যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল রাজনীতিতে পরিবারকেন্দ্রিক নীতিকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হচ্ছে। সন্তান নেওয়া ও পরিবার গঠনে উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি সন্তান লালন-পালনের খরচ কমানো, পরিবারকে কর সুবিধা দেওয়া এবং সন্তান থাকা পরিবারকে রাষ্ট্রীয় সহায়তা বাড়ানোর মতো প্রস্তাব এখন রিপাবলিকান রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হয়ে উঠছে। এই প্রবণতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের পরিবারবিষয়ক অবস্থানের কারণে।
ভ্যান্স দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের পরিবারনীতি নিয়ে রক্ষণশীল মত প্রকাশ করে আসছেন। তিনি ‘নো-ফল্ট ডিভোর্স’ বা দোষ নির্ধারণ ছাড়াই বিবাহবিচ্ছেদের ব্যবস্থার সমালোচনা করেছেন। এমনকি সন্তান থাকা বাবা-মায়েদের নির্বাচনে তুলনামূলকভাবে বেশি রাজনৈতিক প্রভাব থাকা উচিত বলেও তিনি মত দিয়েছেন। তার বক্তব্যে এমন একটি পরিবারনীতির ধারণা উঠে এসেছে, যেখানে সন্তানদের যত্ন নেওয়া এবং পরিবারকে রাষ্ট্রীয় নীতির কেন্দ্রে রাখাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
চলতি মাসে এই বিতর্ক আরও জোরালো হয় নিউইয়র্ক টাইমসের একটি প্রতিবেদনের পর। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, শিশুদের দিবাযত্ন বা ডে-কেয়ারে ব্যবহৃত ফেডারেল অর্থের সুবিধা বাড়িয়ে এমন বাবা-মায়েদেরও অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যারা সন্তানদের দেখাশোনার জন্য ঘরে থাকেন। তবে হোয়াইট হাউস এই খবরকে ভিত্তিহীন অনুমান বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য রোসা ডিলরোসহ অনেকে এর সমালোচনা করেন। তাদের আশঙ্কা, নতুন কোনো অর্থ বরাদ্দ না করে সুবিধাভোগীর সংখ্যা বাড়ানো হলে সীমিত অর্থের জন্য আরও বেশি পরিবারকে প্রতিযোগিতা করতে হবে। এতে বিশেষ করে একক কর্মজীবী বাবা-মায়েরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। বিপরীতে ফক্স নিউজের উপস্থাপক র্যাচেল ক্যাম্পোস-ডাফি এমন ধারণাকে পরিবারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার উদ্যোগ হিসেবে প্রশংসা করেন।
এই ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে সামনে আসতে থাকা একটি বড় নীতিগত লড়াইয়ের আভাস দিয়েছে। রক্ষণশীল রাজনীতিক, নীতিনির্ধারক ও গবেষকদের একটি অংশ এখন শুধু জন্মহার বাড়ানোর ‘প্রোনাটালিস্ট’ নীতির কথা বলছেন না; তারা এমন একটি ‘প্রো-ফ্যামিলি’ নীতি চান, যার লক্ষ্য হবে সন্তান থাকা পরিবারগুলোর জীবনকে তুলনামূলকভাবে সহজ করা।
এই ধারণার মধ্যে বেশ কিছু প্রস্তাব রয়েছে, যেগুলোর কিছু ডেমোক্র্যাটদের দীর্ঘদিনের দাবির সঙ্গে মিলে যায়। যেমন—সন্তান থাকা পরিবারকে বেশি কর সুবিধা দেওয়া, শিশু পরিচর্যায় সহায়তা বাড়ানো এবং নবজাতকের জন্মের পর পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া। আবার কিছু প্রস্তাব স্পষ্টতই রক্ষণশীল, যেমন বিবাহিত দম্পতিকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া কিংবা ঘরে থেকে সন্তান লালন-পালন করা বাবা বা মাকে রাষ্ট্রীয় সহায়তার আওতায় আনা।
তবে এই পরিবর্তন রিপাবলিকান দলের পুরোনো অবস্থান থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সরে আসার ইঙ্গিতও দিচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে রিপাবলিকানদের একটি বড় অংশ রাষ্ট্রীয় সহায়তার ওপর নির্ভরশীল পরিবার, বিশেষ করে কর্মহীন মায়েদের বিষয়ে সন্দিহান ছিল। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রে এখনো ফেডারেল পর্যায়ে বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যাপক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
ট্রাম্প প্রশাসনের পরিবারসংক্রান্ত সরাসরি নীতিগত পরিবর্তনের মধ্যে বরং স্বাস্থ্যবিমা ও খাদ্য সহায়তা পাওয়ার যোগ্যতা সীমিত করার উদ্যোগও রয়েছে। গত বছর পাস হওয়া ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট’-এর বিভিন্ন বিধানের ফলে অন্তত ১২ লাখ শিশু এখন পর্যন্ত এসব সুবিধার আওতার বাইরে চলে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তারপরও রিপাবলিকান দলের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে পরিবারকেন্দ্রিক সামাজিক নীতির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। ইনস্টিটিউট ফর ফ্যামিলি স্টাডিজের গবেষক ব্র্যাড উইলকক্সের মতে, এটি একটি প্রজন্মগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত। বয়স্ক রিপাবলিকানদের অনেকে পরিবারকে সরাসরি সহায়তা দেওয়ার নীতিতে এখনো সন্দিহান হলেও তরুণ রক্ষণশীলদের মধ্যে এ বিষয়ে আগ্রহ বেশি।
এর একটি কারণ যুক্তরাষ্ট্রের জন্মহার কমে যাওয়া। অন্যদিকে রিপাবলিকান দলের নতুন রাজনৈতিক ভিত্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সন্তান থাকা শ্রমজীবী পরিবার। ফলে পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি এখন শুধু সামাজিক নীতি নয়, রাজনৈতিক কৌশলেরও অংশ হয়ে উঠছে।
মিসৌরির রিপাবলিকান সিনেটর জশ হাওলি ২০২৪ সালে সন্তান থাকা পরিবারগুলোর জন্য শিশু কর-সুবিধা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং জে ডি ভ্যান্সও শিশুদের জন্য কর সুবিধা বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ভ্যান্স বিশেষভাবে রক্ষণশীল ও গর্ভপাতবিরোধী আন্দোলনকে শুধু ‘প্রো-লাইফ’ নয়, একই সঙ্গে ‘প্রো-ফ্যামিলি’ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
সন্তান থাকা পরিবারকে কর সুবিধা দেওয়া অবশ্য ডেমোক্র্যাটদেরও দীর্ঘদিনের দাবি। ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট’-এও শিশুদের জন্য কর সুবিধা কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। মে মাসে দ্বিদলীয় একটি বিলও উত্থাপিত হয়, যাতে নবজাতকের জন্মের পর পরিবারকে প্রাথমিক খরচ সামলাতে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
তবে রক্ষণশীল শিবিরের সব প্রস্তাব ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে মেলে না। যেমন, বিবাহের পর পরিবারের মোট আয় একত্রে হিসাব করার কারণে কোনো কোনো দম্পতি ফেডারেল সুবিধা পাওয়ার যোগ্যতা হারাতে পারেন। এই ধরনের তথাকথিত ‘ম্যারেজ পেনাল্টি’ দূর করার দাবিও রক্ষণশীলদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হয়ে উঠছে।
বামপন্থী ও ডেমোক্র্যাট সমালোচকদের আপত্তি এখানেই। তাদের মতে, সহায়তার আওতা বাড়ানো মানেই বাস্তবে পরিবারগুলোর হাতে বেশি অর্থ পৌঁছানো নয়। নতুন অর্থ না বাড়িয়ে শুধু সুবিধা পাওয়ার যোগ্য মানুষের সংখ্যা বাড়ালে বিদ্যমান অর্থ আরও বেশি মানুষের মধ্যে ভাগ হয়ে যাবে। ডেমোক্র্যাটরা বরং সবার জন্য শিশু পরিচর্যা ব্যবস্থায় আরও অর্থ বরাদ্দের পক্ষে।
আরও বড় বিতর্ক তৈরি হচ্ছে কোন ধরনের পরিবার রাষ্ট্রীয় নীতির মাধ্যমে বেশি সুবিধা পাবে, তা নিয়ে।
রক্ষণশীল নীতিগবেষণা প্রতিষ্ঠান হেরিটেজ ফাউন্ডেশন চলতি বছরের জানুয়ারিতে পরিবারনীতি নিয়ে প্রায় ৭০ হাজার শব্দের একটি নীতিপত্র প্রকাশ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি এটিকে পরিবারনীতি নিয়ে তাদের বড় ধরনের উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। সেখানে চার বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য শিশু কর-সুবিধা দ্বিগুণ করা এবং নতুন বাড়ি নির্মাণের নিয়ম সহজ করার মতো কিছু প্রস্তাব রয়েছে, যেগুলো ডেমোক্র্যাটদের প্রচলিত কিছু দাবির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কিন্তু একই নীতিপত্রে পরিবার সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট রক্ষণশীল ধারণাও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বিবাহকে একজন পুরুষ ও একজন নারীর প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সম্পর্ক হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার পক্ষে অবস্থান নেওয়া হয়েছে এবং সমলিঙ্গের সম্পর্ক, বহুপাক্ষিক সম্পর্ক, বিবাহবহির্ভূত সহবাস কিংবা ইচ্ছাকৃত একক অভিভাবকত্বের তুলনায় ‘প্রাকৃতিক বিবাহকে’ বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
নীতিপত্রে ‘নো-ফল্ট ডিভোর্স’-এরও সমালোচনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে অল্প বয়সে বিয়ে করা, বেশি সন্তান নেওয়া এবং সন্তানের দেখাশোনার জন্য ঘরে থাকা পরিবারকে বাড়তি সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
এর ফলে ‘প্রো-ফ্যামিলি’ রাজনীতির ভেতরে মতের একটি বিস্তৃত পরিসর স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একদিকে রয়েছে শিশু পরিচর্যা, কর সুবিধা ও আবাসন সহায়তার মতো তুলনামূলকভাবে জনপ্রিয় পরিবারবান্ধব নীতি। অন্যদিকে রয়েছে বিবাহ, সন্তানসংখ্যা ও পরিবারের কাঠামোর ওপর নির্দিষ্ট সামাজিক মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব।
হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের একটি অনুষ্ঠানে পরিবার নিয়ে আলোচনার সময় পুরুষ ও নারীর বেতনের ক্ষেত্রেও পরিবারভিত্তিক কোনো পার্থক্য তৈরি করা যায় কি না—এমন প্রশ্ন উঠেছিল। তবে আলোচনাতেই উল্লেখ করা হয়, এ ধরনের পরিবর্তন বর্তমান আইনের অধীনে বৈধ হবে না।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ট্রাম্প প্রশাসনের কেউ এখন পর্যন্ত হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের পুরো পরিকল্পনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন করেননি। এমনকি রক্ষণশীল নীতিগবেষণা প্রতিষ্ঠান এথিকস অ্যান্ড পাবলিক পলিসি সেন্টারের প্যাট্রিক ব্রাউনও ঘরে থাকা বাবা-মায়েদের জন্য ডে-কেয়ার তহবিল সম্প্রসারণের প্রস্তাবকে সমর্থন করেন না।
তবু রক্ষণশীল নীতিবিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, ট্রাম্প-পরবর্তী রিপাবলিকান প্রশাসনে পরিবারনীতি আরও বড় জায়গা পেতে পারে। বিশেষ করে ভবিষ্যতে মার্কো রুবিও বা জে ডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে প্রশাসন গঠিত হলে পরিবারকেন্দ্রিক নীতিতে আরও জোর দেওয়া হতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ‘প্রো-ফ্যামিলি’ নীতি এখন শুধু সন্তান জন্মদানের হার বাড়ানোর আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে করনীতি, শিশু পরিচর্যা, আবাসন, বিবাহ, একক অভিভাবক পরিবার এবং রাষ্ট্রীয় সহায়তার কাঠামো। ফলে ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদের শেষভাগে নেওয়া বা আলোচিত কিছু উদ্যোগের চেয়েও বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে—তার পর রিপাবলিকান দল পরিবার ও সামাজিক নীতিকে কোন দিকে নিয়ে যাবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















