১২:৫৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
টানা বৃষ্টিতে ঢাকার সড়কে জলাবদ্ধতা, চরম দুর্ভোগে অফিসগামী ও শিক্ষার্থীরা বৃষ্টিতে ঢাকার বাতাসে স্বস্তি, নামল দূষণের মাত্রা দুবাইয়ের নতুন জলশহরে বদলে যাচ্ছে বিলাসী জীবনের ধারণা, ৩ বেডরুমের অ্যাপার্টমেন্টে তারই ইঙ্গিত জাঞ্জিবারে দ্বিতীয় ‘রাশিদ ভিলেজ’ প্রকল্প চালুর নির্দেশ শেখ হামদানের মস্কো অঞ্চলে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় নিহত ২, রুশ রাজধানীর তেল শোধনাগারেও আঘাত ভারত-আমিরাত সম্পর্ক আরও জোরদারে মোদি-শেখ মোহামেদের আলোচনা দুবাইয়ের ফ্যাশনে নতুন মোড়, শোর চেয়ে এখন বড় হচ্ছে ব্যবসা ম্যাকলমোর বিতর্কে অবস্থান বদল, কনসার্টে ক্ষমা চাইলেন এড শিরান দুবাই মলে হঠাৎ হাজির শেখ মোহাম্মদ, অবাক দর্শনার্থীরা সংযুক্ত আরব আমিরাতে হাইব্রিড-ইলেকট্রিক গাড়ির চাহিদা বাড়ছে, এগিয়ে টয়োটা-টেসলা-বিওয়াইডি

চীনে তরুণদের কর্মসংস্থান সংকট আরও গভীর, বদলে যাচ্ছে কাজ ও জীবনের ধারণা

চীনে তরুণদের বেকারত্ব এখন আর শুধু সাময়িক অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি ধীরে ধীরে সমাজের কাঠামো, তরুণদের ভবিষ্যৎ ভাবনা এবং কাজ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকেও বদলে দিচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রেকর্ডসংখ্যক তরুণ স্নাতক হয়ে বের হলেও তাদের জন্য উপযুক্ত চাকরির সুযোগ একই হারে বাড়ছে না। ফলে দেশটির তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ কঠিন ও অনিশ্চিত শ্রমবাজারের মুখোমুখি হচ্ছে।

এর সাম্প্রতিক উদাহরণ হয়ে উঠেছে পূর্ব চীনের গাড়ির যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান শিংইউ অটোমোটিভ লাইটিংয়ের ঘটনা। প্রতিষ্ঠানটি গ্রীষ্মে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কর্মী নিয়োগ করেছে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে চাকরিতে যোগ দেওয়া প্রায় ১৪০ জন নতুন স্নাতককে কঠিন অবস্থার মধ্যে ফেলে। তাদের বলা হয়, চাইলে অর্ধমাসের বেতন নিয়ে চাকরি ছেড়ে দিতে হবে, অথবা তুলনামূলক কম বেতনের কারখানার কাজে যেতে হবে। শেষ পর্যন্ত শতাধিক তরুণ চাকরি ছেড়ে দেন।

চীনে শ্রমিক সুরক্ষা তুলনামূলক দুর্বল হওয়ায় আকস্মিক ছাঁটাই নতুন কিছু নয়। কিন্তু শিংইউর ঘটনা এবার অস্বাভাবিক জনরোষ তৈরি করে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র পিপলস ডেইলি প্রতিষ্ঠানটির সমালোচনা করে বলে, এমন আচরণ সমাজের আস্থাকে পদদলিত করে। শিংইউর সরবরাহকারী জার্মান গাড়ি নির্মাতা ভক্সওয়াগনও বিষয়টি তদন্তের কথা জানায়।

চাপ বাড়তে থাকলে প্রতিষ্ঠানটি ক্ষমা চায়। মানবসম্পদ বিভাগের প্রধানকে বরখাস্ত করা হয় এবং কয়েকজন নির্বাহীর বেতন কমানো হয়। ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, চীনের তরুণদের চাকরির সংকট এখন এমন এক সামাজিক স্পর্শকাতর বিষয়ে পরিণত হয়েছে, যা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তের বাইরেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি আর আগের মতো নিরাপদ পথ নয়

কয়েক বছর আগেও চীনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি ছিল তুলনামূলক ভালো চাকরি ও স্থিতিশীল ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ সিঁড়ি। কিন্তু এখন সেই ধারণা দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

In Focus | How one company's choice – resignation or the factory – left China's  young workers floored | South China Morning Post

এ বছর চীনে প্রায় ১ কোটি ২৭ লাখ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হয়েছেন। গত বছরের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ বেশি এবং এক দশক আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। একই সময়ে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি খাত দুর্বল হয়ে পড়ায় নতুন স্নাতকদের জন্য চাকরির চাহিদা কমেছে।

বিশেষ করে আবাসন খাতের দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা, ভোক্তা ব্যয় কমে যাওয়া এবং বেসরকারি খাতে নিয়োগের গতি কমে যাওয়ায় তরুণদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়েছে। ফলে উচ্চশিক্ষা শেষ করেও অনেক তরুণ কাঙ্ক্ষিত পেশায় ঢোকার সুযোগ পাচ্ছেন না।

বেকারত্বের হিসাব নিয়েও বিতর্ক

তরুণদের কর্মসংস্থানের সংকট কতটা গভীর, তা নিয়ে সরকারি পরিসংখ্যান নিয়েও আলোচনা রয়েছে। ২০২৩ সালে চীনের সরকারি হিসাবে তরুণদের বেকারত্বের হার ২০ শতাংশে পৌঁছেছিল। পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার পর ওই সময় বেকারত্বের হিসাব প্রকাশ সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়। পরে ভিন্ন পদ্ধতিতে, তথাকথিত ‘উন্নত’ বা ‘পরিমার্জিত’ পদ্ধতি ব্যবহার করে নতুন হিসাব প্রকাশ শুরু হয়।

তবে নতুন পদ্ধতিতে প্রকাশিত হারও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আবার ২০ শতাংশের কাছাকাছি উঠছে। অর্থাৎ পরিসংখ্যান গণনার পদ্ধতি পরিবর্তন হলেও তরুণদের চাকরির সংকট পুরোপুরি কাটেনি।

চীনা সরকার ইতোমধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বেশি নতুন স্নাতক নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও যেন কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিবর্তে তরুণদের ধরে রাখে, সে বিষয়ে চাপ বাড়ছে। হংকং পলিটেকনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী জেনি চ্যানের মতে, সরকার চাইছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও তরুণদের কর্মসংস্থানকে জাতীয় দায়িত্বের অংশ হিসেবে বিবেচনা করুক।

যে খাতগুলোতে তরুণদের কাজ কমছে

চীনের তরুণদের কর্মসংস্থানে বড় পরিবর্তন এসেছে এমন কয়েকটি খাতে, যেগুলো একসময় বিপুলসংখ্যক তরুণকে কাজের সুযোগ দিত।

শিক্ষা খাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর পদক্ষেপের ফলে বেসরকারি কোচিং ও টিউশন ব্যবসায় বিপুলসংখ্যক চাকরি কমেছে। বিনোদন খাতেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ফলে টেলিভিশন ও অনলাইন অনুষ্ঠান তৈরিতে আগের তুলনায় কম অভিনয়শিল্পী ও প্রযোজকের প্রয়োজন হচ্ছে।

Reluctant entrepreneurs: Evidence from China's state-controlled enterprise  reform | CEPR

প্রযুক্তি খাতেও ছাঁটাই চলছে। একই সঙ্গে চীনের বিশাল অনলাইনভিত্তিক খণ্ডকালীন বা গিগ অর্থনীতি, যা একসময় চাকরিপ্রার্থীদের জন্য শেষ ভরসা হিসেবে কাজ করত, এখন অতিরিক্ত কর্মীতে ভরে গেছে। চালকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় অনেকের আয়ও কমে গেছে।

কাজের প্রতিযোগিতা থেকে ‘শুয়ে থাকা’

দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ বেকারত্ব চীনের তরুণ সমাজের চিন্তাভাবনাতেও পরিবর্তন আনছে। চীনা সমাজে কঠোর পরিশ্রম ও প্রতিযোগিতাকে ঐতিহ্যগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু যখন একজন তরুণ দেখতে পাচ্ছেন যে তার শ্রমের জন্যই বাজারে পর্যাপ্ত চাহিদা নেই, তখন কাজ ও সাফল্য সম্পর্কে তার ধারণাও বদলে যেতে পারে।

এরই একটি প্রকাশ ‘লিয়িং ফ্ল্যাট’ বা ‘শুয়ে থাকা’ ধারণায়। এর মাধ্যমে কিছু তরুণ প্রচলিত প্রতিযোগিতামূলক জীবনযাত্রা থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা বলছেন। তারা চাকরি পাওয়ার দৌড় থেকে সাময়িকভাবে বেরিয়ে গিয়ে অর্থনীতি ভালো হওয়ার অপেক্ষা করছেন।

অন্যদিকে কেউ কেউ নিজেদের ‘ফুল-টাইম সন্তান’ হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। তারা বাবা-মায়ের সঙ্গে বাড়িতে থাকছেন, ঘরের রান্না ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করছেন এবং এর বিনিময়ে পরিবারের কাছ থেকে সামান্য খরচের টাকা নিচ্ছেন।

চাকরি নেই, তবু অফিসে যাওয়ার অভিনয়

তরুণদের এই নতুন বাস্তবতার সবচেয়ে অদ্ভুত প্রকাশগুলোর একটি হলো ‘ভান করে কাজ করার’ অফিস।

গত বছর থেকে চীনের কয়েকটি শহরে এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যেগুলো তরুণদের প্রকৃত চাকরি না থাকলেও অফিসে যাওয়ার মতো পরিবেশ দেয়। ‘দ্য প্রিটেন্ড টু ওয়ার্ক কোম্পানি’-এর মতো প্রতিষ্ঠানে দৈনিক প্রায় ৩০ ইউয়ান বা ৪ ডলারের কিছু বেশি অর্থের বিনিময়ে একটি ডেস্কে বসা, অফিসের পানির কলের পাশে সহকর্মীদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং অফিসে কাজ করার মতো দৈনন্দিন পরিবেশ উপভোগ করা যায়।

China – the world's new automotive superpower | The Car Expert

অনেকে সেখানে চাকরির আবেদন করেন, আবার কেউ ফোনে সময় কাটান। উদ্দেশ্য হলো—চাকরি না থাকলেও দিনের একটি নির্দিষ্ট রুটিন ধরে রাখা এবং নিজেকে কর্মজীবনের সঙ্গে যুক্ত মনে করা।

চীনের বিভিন্ন শহরের গণগ্রন্থাগারও এখন এমন তরুণদের মিলনস্থলে পরিণত হয়েছে। বেইজিংয়ের ক্যাপিটাল লাইব্রেরিতে সাম্প্রতিক এক বৃহস্পতিবার বিকেলে অনেক তরুণকে দেখা যায়। কেউ জীবনবৃত্তান্ত ঠিক করছেন, কেউ আবার কম্পিউটার গেম খেলছেন।

সেখানে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের চাকরি থেকে ছয় মাস আগে বাদ পড়া এক তরুণ জানান, তিনি আপাতত পূর্ণকালীন চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় বিরতি নিয়েছেন। নিজের কিছু সফটওয়্যার প্রকল্প নিয়ে কাজ করছেন এবং আগের চেয়ে বেশি বই পড়ছেন।

চীনের তরুণদের এই অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, দীর্ঘস্থায়ী কর্মসংস্থান সংকট শুধু বেকারত্বের পরিসংখ্যান বাড়ায় না। এটি মানুষের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক, সামাজিক মর্যাদা এবং সাফল্যের সংজ্ঞাকেও বদলে দিতে পারে। তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত ও স্থিতিশীল কাজ তৈরি করা তাই এখন চীনের অর্থনীতির পাশাপাশি সমাজের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

টানা বৃষ্টিতে ঢাকার সড়কে জলাবদ্ধতা, চরম দুর্ভোগে অফিসগামী ও শিক্ষার্থীরা

চীনে তরুণদের কর্মসংস্থান সংকট আরও গভীর, বদলে যাচ্ছে কাজ ও জীবনের ধারণা

১১:১৮:২৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চীনে তরুণদের বেকারত্ব এখন আর শুধু সাময়িক অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি ধীরে ধীরে সমাজের কাঠামো, তরুণদের ভবিষ্যৎ ভাবনা এবং কাজ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকেও বদলে দিচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রেকর্ডসংখ্যক তরুণ স্নাতক হয়ে বের হলেও তাদের জন্য উপযুক্ত চাকরির সুযোগ একই হারে বাড়ছে না। ফলে দেশটির তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ কঠিন ও অনিশ্চিত শ্রমবাজারের মুখোমুখি হচ্ছে।

এর সাম্প্রতিক উদাহরণ হয়ে উঠেছে পূর্ব চীনের গাড়ির যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান শিংইউ অটোমোটিভ লাইটিংয়ের ঘটনা। প্রতিষ্ঠানটি গ্রীষ্মে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কর্মী নিয়োগ করেছে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে চাকরিতে যোগ দেওয়া প্রায় ১৪০ জন নতুন স্নাতককে কঠিন অবস্থার মধ্যে ফেলে। তাদের বলা হয়, চাইলে অর্ধমাসের বেতন নিয়ে চাকরি ছেড়ে দিতে হবে, অথবা তুলনামূলক কম বেতনের কারখানার কাজে যেতে হবে। শেষ পর্যন্ত শতাধিক তরুণ চাকরি ছেড়ে দেন।

চীনে শ্রমিক সুরক্ষা তুলনামূলক দুর্বল হওয়ায় আকস্মিক ছাঁটাই নতুন কিছু নয়। কিন্তু শিংইউর ঘটনা এবার অস্বাভাবিক জনরোষ তৈরি করে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র পিপলস ডেইলি প্রতিষ্ঠানটির সমালোচনা করে বলে, এমন আচরণ সমাজের আস্থাকে পদদলিত করে। শিংইউর সরবরাহকারী জার্মান গাড়ি নির্মাতা ভক্সওয়াগনও বিষয়টি তদন্তের কথা জানায়।

চাপ বাড়তে থাকলে প্রতিষ্ঠানটি ক্ষমা চায়। মানবসম্পদ বিভাগের প্রধানকে বরখাস্ত করা হয় এবং কয়েকজন নির্বাহীর বেতন কমানো হয়। ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, চীনের তরুণদের চাকরির সংকট এখন এমন এক সামাজিক স্পর্শকাতর বিষয়ে পরিণত হয়েছে, যা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তের বাইরেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি আর আগের মতো নিরাপদ পথ নয়

কয়েক বছর আগেও চীনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি ছিল তুলনামূলক ভালো চাকরি ও স্থিতিশীল ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ সিঁড়ি। কিন্তু এখন সেই ধারণা দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

In Focus | How one company's choice – resignation or the factory – left China's  young workers floored | South China Morning Post

এ বছর চীনে প্রায় ১ কোটি ২৭ লাখ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হয়েছেন। গত বছরের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ বেশি এবং এক দশক আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। একই সময়ে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি খাত দুর্বল হয়ে পড়ায় নতুন স্নাতকদের জন্য চাকরির চাহিদা কমেছে।

বিশেষ করে আবাসন খাতের দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা, ভোক্তা ব্যয় কমে যাওয়া এবং বেসরকারি খাতে নিয়োগের গতি কমে যাওয়ায় তরুণদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়েছে। ফলে উচ্চশিক্ষা শেষ করেও অনেক তরুণ কাঙ্ক্ষিত পেশায় ঢোকার সুযোগ পাচ্ছেন না।

বেকারত্বের হিসাব নিয়েও বিতর্ক

তরুণদের কর্মসংস্থানের সংকট কতটা গভীর, তা নিয়ে সরকারি পরিসংখ্যান নিয়েও আলোচনা রয়েছে। ২০২৩ সালে চীনের সরকারি হিসাবে তরুণদের বেকারত্বের হার ২০ শতাংশে পৌঁছেছিল। পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার পর ওই সময় বেকারত্বের হিসাব প্রকাশ সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়। পরে ভিন্ন পদ্ধতিতে, তথাকথিত ‘উন্নত’ বা ‘পরিমার্জিত’ পদ্ধতি ব্যবহার করে নতুন হিসাব প্রকাশ শুরু হয়।

তবে নতুন পদ্ধতিতে প্রকাশিত হারও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আবার ২০ শতাংশের কাছাকাছি উঠছে। অর্থাৎ পরিসংখ্যান গণনার পদ্ধতি পরিবর্তন হলেও তরুণদের চাকরির সংকট পুরোপুরি কাটেনি।

চীনা সরকার ইতোমধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বেশি নতুন স্নাতক নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও যেন কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিবর্তে তরুণদের ধরে রাখে, সে বিষয়ে চাপ বাড়ছে। হংকং পলিটেকনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী জেনি চ্যানের মতে, সরকার চাইছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও তরুণদের কর্মসংস্থানকে জাতীয় দায়িত্বের অংশ হিসেবে বিবেচনা করুক।

যে খাতগুলোতে তরুণদের কাজ কমছে

চীনের তরুণদের কর্মসংস্থানে বড় পরিবর্তন এসেছে এমন কয়েকটি খাতে, যেগুলো একসময় বিপুলসংখ্যক তরুণকে কাজের সুযোগ দিত।

শিক্ষা খাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর পদক্ষেপের ফলে বেসরকারি কোচিং ও টিউশন ব্যবসায় বিপুলসংখ্যক চাকরি কমেছে। বিনোদন খাতেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ফলে টেলিভিশন ও অনলাইন অনুষ্ঠান তৈরিতে আগের তুলনায় কম অভিনয়শিল্পী ও প্রযোজকের প্রয়োজন হচ্ছে।

Reluctant entrepreneurs: Evidence from China's state-controlled enterprise  reform | CEPR

প্রযুক্তি খাতেও ছাঁটাই চলছে। একই সঙ্গে চীনের বিশাল অনলাইনভিত্তিক খণ্ডকালীন বা গিগ অর্থনীতি, যা একসময় চাকরিপ্রার্থীদের জন্য শেষ ভরসা হিসেবে কাজ করত, এখন অতিরিক্ত কর্মীতে ভরে গেছে। চালকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় অনেকের আয়ও কমে গেছে।

কাজের প্রতিযোগিতা থেকে ‘শুয়ে থাকা’

দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ বেকারত্ব চীনের তরুণ সমাজের চিন্তাভাবনাতেও পরিবর্তন আনছে। চীনা সমাজে কঠোর পরিশ্রম ও প্রতিযোগিতাকে ঐতিহ্যগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু যখন একজন তরুণ দেখতে পাচ্ছেন যে তার শ্রমের জন্যই বাজারে পর্যাপ্ত চাহিদা নেই, তখন কাজ ও সাফল্য সম্পর্কে তার ধারণাও বদলে যেতে পারে।

এরই একটি প্রকাশ ‘লিয়িং ফ্ল্যাট’ বা ‘শুয়ে থাকা’ ধারণায়। এর মাধ্যমে কিছু তরুণ প্রচলিত প্রতিযোগিতামূলক জীবনযাত্রা থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা বলছেন। তারা চাকরি পাওয়ার দৌড় থেকে সাময়িকভাবে বেরিয়ে গিয়ে অর্থনীতি ভালো হওয়ার অপেক্ষা করছেন।

অন্যদিকে কেউ কেউ নিজেদের ‘ফুল-টাইম সন্তান’ হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। তারা বাবা-মায়ের সঙ্গে বাড়িতে থাকছেন, ঘরের রান্না ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করছেন এবং এর বিনিময়ে পরিবারের কাছ থেকে সামান্য খরচের টাকা নিচ্ছেন।

চাকরি নেই, তবু অফিসে যাওয়ার অভিনয়

তরুণদের এই নতুন বাস্তবতার সবচেয়ে অদ্ভুত প্রকাশগুলোর একটি হলো ‘ভান করে কাজ করার’ অফিস।

গত বছর থেকে চীনের কয়েকটি শহরে এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যেগুলো তরুণদের প্রকৃত চাকরি না থাকলেও অফিসে যাওয়ার মতো পরিবেশ দেয়। ‘দ্য প্রিটেন্ড টু ওয়ার্ক কোম্পানি’-এর মতো প্রতিষ্ঠানে দৈনিক প্রায় ৩০ ইউয়ান বা ৪ ডলারের কিছু বেশি অর্থের বিনিময়ে একটি ডেস্কে বসা, অফিসের পানির কলের পাশে সহকর্মীদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং অফিসে কাজ করার মতো দৈনন্দিন পরিবেশ উপভোগ করা যায়।

China – the world's new automotive superpower | The Car Expert

অনেকে সেখানে চাকরির আবেদন করেন, আবার কেউ ফোনে সময় কাটান। উদ্দেশ্য হলো—চাকরি না থাকলেও দিনের একটি নির্দিষ্ট রুটিন ধরে রাখা এবং নিজেকে কর্মজীবনের সঙ্গে যুক্ত মনে করা।

চীনের বিভিন্ন শহরের গণগ্রন্থাগারও এখন এমন তরুণদের মিলনস্থলে পরিণত হয়েছে। বেইজিংয়ের ক্যাপিটাল লাইব্রেরিতে সাম্প্রতিক এক বৃহস্পতিবার বিকেলে অনেক তরুণকে দেখা যায়। কেউ জীবনবৃত্তান্ত ঠিক করছেন, কেউ আবার কম্পিউটার গেম খেলছেন।

সেখানে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের চাকরি থেকে ছয় মাস আগে বাদ পড়া এক তরুণ জানান, তিনি আপাতত পূর্ণকালীন চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় বিরতি নিয়েছেন। নিজের কিছু সফটওয়্যার প্রকল্প নিয়ে কাজ করছেন এবং আগের চেয়ে বেশি বই পড়ছেন।

চীনের তরুণদের এই অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, দীর্ঘস্থায়ী কর্মসংস্থান সংকট শুধু বেকারত্বের পরিসংখ্যান বাড়ায় না। এটি মানুষের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক, সামাজিক মর্যাদা এবং সাফল্যের সংজ্ঞাকেও বদলে দিতে পারে। তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত ও স্থিতিশীল কাজ তৈরি করা তাই এখন চীনের অর্থনীতির পাশাপাশি সমাজের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।