক্রেনের যে অভিজ্ঞতা তৈরি হচ্ছে, তা অন্য ইউরোপীয় দেশের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাতেও কাজে লাগতে পারে।

ইউক্রেনের নিরাপত্তা কেন ইউরোপের স্বার্থের বিষয়

ইউক্রেনকে সহায়তার পক্ষে নৈতিক যুক্তি দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। একটি দেশকে তার ভূখণ্ড ও জনগণের নিরাপত্তা রক্ষায় সহায়তা করার বিষয়টি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু এর পাশাপাশি ইউরোপের নিজস্ব স্বার্থের যুক্তিটিও এখন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে।

রাশিয়া ইউরোপকে নিজের নিরাপত্তা ও সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে—এমন ধারণা ইউরোপীয় নিরাপত্তা আলোচনায় ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে। রুশ বাহিনী ড্রোন ও অন্যান্য অসম যুদ্ধকৌশল ব্যবহারে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করছে, তা ভবিষ্যতের সংঘাতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

অন্যদিকে ইউরোপের অনেক দেশ এখনো এমন বৃহৎ মাত্রার ড্রোন যুদ্ধ, দূরপাল্লার হামলা এবং ব্যাপক আকাশ প্রতিরক্ষার প্রয়োজনীয়তার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।

এই কারণেই ইউক্রেনকে শুধু বর্তমান যুদ্ধের একটি পক্ষ হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার নতুন প্রযুক্তি, অস্ত্র উৎপাদন এবং হামলার কৌশল সম্পর্কে যে অভিজ্ঞতা তৈরি হচ্ছে, তা ইউরোপের ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ইউরোপ ইতিমধ্যে ইউক্রেনকে ব্যাপক সহায়তা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কমে যাওয়ার পর ইউরোপকে আরও বড় ভূমিকা নিতে হয়েছে। এখন নতুন করে আরও অর্থ ও অস্ত্র দেওয়ার দাবি রাজনৈতিকভাবে কঠিন হতে পারে, বিশেষ করে ইউরোপের কিছু জনতুষ্টিবাদী ডানপন্থী দল যখন ইউক্রেনের জন্য সহায়তা কমানোর পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে।

তবু দীর্ঘমেয়াদে ইউক্রেনকে সহায়তা করা শুধু নৈতিক দায়িত্বের প্রশ্ন নয়; ইউরোপের নিজের নিরাপত্তার সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।

ইউক্রেন যে যুদ্ধ লড়ছে, সেটি একই সঙ্গে ভবিষ্যতের যুদ্ধের একটি পরীক্ষাগার হয়ে উঠেছে। ড্রোন, স্যাটেলাইট যোগাযোগ, ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং দ্রুত অস্ত্র উৎপাদনের যে প্রতিযোগিতা সেখানে চলছে, তার প্রভাব ইউক্রেনের সীমানার বাইরেও পড়তে পারে।

সেই কারণে ইউক্রেনকে সহায়তা করার যুক্তি এখন শুধু ‘অন্য একটি দেশকে সাহায্য করা’ নয়। ইউরোপের নিজের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

সংযুক্ত আরব আমিরাতে হাইব্রিড-ইলেকট্রিক গাড়ির চাহিদা বাড়ছে, এগিয়ে টয়োটা-টেসলা-বিওয়াইডি

ইউক্রেনকে সহায়তার স্বার্থপর যুক্তিও এখন ইউরোপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ

১১:০২:৪৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যুদ্ধের গতিপথ কত দ্রুত বদলে যেতে পারে, ইউক্রেন যুদ্ধ তার একটি বড় উদাহরণ। কয়েক মাস আগেও মনে হচ্ছিল, রাশিয়া যুদ্ধক্ষেত্রে খুব বেশি এগোতে পারছে না। সামনের সারিতে অগ্রগতি সীমিত ছিল, অথচ রুশ বাহিনী প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক হতাহতের মুখে পড়ছিল। একই সময়ে ইউক্রেন রাশিয়ার ভূখণ্ডের গভীরে হামলা চালিয়ে মস্কোর ওপর চাপ বাড়াচ্ছিল।

কিন্তু সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। রাশিয়া নতুন প্রযুক্তি এবং বাড়তি উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে ইউক্রেনের শহর, অবকাঠামো ও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থার ওপর হামলা বাড়িয়েছে। লক্ষ্য শুধু সামরিক স্থাপনা নয়; সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তোলা এবং দীর্ঘমেয়াদে ইউক্রেনের অর্থনীতি ও জনমনে চাপ সৃষ্টি করাও এই কৌশলের অংশ বলে মনে হচ্ছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে ইউক্রেন ভেঙে পড়ার মুখে। দেশটির সামনের সারির প্রতিরক্ষা এখনো শক্ত অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের নতুন প্রযুক্তি ও কৌশল ইউরোপের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে। কারণ ইউক্রেনে যে ধরনের যুদ্ধ চলছে, তা ভবিষ্যতের ইউরোপীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতির একটি নমুনা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

বদলে যাচ্ছে রাশিয়ার আকাশযুদ্ধ

রাশিয়া সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেনের শহর, সীমান্ত পারাপারের গুরুত্বপূর্ণ পথ এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অনেক দূরের অবকাঠামোতে বিমান ও ড্রোন হামলা জোরদার করেছে। এসব হামলায় নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ছে।

এর একটি উদাহরণ হলো ‘শাহেদ’ ড্রোন। আগে যেসব ড্রোনে প্রপেলারচালিত ইঞ্জিন ব্যবহার করা হতো, রাশিয়া এখন তার পরিবর্তে জেটচালিত সংস্করণ ব্যবহারের দিকে এগোচ্ছে। এগুলো মোকাবিলায় ইউক্রেনের আরও উন্নত ও ব্যয়বহুল প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োজন হতে পারে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে ড্রোন পরিচালনার পদ্ধতিতে। রাশিয়া ড্রোনগুলোর মধ্যে রেডিও রিলে ব্যবহার করে একটি ধরনের ‘জাল’ বা ‘মেশ’ যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি করছে। এর ফলে ড্রোন শুধু আগে থেকে নির্ধারিত স্থানে আঘাত করার পরিবর্তে চলমান লক্ষ্যবস্তুও শনাক্ত ও অনুসরণ করতে সক্ষম হতে পারে। রেলপথের মতো চলমান বা পরিবর্তনশীল লক্ষ্যবস্তু এতে বিশেষভাবে ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

রাশিয়া একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্টারলিংক ব্যবস্থার অনুরূপ নিজস্ব একটি স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি সফল হলে ২০২৭ সালে রাশিয়ার দূরপাল্লার হামলার সক্ষমতা আরও বাড়তে পারে—যদিও এর প্রকৃত সামরিক প্রভাব এখনই নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।

সংখ্যাই হয়ে উঠছে বড় শক্তি

রাশিয়ার আরেকটি বড় সুবিধা হলো বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরে রাশিয়ার জেটচালিত শাহেদ ড্রোনের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ২৪ হাজার।

একটি হিসাব অনুযায়ী, রাশিয়া প্রতি মাসে ১০০টির বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও ছুড়তে সক্ষম হতে পারে। ইউক্রেন এবং তার মিত্ররা যখন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও বিশেষ করে প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতিতে রয়েছে, তখন এই বিপুল অস্ত্রের ব্যবহার কিয়েভের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

তবে এসব অস্ত্রের ব্যবহারকে রাশিয়ার নিশ্চিত বিজয়ের পথ হিসেবে দেখার কারণ নেই। বেসামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করে সামরিকভাবে সরাসরি কতটা সুবিধা পাওয়া যায়, তা সীমিত। কিন্তু রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কৌশলের একটি সম্ভাব্য উদ্দেশ্য হতে পারে ইউক্রেনীয় জনগণের মধ্যে ভয় তৈরি করা, মনোবল দুর্বল করা এবং অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা।

মানুষ যদি নিরাপত্তার কারণে দেশ ছাড়তে থাকে, বিনিয়োগ ও অর্থের প্রবাহ কমে যায় এবং অর্থনীতি আরও দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের সামনের সারিতেও পড়তে পারে।

ইউক্রেনের ভেতরের চাপও বাড়ছে

যুদ্ধের বাইরের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও ইউক্রেনের জন্য সহজ নয়। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির বিরুদ্ধে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার অভিযোগ রয়েছে এবং দুর্নীতি নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়িত্বের সঙ্গে এসব রাজনৈতিক চাপ যুক্ত হলে সরকারের জন্য জনসমর্থন ধরে রাখা আরও কঠিন হতে পারে।

তাই ইউক্রেনের সামনে শুধু রুশ বাহিনীর মোকাবিলা করার প্রশ্ন নেই। একই সঙ্গে অর্থনীতি সচল রাখা, জনগণের মনোবল ধরে রাখা এবং প্রতিরক্ষা শিল্পকে দ্রুত সম্প্রসারণ করার প্রয়োজন রয়েছে।

শীতকাল পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। জ্বালানি ও অবকাঠামোর ওপর হামলা বাড়লে ইউক্রেনীয় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠবে। ফলে রাশিয়ার চাপ মোকাবিলায় ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

ইউরোপের সামনে বড় প্রশ্ন

এই পরিস্থিতিতে ইউরোপের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয়গুলোর একটি হলো ইউক্রেনকে দেওয়া সহায়তা দ্রুত বাস্তবায়ন করা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ন্যাটোর সদস্য দেশগুলো চলতি বছরে ইউক্রেনকে দ্বিপক্ষীয় সামরিক সহায়তা হিসেবে প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও সেই অর্থের একটি বড় অংশ এখনো বাস্তবে পৌঁছায়নি।

ইউক্রেনের সামরিক কর্মকর্তারা প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলারের বাজেট ঘাটতির কথা বলছেন। একই সময়ে তারা চলতি বছরে প্রায় এক কোটি ড্রোন তৈরির পরিকল্পনা করছে। অর্থাৎ যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে, কিন্তু সেই প্রয়োজন মেটাতে অর্থ ও সামরিক সরঞ্জামের জোগান এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইউক্রেনকে প্রায় ৯০ বিলিয়ন ইউরো সহায়তার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তার বাস্তবায়ন তুলনামূলকভাবে এগোচ্ছে। তবে ইউক্রেনের প্রয়োজন মেটাতে অর্থ দ্রুত ছাড় করার প্রয়োজন রয়েছে।

শুধু অস্ত্র নয়, দরকার শিল্প সক্ষমতা

ইউক্রেনকে অর্থ দেওয়ার প্রয়োজন শুধু রাষ্ট্রীয় বাজেট সচল রাখার জন্য নয়। যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি তৈরি করাও জরুরি।

ইউক্রেন ইতিমধ্যে ড্রোন ও অন্যান্য সামরিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নিজস্ব উদ্ভাবনের সক্ষমতা দেখিয়েছে। পশ্চিমা সহায়তা পাওয়া গেলে দেশটি ভবিষ্যতে তুলনামূলক কম খরচে নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির সক্ষমতা বাড়াতে পারে।

এটি ইউক্রেনের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ইউরোপের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত প্রযুক্তি ও কৌশল সম্পর্কে ইউক্রেনের যে অভিজ্ঞতা তৈরি হচ্ছে, তা অন্য ইউরোপীয় দেশের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাতেও কাজে লাগতে পারে।

ইউক্রেনের নিরাপত্তা কেন ইউরোপের স্বার্থের বিষয়

ইউক্রেনকে সহায়তার পক্ষে নৈতিক যুক্তি দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। একটি দেশকে তার ভূখণ্ড ও জনগণের নিরাপত্তা রক্ষায় সহায়তা করার বিষয়টি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু এর পাশাপাশি ইউরোপের নিজস্ব স্বার্থের যুক্তিটিও এখন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে।

রাশিয়া ইউরোপকে নিজের নিরাপত্তা ও সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে—এমন ধারণা ইউরোপীয় নিরাপত্তা আলোচনায় ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে। রুশ বাহিনী ড্রোন ও অন্যান্য অসম যুদ্ধকৌশল ব্যবহারে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করছে, তা ভবিষ্যতের সংঘাতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

অন্যদিকে ইউরোপের অনেক দেশ এখনো এমন বৃহৎ মাত্রার ড্রোন যুদ্ধ, দূরপাল্লার হামলা এবং ব্যাপক আকাশ প্রতিরক্ষার প্রয়োজনীয়তার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।

এই কারণেই ইউক্রেনকে শুধু বর্তমান যুদ্ধের একটি পক্ষ হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার নতুন প্রযুক্তি, অস্ত্র উৎপাদন এবং হামলার কৌশল সম্পর্কে যে অভিজ্ঞতা তৈরি হচ্ছে, তা ইউরোপের ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ইউরোপ ইতিমধ্যে ইউক্রেনকে ব্যাপক সহায়তা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কমে যাওয়ার পর ইউরোপকে আরও বড় ভূমিকা নিতে হয়েছে। এখন নতুন করে আরও অর্থ ও অস্ত্র দেওয়ার দাবি রাজনৈতিকভাবে কঠিন হতে পারে, বিশেষ করে ইউরোপের কিছু জনতুষ্টিবাদী ডানপন্থী দল যখন ইউক্রেনের জন্য সহায়তা কমানোর পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে।

তবু দীর্ঘমেয়াদে ইউক্রেনকে সহায়তা করা শুধু নৈতিক দায়িত্বের প্রশ্ন নয়; ইউরোপের নিজের নিরাপত্তার সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।

ইউক্রেন যে যুদ্ধ লড়ছে, সেটি একই সঙ্গে ভবিষ্যতের যুদ্ধের একটি পরীক্ষাগার হয়ে উঠেছে। ড্রোন, স্যাটেলাইট যোগাযোগ, ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং দ্রুত অস্ত্র উৎপাদনের যে প্রতিযোগিতা সেখানে চলছে, তার প্রভাব ইউক্রেনের সীমানার বাইরেও পড়তে পারে।

সেই কারণে ইউক্রেনকে সহায়তা করার যুক্তি এখন শুধু ‘অন্য একটি দেশকে সাহায্য করা’ নয়। ইউরোপের নিজের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে।