১২:৫৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বৃষ্টিতে ঢাকার বাতাসে স্বস্তি, নামল দূষণের মাত্রা দুবাইয়ের নতুন জলশহরে বদলে যাচ্ছে বিলাসী জীবনের ধারণা, ৩ বেডরুমের অ্যাপার্টমেন্টে তারই ইঙ্গিত জাঞ্জিবারে দ্বিতীয় ‘রাশিদ ভিলেজ’ প্রকল্প চালুর নির্দেশ শেখ হামদানের মস্কো অঞ্চলে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় নিহত ২, রুশ রাজধানীর তেল শোধনাগারেও আঘাত ভারত-আমিরাত সম্পর্ক আরও জোরদারে মোদি-শেখ মোহামেদের আলোচনা দুবাইয়ের ফ্যাশনে নতুন মোড়, শোর চেয়ে এখন বড় হচ্ছে ব্যবসা ম্যাকলমোর বিতর্কে অবস্থান বদল, কনসার্টে ক্ষমা চাইলেন এড শিরান দুবাই মলে হঠাৎ হাজির শেখ মোহাম্মদ, অবাক দর্শনার্থীরা সংযুক্ত আরব আমিরাতে হাইব্রিড-ইলেকট্রিক গাড়ির চাহিদা বাড়ছে, এগিয়ে টয়োটা-টেসলা-বিওয়াইডি নিখোঁজের পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার, সাত মাসে এখনো নিখোঁজ ২ হাজারের বেশি

দক্ষিণ আফ্রিকায় ‘মাফিয়া রাষ্ট্রের’ ঝুঁকি, তবে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগও আছে

দক্ষিণ আফ্রিকার গণতন্ত্র, সমাজ ও অর্থনীতির জন্য সংঘবদ্ধ অপরাধ এখন সবচেয়ে বড় ও তাৎক্ষণিক হুমকিগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা নিজেই এমন মন্তব্য করেছেন। ব্যবসায়ী নেতারাও বলছেন, বিদ্যুৎ সংকটের চেয়েও সংঘবদ্ধ অপরাধ তাদের বেশি উদ্বিগ্ন করছে।

গত এক বছরে একটি সরকারি তদন্তে দেশটির অপরাধী চক্র, সরকারি কর্মকর্তা এবং পুলিশের জ্যেষ্ঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে গভীর যোগসাজশের চিত্র উঠে এসেছে। একটি হিসাব অনুযায়ী, মাফিয়াদের প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকির দিক থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বের সপ্তম সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। এর চেয়েও খারাপ অবস্থায় রয়েছে কঙ্গো, মিয়ানমার এবং লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশ।

দক্ষিণ আফ্রিকার সহিংস অপরাধের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। একই সঙ্গে মাদক, মানবপাচার এবং বিপন্ন বন্যপ্রাণী পাচারের আন্তর্জাতিক পথ হিসেবেও দেশটি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে সাম্প্রতিক কয়েকটি প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।

এর মধ্যে অন্যতম হলো বৈধ ব্যবসার আদলে গড়ে ওঠা অবৈধ অর্থনীতি। দক্ষিণ আফ্রিকায় বিক্রি হওয়া সিগারেটের বড় অংশই চোরাই। একইভাবে বিপুল পরিমাণ মদ ও জ্বালানিও অবৈধভাবে বাজারজাত হয়। অবৈধ খননও অর্থনীতিতে বড় ক্ষতি করছে। ২০২৪ সালে অবৈধ খননের কারণে দেশটির ঘোষিত মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রায় শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে বলে একটি হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো চাঁদাবাজি-নির্ভর অপরাধী চক্রের বিস্তার। এসব গোষ্ঠী নির্মাণকাজ বন্ধ না করার বিনিময়ে অর্থ দাবি করে। কোথাও বাসে আগুন দেওয়ার, কোথাও শিক্ষক হত্যার হুমকি দিয়েও অর্থ আদায় করা হচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ভেতরেই অপরাধী চক্রের অনুপ্রবেশ। পুলিশের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানেও তাদের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। ফলে অপরাধ শুধু রাস্তা বা ব্যবসায় সীমাবদ্ধ নেই; রাষ্ট্রের কিছু অংশকেও তা দুর্বল করে দিচ্ছে।

তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি হতাশাজনক নয়। দক্ষিণ আফ্রিকার রয়েছে স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, সক্রিয় নাগরিক সমাজ, শক্তিশালী সংবাদমাধ্যম এবং অপরাধের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ জনগণ। প্রেসিডেন্ট রামাফোসাও দুর্নীতি ও অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন। ফলে দেশটির সামনে এখনো মাফিয়া-নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া ঠেকানোর সুযোগ রয়েছে।

ওপরের সারির অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

অন্য দেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে শুধু নিচের সারির সদস্যদের গ্রেপ্তার করলেই যথেষ্ট হয় না। অপরাধী নেটওয়ার্কের শীর্ষ পর্যায়ে আঘাত করা জরুরি। এর অর্থ হলো দুর্নীতিগ্রস্ত প্রসিকিউটর ও পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়া এবং অপরাধী চক্রের মূল হোতাদের বিচারের আওতায় আনা।

দক্ষিণ আফ্রিকায় গত এক বছরে পুলিশমন্ত্রী, পুলিশের প্রধান ও উপপ্রধান এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনের দায়িত্বে থাকা দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ ইউনিটের প্রধানকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে এই শুদ্ধি অভিযান আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

যেসব কর্মকর্তা এখনো দায়িত্বে আছেন, তাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করতে বলা যেতে পারে। অপরাধী চক্রের সঙ্গে কোনো যোগসূত্র পাওয়া গেলে তাদের পদ ছাড়তে হবে। একই সঙ্গে যেসব শহর তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছ ও দক্ষ প্রশাসনের উদাহরণ তৈরি করেছে, যেমন কেপটাউন, তাদের আরও বেশি পুলিশি ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

অপরাধ দমনে অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতাও দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। মেক্সিকোর নুয়েভো লেওন রাজ্য মাদকচক্রের প্রভাবে দুর্বল হয়ে পড়া পুরোনো পুলিশ বাহিনীকে বাদ দিয়ে নতুন পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলেছিল। ব্রাজিলেও অবৈধ অর্থ পাচারের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা শিক্ষা নিতে পারে।

অর্থের পথ ধরে অপরাধী চক্রের কাছে পৌঁছানো

অপরাধী চক্রের বড় নেতাদের বিচারের আওতায় আনতে প্রসিকিউটরদের আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। অতীতের কিছু সাফল্য এ ক্ষেত্রে পথ দেখাতে পারে।

রামাফোসার সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকার একসময় দুর্বল হয়ে পড়া কর কর্তৃপক্ষ আবার কার্যকর হয়েছে। এর আগে ২০০০-এর দশকে ‘দ্য স্করপিয়নস’ নামে পরিচিত একটি বিশেষ অপরাধ দমন ইউনিট বড় অপরাধী চক্রের নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিল এবং একটি বিতর্কিত অস্ত্র চুক্তি নিয়ে তদন্তের মাধ্যমে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার দণ্ড নিশ্চিত করতে সহায়তা করেছিল।

অপরাধীদের অর্থের উৎস ও সম্পদের গতিপথ শনাক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ। এ কাজে বেসরকারি খাতের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।

দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য একটি স্বাধীন বিশেষ অপরাধ দমন সংস্থাও কার্যকর হতে পারে। তবে সেই সংস্থাকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। কারণ অতীতে স্করপিয়নস ইউনিট তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমা ও তার ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার পর সেটি বিলুপ্ত করা হয়েছিল।

গুয়াতেমালার অভিজ্ঞতাও সতর্কবার্তা দেয়। জাতিসংঘ-সমর্থিত দুর্নীতি ও সংঘবদ্ধ অপরাধ তদন্তকারী সংস্থা সিআইসিআইজি জনপ্রিয় হলেও শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট জিমি মোরালেসের সময়ে বন্ধ হয়ে যায়।

এ কারণে দক্ষিণ আফ্রিকায় নতুন কোনো অপরাধ দমন সংস্থা গঠন করা হলে সেটিকে সাংবিধানিক সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। এমনকি সংসদের বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছাড়া যাতে সংস্থাটি বিলুপ্ত করা না যায়, সেই ব্যবস্থাও রাখা যেতে পারে।

সবচেয়ে বড় বাধা রাজনীতির ভেতরেই

তবে দক্ষিণ আফ্রিকার অপরাধী চক্র দমনের সবচেয়ে বড় বাধা হয়তো অপরাধীরা নিজেরা নয়, বরং তাদের সঙ্গে যুক্ত রাজনীতিকরা।

অভিযোগ রয়েছে, কিছু রাজনীতিক অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগসাজশ করে তাদের অনুকূলে সরকারি চুক্তি পাইয়ে দেন, ঘুষ নেন এবং রাজনৈতিক বিরোধ মেটাতে অপরাধী চক্রের শক্তি ব্যবহার করেন।

এই পরিস্থিতিতে রামাফোসার জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ হতে পারে নিজের দল—ক্ষমতাসীন আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের (এএনসি)—ভেতরের প্রভাবশালী কিন্তু দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।

রামাফোসা অনেক সময় পরিস্থিতির চাপ না এলে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে চান না—এমন সমালোচনাও রয়েছে। তাই ব্যবসায়ী নেতাদের পাশাপাশি জোট সরকারের অন্যান্য দলের নেতাদেরও তার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে তিনি এএনসির ভেতরের অপরাধ-রাজনীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেন।

তা না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। একটি জরিপের হিসাবে, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষ এমন একজন শক্তিশালী নেতা চান, যিনি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে এবং অপরাধ কমাতে পারবেন।

এই হতাশা জনগণকে এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলের মতো নেতার দিকে আকৃষ্ট করতে পারে। বুকেলে গ্যাং দমনের নামে হাজার হাজার সন্দেহভাজনকে আটক করেছেন, যাদের অনেকের ক্ষেত্রে যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য সেই পথ বেছে নেওয়া প্রয়োজন নেই। বরং দেশটির প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে অপরাধ দমন হবে কঠোরভাবে, কিন্তু আইনের শাসনও অক্ষুণ্ন থাকবে।

মাফিয়াদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার সামনে তাই মূল প্রশ্ন শুধু কতজন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হবে তা নয়। আসল প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্রের ভেতরে অপরাধী নেটওয়ার্কের যে শিকড় গড়ে উঠেছে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে সেটি কতটা গভীরভাবে উপড়ে ফেলা সম্ভব হবে। দেশটির হাতে এখনো সেই লড়াই জয়ের প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক শক্তি রয়েছে। প্রয়োজন শুধু তা ব্যবহারের দৃঢ় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

বৃষ্টিতে ঢাকার বাতাসে স্বস্তি, নামল দূষণের মাত্রা

দক্ষিণ আফ্রিকায় ‘মাফিয়া রাষ্ট্রের’ ঝুঁকি, তবে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগও আছে

১১:০৯:০৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দক্ষিণ আফ্রিকার গণতন্ত্র, সমাজ ও অর্থনীতির জন্য সংঘবদ্ধ অপরাধ এখন সবচেয়ে বড় ও তাৎক্ষণিক হুমকিগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা নিজেই এমন মন্তব্য করেছেন। ব্যবসায়ী নেতারাও বলছেন, বিদ্যুৎ সংকটের চেয়েও সংঘবদ্ধ অপরাধ তাদের বেশি উদ্বিগ্ন করছে।

গত এক বছরে একটি সরকারি তদন্তে দেশটির অপরাধী চক্র, সরকারি কর্মকর্তা এবং পুলিশের জ্যেষ্ঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে গভীর যোগসাজশের চিত্র উঠে এসেছে। একটি হিসাব অনুযায়ী, মাফিয়াদের প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকির দিক থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বের সপ্তম সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। এর চেয়েও খারাপ অবস্থায় রয়েছে কঙ্গো, মিয়ানমার এবং লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশ।

দক্ষিণ আফ্রিকার সহিংস অপরাধের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। একই সঙ্গে মাদক, মানবপাচার এবং বিপন্ন বন্যপ্রাণী পাচারের আন্তর্জাতিক পথ হিসেবেও দেশটি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে সাম্প্রতিক কয়েকটি প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।

এর মধ্যে অন্যতম হলো বৈধ ব্যবসার আদলে গড়ে ওঠা অবৈধ অর্থনীতি। দক্ষিণ আফ্রিকায় বিক্রি হওয়া সিগারেটের বড় অংশই চোরাই। একইভাবে বিপুল পরিমাণ মদ ও জ্বালানিও অবৈধভাবে বাজারজাত হয়। অবৈধ খননও অর্থনীতিতে বড় ক্ষতি করছে। ২০২৪ সালে অবৈধ খননের কারণে দেশটির ঘোষিত মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রায় শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে বলে একটি হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো চাঁদাবাজি-নির্ভর অপরাধী চক্রের বিস্তার। এসব গোষ্ঠী নির্মাণকাজ বন্ধ না করার বিনিময়ে অর্থ দাবি করে। কোথাও বাসে আগুন দেওয়ার, কোথাও শিক্ষক হত্যার হুমকি দিয়েও অর্থ আদায় করা হচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ভেতরেই অপরাধী চক্রের অনুপ্রবেশ। পুলিশের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানেও তাদের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। ফলে অপরাধ শুধু রাস্তা বা ব্যবসায় সীমাবদ্ধ নেই; রাষ্ট্রের কিছু অংশকেও তা দুর্বল করে দিচ্ছে।

তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি হতাশাজনক নয়। দক্ষিণ আফ্রিকার রয়েছে স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, সক্রিয় নাগরিক সমাজ, শক্তিশালী সংবাদমাধ্যম এবং অপরাধের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ জনগণ। প্রেসিডেন্ট রামাফোসাও দুর্নীতি ও অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন। ফলে দেশটির সামনে এখনো মাফিয়া-নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া ঠেকানোর সুযোগ রয়েছে।

ওপরের সারির অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

অন্য দেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে শুধু নিচের সারির সদস্যদের গ্রেপ্তার করলেই যথেষ্ট হয় না। অপরাধী নেটওয়ার্কের শীর্ষ পর্যায়ে আঘাত করা জরুরি। এর অর্থ হলো দুর্নীতিগ্রস্ত প্রসিকিউটর ও পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়া এবং অপরাধী চক্রের মূল হোতাদের বিচারের আওতায় আনা।

দক্ষিণ আফ্রিকায় গত এক বছরে পুলিশমন্ত্রী, পুলিশের প্রধান ও উপপ্রধান এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনের দায়িত্বে থাকা দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ ইউনিটের প্রধানকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে এই শুদ্ধি অভিযান আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

যেসব কর্মকর্তা এখনো দায়িত্বে আছেন, তাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করতে বলা যেতে পারে। অপরাধী চক্রের সঙ্গে কোনো যোগসূত্র পাওয়া গেলে তাদের পদ ছাড়তে হবে। একই সঙ্গে যেসব শহর তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছ ও দক্ষ প্রশাসনের উদাহরণ তৈরি করেছে, যেমন কেপটাউন, তাদের আরও বেশি পুলিশি ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

অপরাধ দমনে অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতাও দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। মেক্সিকোর নুয়েভো লেওন রাজ্য মাদকচক্রের প্রভাবে দুর্বল হয়ে পড়া পুরোনো পুলিশ বাহিনীকে বাদ দিয়ে নতুন পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলেছিল। ব্রাজিলেও অবৈধ অর্থ পাচারের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা শিক্ষা নিতে পারে।

অর্থের পথ ধরে অপরাধী চক্রের কাছে পৌঁছানো

অপরাধী চক্রের বড় নেতাদের বিচারের আওতায় আনতে প্রসিকিউটরদের আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। অতীতের কিছু সাফল্য এ ক্ষেত্রে পথ দেখাতে পারে।

রামাফোসার সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকার একসময় দুর্বল হয়ে পড়া কর কর্তৃপক্ষ আবার কার্যকর হয়েছে। এর আগে ২০০০-এর দশকে ‘দ্য স্করপিয়নস’ নামে পরিচিত একটি বিশেষ অপরাধ দমন ইউনিট বড় অপরাধী চক্রের নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিল এবং একটি বিতর্কিত অস্ত্র চুক্তি নিয়ে তদন্তের মাধ্যমে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার দণ্ড নিশ্চিত করতে সহায়তা করেছিল।

অপরাধীদের অর্থের উৎস ও সম্পদের গতিপথ শনাক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ। এ কাজে বেসরকারি খাতের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।

দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য একটি স্বাধীন বিশেষ অপরাধ দমন সংস্থাও কার্যকর হতে পারে। তবে সেই সংস্থাকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। কারণ অতীতে স্করপিয়নস ইউনিট তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমা ও তার ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার পর সেটি বিলুপ্ত করা হয়েছিল।

গুয়াতেমালার অভিজ্ঞতাও সতর্কবার্তা দেয়। জাতিসংঘ-সমর্থিত দুর্নীতি ও সংঘবদ্ধ অপরাধ তদন্তকারী সংস্থা সিআইসিআইজি জনপ্রিয় হলেও শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট জিমি মোরালেসের সময়ে বন্ধ হয়ে যায়।

এ কারণে দক্ষিণ আফ্রিকায় নতুন কোনো অপরাধ দমন সংস্থা গঠন করা হলে সেটিকে সাংবিধানিক সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। এমনকি সংসদের বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছাড়া যাতে সংস্থাটি বিলুপ্ত করা না যায়, সেই ব্যবস্থাও রাখা যেতে পারে।

সবচেয়ে বড় বাধা রাজনীতির ভেতরেই

তবে দক্ষিণ আফ্রিকার অপরাধী চক্র দমনের সবচেয়ে বড় বাধা হয়তো অপরাধীরা নিজেরা নয়, বরং তাদের সঙ্গে যুক্ত রাজনীতিকরা।

অভিযোগ রয়েছে, কিছু রাজনীতিক অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগসাজশ করে তাদের অনুকূলে সরকারি চুক্তি পাইয়ে দেন, ঘুষ নেন এবং রাজনৈতিক বিরোধ মেটাতে অপরাধী চক্রের শক্তি ব্যবহার করেন।

এই পরিস্থিতিতে রামাফোসার জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ হতে পারে নিজের দল—ক্ষমতাসীন আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের (এএনসি)—ভেতরের প্রভাবশালী কিন্তু দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।

রামাফোসা অনেক সময় পরিস্থিতির চাপ না এলে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে চান না—এমন সমালোচনাও রয়েছে। তাই ব্যবসায়ী নেতাদের পাশাপাশি জোট সরকারের অন্যান্য দলের নেতাদেরও তার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে তিনি এএনসির ভেতরের অপরাধ-রাজনীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেন।

তা না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। একটি জরিপের হিসাবে, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষ এমন একজন শক্তিশালী নেতা চান, যিনি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে এবং অপরাধ কমাতে পারবেন।

এই হতাশা জনগণকে এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলের মতো নেতার দিকে আকৃষ্ট করতে পারে। বুকেলে গ্যাং দমনের নামে হাজার হাজার সন্দেহভাজনকে আটক করেছেন, যাদের অনেকের ক্ষেত্রে যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য সেই পথ বেছে নেওয়া প্রয়োজন নেই। বরং দেশটির প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে অপরাধ দমন হবে কঠোরভাবে, কিন্তু আইনের শাসনও অক্ষুণ্ন থাকবে।

মাফিয়াদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার সামনে তাই মূল প্রশ্ন শুধু কতজন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হবে তা নয়। আসল প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্রের ভেতরে অপরাধী নেটওয়ার্কের যে শিকড় গড়ে উঠেছে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে সেটি কতটা গভীরভাবে উপড়ে ফেলা সম্ভব হবে। দেশটির হাতে এখনো সেই লড়াই জয়ের প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক শক্তি রয়েছে। প্রয়োজন শুধু তা ব্যবহারের দৃঢ় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।