উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত লাখ লাখ পাকিস্তানির জন্য দেশে টাকা পাঠানো আরও সহজ ও সস্তা করার উদ্যোগ নিয়েছে পাকিস্তান। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালিত তাৎক্ষণিক ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা ‘রাস্ত’কে আরব মনিটারি ফান্ডের আন্তঃসীমান্ত পেমেন্ট নেটওয়ার্ক ‘বুনা’র সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তুতি চলছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ এই সংযোগ চালু হতে পারে।
এই ব্যবস্থা চালু হলে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে পাকিস্তানে অর্থ পাঠানোর খরচ প্রায় ৩২ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। একই সঙ্গে টাকা পৌঁছানোর সময়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। ফলে বর্তমানে প্রচলিত অনানুষ্ঠানিক অর্থ স্থানান্তর ব্যবস্থা ‘হাওলা’র ওপর নির্ভরতা কমতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পাকিস্তানের স্টেট ব্যাংক ২০২২ সালে ‘রাস্ত’ চালু করে। বর্তমানে প্রায় ৫ কোটি মানুষ এই তাৎক্ষণিক অর্থ লেনদেন ব্যবস্থাটি ব্যবহার করছেন। এবার এটিকে আরব আঞ্চলিক পেমেন্টস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড সেটেলমেন্ট অর্গানাইজেশনের পরিচালিত ‘বুনা’ নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
২০২০ সালে চালু হওয়া বুনা বর্তমানে মূলত মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার ১৫টি দেশের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আন্তঃসীমান্ত অর্থ লেনদেন পরিচালনা করে। পাকিস্তান এতে যুক্ত হলে দেশটি সম্ভবত দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে এই আরব আন্তঃসীমান্ত পেমেন্ট ব্যবস্থার অংশ হবে।
উপসাগরীয় প্রবাসীদের জন্য বড় সুবিধা
পাকিস্তানের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনে শেষ হওয়া অর্থবছরে পাকিস্তানে মোট ৪ হাজার ১৬০ কোটি ডলার প্রবাসী আয় এসেছে। এর অর্ধেকেরও বেশি এসেছে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত দেশগুলো থেকে।

ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে পাকিস্তানের দ্রুত ও কম খরচের ডিজিটাল অর্থ লেনদেন ব্যবস্থা চালু হলে এর সুফল পাবেন বিপুলসংখ্যক প্রবাসী পাকিস্তানি ও তাদের পরিবার।
পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাস্ত-বুনা সংযোগ চালু হলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল ও পাকিস্তানের মধ্যে অর্থ পাঠানোর খরচ প্রায় ৩২ শতাংশ কমতে পারে। একই সঙ্গে লেনদেনের গতি অনেক বেড়ে যাবে।
বুনার তথ্য অনুযায়ী, উপসাগরীয় কোনো দেশ থেকে পাকিস্তানের একটি ব্যাংক হিসাবে টাকা পাঠালে তা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পৌঁছে যেতে পারে। বর্তমানে এ ধরনের আন্তঃসীমান্ত লেনদেনে কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
ইসলামাবাদের ৪২ বছর বয়সী গৃহিণী নাসরিন বিবি প্রতি মাসে উপসাগরীয় একটি দেশে কর্মরত স্বামীর কাছ থেকে টাকা পান। রাস্ত ও বুনার সংযোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, এতে তার মতো মানুষের জন্য দেশে প্রবাসী আয় গ্রহণ করা আরও সুবিধাজনক হবে।
কমতে পারে হাওলার ব্যবহার
রাস্ত-বুনার সংযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হতে পারে অনানুষ্ঠানিক অর্থ স্থানান্তর ব্যবস্থা ‘হাওলা’র ব্যবহার কমে যাওয়া।
পাকিস্তানে হাওলা অবৈধ হলেও দীর্ঘদিন ধরে দেশটির বৈদেশিক অর্থ লেনদেনে এর ব্যবহার রয়েছে। ২০২৩ সালে পাকিস্তানের সিনেটের অর্থ ও রাজস্ববিষয়ক স্থায়ী কমিটির এক বক্তব্য অনুযায়ী, দেশটিতে বছরে আনুমানিক ৬০০ কোটি থেকে ৮০০ কোটি ডলারের হাওলা লেনদেন হতে পারে।
ডিজিটাল অর্থনীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ হাবিবুল্লাহ খান মনে করেন, রাস্ত-বুনা সংযোগ বৈধ অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে হাওলার ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে। কারণ গতি, খরচ ও সুবিধার দিক থেকে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে এই সংযোগ।
লাহোরের আইন ও কর পরামর্শক ইকরাম উল হকও মনে করেন, হাওলার জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হলো এটি অনেক সময় প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার তুলনায় দ্রুত, সস্তা, সহজলভ্য এবং নির্ভরযোগ্য। ফলে রাস্ত-বুনা ব্যবস্থা এসব সুবিধার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারলে হাওলার ব্যবহার কমতে পারে।

কীভাবে কাজ করে হাওলা
হাওলা সাধারণত দুই দেশের একাধিক মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ধরুন, কোনো ব্যক্তি একটি দেশে থাকা হাওলা এজেন্টের কাছে টাকা দিলেন। অন্য দেশে থাকা আরেক এজেন্ট সেই ব্যক্তির পরিবারের কাছে সমপরিমাণ অর্থ পৌঁছে দেন।
দুই দেশের এজেন্টরা সবসময় সরাসরি আন্তর্জাতিক ব্যাংক লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ পাঠান না। বরং নিজেদের মধ্যে পাওনা ও দেনার হিসাব সমন্বয় করেন। পরে বিভিন্ন উপায়ে নগদ অর্থের ভারসাম্য মেটানো হয়।
এই প্রক্রিয়ায় অর্থের পুরো গতিপথ শনাক্ত করা কর্তৃপক্ষের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে বৈধ প্রবাসী আয় ছাড়াও অর্থপাচারের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে হাওলা ব্যবহারের ঝুঁকি রয়েছে।
তবে অপরাধমূলক হাওলা পুরোপুরি বন্ধ হবে না
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, রাস্ত-বুনা সংযোগ চালু হলেও অপরাধমূলক হাওলা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে—এমনটা মনে করার কারণ নেই।
অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা প্রয়োজনে এমন পথ বেছে নিতে পারেন, যেখানে তাদের লেনদেন সরকারি আর্থিক ব্যবস্থার নজরে না আসে। তাই বৈধ অর্থ স্থানান্তরের জন্য ডিজিটাল ব্যবস্থা আরও আকর্ষণীয় করে তোলার পাশাপাশি অবৈধ অর্থ প্রবাহ ঠেকাতে নজরদারিও জোরদার করতে হবে।
সম্প্রতি অর্থপাচারবিষয়ক বৈশ্বিক নজরদারি সংস্থা এফএটিএফ হাওলাভিত্তিক অর্থপাচার নিয়ে একটি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে ওমান থেকে পাকিস্তানে পরিচালিত একটি অর্থপাচার নেটওয়ার্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে পরিচালিত ওই নেটওয়ার্ক এক বছরে প্রায় ৭২ হাজার ডলারের লেনদেন করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
পাকিস্তান অতীতে তিনবার এফএটিএফের ধূসর তালিকায় ছিল। সর্বশেষ ২০১৮ সালে দেশটি এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ২০২২ সালে অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে নির্ধারিত কর্মপরিকল্পনা সম্পন্ন করার পর তালিকা থেকে বেরিয়ে আসে।
বিশেষজ্ঞ ইকরাম উল হক বলেন, অতিরিক্ত নিয়ম-কানুন ও আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার বেশি খরচ বৈধ অর্থ প্রেরণকারীদেরও অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই রাস্ত-বুনা সংযোগের মাধ্যমে বৈধ অর্থ পাঠানো যদি দ্রুত, সস্তা ও সহজ করা যায়, তাহলে উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা পাকিস্তানিদের হাওলা ব্যবস্থার প্রয়োজন উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।
সব মিলিয়ে, পাকিস্তানের জন্য রাস্ত ও বুনার সংযোগ শুধু একটি নতুন ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা নয়; এটি প্রবাসী আয় ব্যবস্থাকে আরও দ্রুত ও কম খরচের করার পাশাপাশি বৈধ অর্থপ্রবাহ বাড়ানো এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থ স্থানান্তর কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















