০১:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আলিমা খান আটক, ২৭ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচি ঘিরে পাকিস্তানে নতুন উত্তেজনা বেলুচিস্তানে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান, নিহত ৪ আশুলিয়ায় গার্মেন্টস কারখানায় ভয়াবহ আগুন, নিহত ৭, আহত ১০ কমলাপুরে ট্রেনের বগিতে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ৫ ইউনিট নতুন প্রজাতির ক্ষুদ্র বন্যবিড়াল, দেখতেই বলিভিয়ায় ছুটছেন পর্যটকরা চীনের তরুণীদের পোশাকে জাপানি ‘লোলিটা’ ফ্যাশনের নতুন ঢেউ ইউয়ান শক্তিশালী করার চাপ বাড়ছে, কিন্তু কেন ধীরে এগোচ্ছে চীন? জাকার্তায় ভিনফাস্টের বৈদ্যুতিক মোটরবাইক ট্যাক্সি, এশিয়ায় নতুন করে ছড়াচ্ছে গ্রিন এসএম উপসাগরীয় দেশ থেকে পাকিস্তানে টাকা পাঠানো হবে আরও সস্তা ও দ্রুত, কমতে পারে ‘হাওলা’ হিউম্যানয়েড রোবটের উন্মাদনায় লাগাম চীনের, আইপিওতে এখন কঠিন পরীক্ষার মুখে কোম্পানিগুলো

চীনের তরুণীদের পোশাকে জাপানি ‘লোলিটা’ ফ্যাশনের নতুন ঢেউ

ফ্রিল, লেস, ফিতা আর পুতুলের মতো সাজ—জাপানের জনপ্রিয় ‘লোলিটা’ ফ্যাশন এখন দ্রুত জায়গা করে নিচ্ছে চীনের তরুণীদের মধ্যে। জাপান ও চীনের রাজনৈতিক সম্পর্ক যখন নানা টানাপোড়েনে আছে, তখনও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন কেনাকাটার হাত ধরে এই বিশেষ পোশাকধারা চীনের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

চীনের সাংহাইয়ে জুলাইয়ের শেষ দিকে ২৩ বছর বয়সী এক তরুণী প্রথমবারের মতো বাইরে লোলিটা পোশাক পরে বের হন। হালকা নীল রঙের চেক নকশার পোশাক, ফিতা ও পুতুলের মতো সাজে তাকে বেশ উচ্ছ্বসিত দেখাচ্ছিল।

“আজ প্রথমবার বাইরে পরে বের হলাম। খুব আনন্দ লাগছে, মনটাও ভালো হয়ে যাচ্ছে,” তিনি বলেন।

পোশাক বেছে নিতে তাকে সাহায্য করেন ২০ বছর বয়সী এক বন্ধু, যিনি প্রায় তিন বছর ধরে লোলিটা ফ্যাশনের সঙ্গে যুক্ত। ওই তরুণী জানান, চীনের জনপ্রিয় ভিডিওভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দৌইনে এই ফ্যাশনের সঙ্গে তার প্রথম পরিচয়।

ছোটবেলায় যে ধরনের রূপকথার রাজকন্যার পোশাকের স্বপ্ন দেখতেন, বাস্তবে তেমন পোশাক পাওয়া যায়—এটি জানার পর থেকেই তিনি এই ফ্যাশনের প্রতি আকৃষ্ট হন। এখন তার বাড়িতে এত বেশি পোশাক জমেছে যে সেগুলোর সংখ্যা গুনে শেষ করা কঠিন বলেও জানান তিনি।

China's young women embrace Japan's Lolita fashion with local twist - Nikkei Asia

জাপানের রাস্তাঘাট থেকে চীনের তরুণীদের আলমারিতে

লোলিটা ফ্যাশনের নকশায় সাধারণত লেস, ফিতা, ফুলেল বা সূক্ষ্ম নকশা এবং ঢেউ খেলানো বা ভারী স্কার্ট থাকে। পশ্চিমা পুতুলের সাজপোশাক থেকে এর অনুপ্রেরণা এলেও এর আধুনিক রূপ গড়ে উঠেছে জাপানের তরুণদের সংস্কৃতির সঙ্গে মিলেমিশে।

ধারণা করা হয়, টোকিওর হারাজুকু এলাকার তরুণদের পথের ফ্যাশন সংস্কৃতি থেকেই এর বিস্তার ঘটে। ১৯৯০-এর দশকে ‘গথিক লোলিটা’ বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়। কালো ও গাঢ় রঙের পোশাক, নাটকীয় সাজ এবং জাপানের ভিজ্যুয়াল-কেই সংগীতধারার প্রভাব এই শৈলীকে আলাদা পরিচিতি দেয়।

সময়ের সঙ্গে লোলিটা একটি বিস্তৃত ফ্যাশন ধারায় পরিণত হয়েছে। এখন এর বিভিন্ন ধরন চীনের তরুণীদের মধ্যেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

এক বছরে বিক্রি বেড়েছে ৬১ শতাংশ

টোকিওভিত্তিক ই-কমার্স বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান নিন্টের হিসাব অনুযায়ী, তাওবাও ও দৌইনসহ চীনের বড় অনলাইন বাজারগুলোতে লোলিটা ফ্যাশন ব্র্যান্ডের বিক্রি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬১ শতাংশ বেড়েছে। বিক্রির পরিমাণ ছাড়িয়েছে ১০০ কোটি ইউয়ান, যা প্রায় ১৫ কোটি মার্কিন ডলারের সমান।

জাপানি পোশাক কোম্পানি ড্রিম ভিশনের প্রেসিডেন্ট শিগেতোশি সুদা বলেন, চীনের বাজারে লোলিটা ফ্যাশনের প্রবৃদ্ধির গতি অত্যন্ত শক্তিশালী।

চীনে কোম্পানিটি গত বছর প্রথম স্থায়ী দোকান খোলে। এরপর দেশটিতে তাদের ব্যবসা দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির চীনা ক্রেতাদের বড় অংশের বয়স ১৮ থেকে ২৫ বছর এবং তাদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য।

চীনা ক্রেতাদের পছন্দ বুঝে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোও স্থানীয় ডিজাইনার নিয়োগ করছে এবং স্থানীয় রুচির সঙ্গে মানানসই পোশাক তৈরি করছে।

বিশেষ করে জাপানি তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় ‘মাস-প্রডিউসড’ ধরনের সাজ—যেখানে একই ধরনের প্যাস্টেল রঙের পোশাক, ফিতা ও নির্দিষ্ট ধরনের চুলের সাজ দেখা যায়—চীনে ভালো বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে ‘ল্যান্ডমাইন-গার্ল’ নামে পরিচিত এমন এক ধরনের সাজও জনপ্রিয় হয়েছে, যেখানে চেহারা ও পোশাকে মিষ্টি ভাব থাকলেও ব্যক্তিত্বে কিছুটা আবেগপ্রবণতার ইঙ্গিত থাকে।

এসব ধারার পেছনে জাপানি মাঙ্গা, অ্যানিমে এবং অনলাইন সংস্কৃতির বড় প্রভাব রয়েছে।

China's young women embrace Japan's Lolita fashion with local twist - Nikkei Asia

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই বড় চালিকাশক্তি

চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লোলিটা ফ্যাশন নিয়ে নিয়মিত কনটেন্ট তৈরি করেন পোপো নামে এক তরুণী। তিনি জানান, উচ্চবিদ্যালয়ে পড়ার সময় জাপানি চলচ্চিত্র ‘কামিকাজে গার্লস’ দেখার পর এই ফ্যাশনের প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয়। ছবিতে অভিনেত্রী কিয়োকো ফুকাদা লোলিটা পোশাকে অভিনয় করেছিলেন।

পোপোর মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সুপারিশব্যবস্থা এই ফ্যাশনকে জনপ্রিয় করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তার ভাষায়, উইচ্যাট ও দৌইনের মতো প্ল্যাটফর্মের সুপারিশ ব্যবস্থা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে আগে সীমিত পরিসরে থাকা বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ফ্যাশনধারা খুব দ্রুত নতুন মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।

এভাবেই একটি ছোট ও বিশেষায়িত ফ্যাশনধারা এখন বড় ভোক্তা বাজারের অংশ হয়ে উঠছে।

অ্যানিমে-মাঙ্গার অর্থনীতিতেও নতুন সম্ভাবনা

চীনের সামগ্রিক ভোক্তা ব্যয় যখন তুলনামূলকভাবে দুর্বল, তখন অ্যানিমে, মাঙ্গা ও ভিডিও গেমকে ঘিরে তৈরি পণ্য ও বিনোদনভিত্তিক বাজার তুলনামূলকভাবে ভালো করছে।

চীনে এই প্রবণতাকে অনেক সময় ‘টু-ডাইমেনশনাল’ অর্থনীতি বলা হয়। চরিত্রভিত্তিক পণ্য, অ্যানিমে সামগ্রী এবং সংশ্লিষ্ট পোশাকের চাহিদা শক্তিশালী থাকায় অনেক বিপণিবিতান নিজেদের এমনভাবে সাজাচ্ছে, যেখানে অ্যানিমে ও গেমভিত্তিক দোকানের পাশাপাশি লোলিটা ফ্যাশনের দোকানও থাকছে।

অনেক তরুণ-তরুণী মাঙ্গা, অ্যানিমে বা চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্রথমবার লোলিটা পোশাকের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন। ফলে এই বিনোদনভিত্তিক বাজারের সম্প্রসারণের সঙ্গে লোলিটা ফ্যাশনের ব্যবসাও বাড়ছে।

চীনা ব্র্যান্ডের নিজস্ব রূপ

শুধু জাপানি ব্র্যান্ড নয়, চীনা পোশাক নির্মাতারাও দ্রুত এই বাজারে জায়গা করে নিচ্ছে। তুলনামূলক কম দাম তাদের অন্যতম বড় সুবিধা।

China's young women embrace Japan's Lolita fashion with local twist - Nikkei Asia

লোলিটা ফ্যাশনের ভক্তদের মতে, জাপানি ব্র্যান্ডের পোশাক সাধারণত মানের দিক থেকে এগিয়ে। তবে চীনা ব্র্যান্ডগুলো আকার ও মাপের ক্ষেত্রে বেশি বৈচিত্র্য দিচ্ছে, যা অনেক ক্রেতার কাছে আকর্ষণীয়।

এর পাশাপাশি চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো লোলিটা ফ্যাশনের নিজস্ব সংস্করণও তৈরি করছে। এসব পোশাকে চীনের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের উপাদান যুক্ত হচ্ছে। যেমন—হানফু পোশাক এবং ঐতিহ্যবাহী ভাঁজযুক্ত ‘মামিয়ান’ স্কার্টের নকশা ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে নতুন ধরনের লোলিটা পোশাক।

চীনা ঐতিহ্য ও জাপানি ফ্যাশনের এই মিশ্রণ আবার জাপানেও নজর কাড়ছে। ফলে শুধু জাপান থেকে চীনে নয়, চীন থেকেও নতুন নকশা জাপানের বাজারে ফিরে যাচ্ছে।

রাজনীতি একদিকে, সংস্কৃতির স্রোত অন্যদিকে

জাপান ও চীনের রাজনৈতিক সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা কারণে উত্তেজনাপূর্ণ হয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির তাইওয়ান পরিস্থিতি নিয়ে সংসদে দেওয়া মন্তব্যের পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও টানাপোড়েনের মধ্যে পড়ে। এর জেরে চীন জাপানি সাংস্কৃতিক কনটেন্টের ওপরও কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করে, যার মধ্যে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের সীমাবদ্ধতাও ছিল।

তবে ভোক্তা পর্যায়ে দুই দেশের সাংস্কৃতিক যোগাযোগ পুরোপুরি থেমে যায়নি। বরং লোলিটা ফ্যাশনের মতো একটি বিশেষায়িত তরুণ সংস্কৃতি দেখিয়ে দিচ্ছে, রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেও জনপ্রিয় সংস্কৃতি কীভাবে সীমান্ত পেরিয়ে যেতে পারে।

জাপানের তৈরি ফ্যাশন চীনের তরুণীরা নিজেদের মতো করে গ্রহণ করছেন। আবার চীনা ডিজাইনাররা সেই ফ্যাশনে নিজেদের ঐতিহ্য ও নকশা যুক্ত করে নতুন রূপ দিচ্ছেন। ফলে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের দ্বিমুখী সাংস্কৃতিক প্রবাহ।

জাপানের ‘কাওয়াই’ বা মিষ্টি-আকর্ষণীয় সংস্কৃতি তাই এখন শুধু জাপানের নিজস্ব বিষয় নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অ্যানিমে-মাঙ্গা এবং তরুণদের ভোক্তা সংস্কৃতির মাধ্যমে এটি চীনের বাজারেও নতুন জীবন পাচ্ছে। রাজনৈতিক দূরত্ব যতই থাকুক, পোশাকের নকশা ও তরুণদের পছন্দের এই আদান-প্রদান আপাতত থামেনি।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

আলিমা খান আটক, ২৭ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচি ঘিরে পাকিস্তানে নতুন উত্তেজনা

চীনের তরুণীদের পোশাকে জাপানি ‘লোলিটা’ ফ্যাশনের নতুন ঢেউ

১২:২৬:১৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফ্রিল, লেস, ফিতা আর পুতুলের মতো সাজ—জাপানের জনপ্রিয় ‘লোলিটা’ ফ্যাশন এখন দ্রুত জায়গা করে নিচ্ছে চীনের তরুণীদের মধ্যে। জাপান ও চীনের রাজনৈতিক সম্পর্ক যখন নানা টানাপোড়েনে আছে, তখনও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন কেনাকাটার হাত ধরে এই বিশেষ পোশাকধারা চীনের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

চীনের সাংহাইয়ে জুলাইয়ের শেষ দিকে ২৩ বছর বয়সী এক তরুণী প্রথমবারের মতো বাইরে লোলিটা পোশাক পরে বের হন। হালকা নীল রঙের চেক নকশার পোশাক, ফিতা ও পুতুলের মতো সাজে তাকে বেশ উচ্ছ্বসিত দেখাচ্ছিল।

“আজ প্রথমবার বাইরে পরে বের হলাম। খুব আনন্দ লাগছে, মনটাও ভালো হয়ে যাচ্ছে,” তিনি বলেন।

পোশাক বেছে নিতে তাকে সাহায্য করেন ২০ বছর বয়সী এক বন্ধু, যিনি প্রায় তিন বছর ধরে লোলিটা ফ্যাশনের সঙ্গে যুক্ত। ওই তরুণী জানান, চীনের জনপ্রিয় ভিডিওভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দৌইনে এই ফ্যাশনের সঙ্গে তার প্রথম পরিচয়।

ছোটবেলায় যে ধরনের রূপকথার রাজকন্যার পোশাকের স্বপ্ন দেখতেন, বাস্তবে তেমন পোশাক পাওয়া যায়—এটি জানার পর থেকেই তিনি এই ফ্যাশনের প্রতি আকৃষ্ট হন। এখন তার বাড়িতে এত বেশি পোশাক জমেছে যে সেগুলোর সংখ্যা গুনে শেষ করা কঠিন বলেও জানান তিনি।

China's young women embrace Japan's Lolita fashion with local twist - Nikkei Asia

জাপানের রাস্তাঘাট থেকে চীনের তরুণীদের আলমারিতে

লোলিটা ফ্যাশনের নকশায় সাধারণত লেস, ফিতা, ফুলেল বা সূক্ষ্ম নকশা এবং ঢেউ খেলানো বা ভারী স্কার্ট থাকে। পশ্চিমা পুতুলের সাজপোশাক থেকে এর অনুপ্রেরণা এলেও এর আধুনিক রূপ গড়ে উঠেছে জাপানের তরুণদের সংস্কৃতির সঙ্গে মিলেমিশে।

ধারণা করা হয়, টোকিওর হারাজুকু এলাকার তরুণদের পথের ফ্যাশন সংস্কৃতি থেকেই এর বিস্তার ঘটে। ১৯৯০-এর দশকে ‘গথিক লোলিটা’ বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়। কালো ও গাঢ় রঙের পোশাক, নাটকীয় সাজ এবং জাপানের ভিজ্যুয়াল-কেই সংগীতধারার প্রভাব এই শৈলীকে আলাদা পরিচিতি দেয়।

সময়ের সঙ্গে লোলিটা একটি বিস্তৃত ফ্যাশন ধারায় পরিণত হয়েছে। এখন এর বিভিন্ন ধরন চীনের তরুণীদের মধ্যেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

এক বছরে বিক্রি বেড়েছে ৬১ শতাংশ

টোকিওভিত্তিক ই-কমার্স বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান নিন্টের হিসাব অনুযায়ী, তাওবাও ও দৌইনসহ চীনের বড় অনলাইন বাজারগুলোতে লোলিটা ফ্যাশন ব্র্যান্ডের বিক্রি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬১ শতাংশ বেড়েছে। বিক্রির পরিমাণ ছাড়িয়েছে ১০০ কোটি ইউয়ান, যা প্রায় ১৫ কোটি মার্কিন ডলারের সমান।

জাপানি পোশাক কোম্পানি ড্রিম ভিশনের প্রেসিডেন্ট শিগেতোশি সুদা বলেন, চীনের বাজারে লোলিটা ফ্যাশনের প্রবৃদ্ধির গতি অত্যন্ত শক্তিশালী।

চীনে কোম্পানিটি গত বছর প্রথম স্থায়ী দোকান খোলে। এরপর দেশটিতে তাদের ব্যবসা দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির চীনা ক্রেতাদের বড় অংশের বয়স ১৮ থেকে ২৫ বছর এবং তাদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য।

চীনা ক্রেতাদের পছন্দ বুঝে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোও স্থানীয় ডিজাইনার নিয়োগ করছে এবং স্থানীয় রুচির সঙ্গে মানানসই পোশাক তৈরি করছে।

বিশেষ করে জাপানি তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় ‘মাস-প্রডিউসড’ ধরনের সাজ—যেখানে একই ধরনের প্যাস্টেল রঙের পোশাক, ফিতা ও নির্দিষ্ট ধরনের চুলের সাজ দেখা যায়—চীনে ভালো বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে ‘ল্যান্ডমাইন-গার্ল’ নামে পরিচিত এমন এক ধরনের সাজও জনপ্রিয় হয়েছে, যেখানে চেহারা ও পোশাকে মিষ্টি ভাব থাকলেও ব্যক্তিত্বে কিছুটা আবেগপ্রবণতার ইঙ্গিত থাকে।

এসব ধারার পেছনে জাপানি মাঙ্গা, অ্যানিমে এবং অনলাইন সংস্কৃতির বড় প্রভাব রয়েছে।

China's young women embrace Japan's Lolita fashion with local twist - Nikkei Asia

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই বড় চালিকাশক্তি

চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লোলিটা ফ্যাশন নিয়ে নিয়মিত কনটেন্ট তৈরি করেন পোপো নামে এক তরুণী। তিনি জানান, উচ্চবিদ্যালয়ে পড়ার সময় জাপানি চলচ্চিত্র ‘কামিকাজে গার্লস’ দেখার পর এই ফ্যাশনের প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয়। ছবিতে অভিনেত্রী কিয়োকো ফুকাদা লোলিটা পোশাকে অভিনয় করেছিলেন।

পোপোর মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সুপারিশব্যবস্থা এই ফ্যাশনকে জনপ্রিয় করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তার ভাষায়, উইচ্যাট ও দৌইনের মতো প্ল্যাটফর্মের সুপারিশ ব্যবস্থা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে আগে সীমিত পরিসরে থাকা বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ফ্যাশনধারা খুব দ্রুত নতুন মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।

এভাবেই একটি ছোট ও বিশেষায়িত ফ্যাশনধারা এখন বড় ভোক্তা বাজারের অংশ হয়ে উঠছে।

অ্যানিমে-মাঙ্গার অর্থনীতিতেও নতুন সম্ভাবনা

চীনের সামগ্রিক ভোক্তা ব্যয় যখন তুলনামূলকভাবে দুর্বল, তখন অ্যানিমে, মাঙ্গা ও ভিডিও গেমকে ঘিরে তৈরি পণ্য ও বিনোদনভিত্তিক বাজার তুলনামূলকভাবে ভালো করছে।

চীনে এই প্রবণতাকে অনেক সময় ‘টু-ডাইমেনশনাল’ অর্থনীতি বলা হয়। চরিত্রভিত্তিক পণ্য, অ্যানিমে সামগ্রী এবং সংশ্লিষ্ট পোশাকের চাহিদা শক্তিশালী থাকায় অনেক বিপণিবিতান নিজেদের এমনভাবে সাজাচ্ছে, যেখানে অ্যানিমে ও গেমভিত্তিক দোকানের পাশাপাশি লোলিটা ফ্যাশনের দোকানও থাকছে।

অনেক তরুণ-তরুণী মাঙ্গা, অ্যানিমে বা চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্রথমবার লোলিটা পোশাকের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন। ফলে এই বিনোদনভিত্তিক বাজারের সম্প্রসারণের সঙ্গে লোলিটা ফ্যাশনের ব্যবসাও বাড়ছে।

চীনা ব্র্যান্ডের নিজস্ব রূপ

শুধু জাপানি ব্র্যান্ড নয়, চীনা পোশাক নির্মাতারাও দ্রুত এই বাজারে জায়গা করে নিচ্ছে। তুলনামূলক কম দাম তাদের অন্যতম বড় সুবিধা।

China's young women embrace Japan's Lolita fashion with local twist - Nikkei Asia

লোলিটা ফ্যাশনের ভক্তদের মতে, জাপানি ব্র্যান্ডের পোশাক সাধারণত মানের দিক থেকে এগিয়ে। তবে চীনা ব্র্যান্ডগুলো আকার ও মাপের ক্ষেত্রে বেশি বৈচিত্র্য দিচ্ছে, যা অনেক ক্রেতার কাছে আকর্ষণীয়।

এর পাশাপাশি চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো লোলিটা ফ্যাশনের নিজস্ব সংস্করণও তৈরি করছে। এসব পোশাকে চীনের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের উপাদান যুক্ত হচ্ছে। যেমন—হানফু পোশাক এবং ঐতিহ্যবাহী ভাঁজযুক্ত ‘মামিয়ান’ স্কার্টের নকশা ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে নতুন ধরনের লোলিটা পোশাক।

চীনা ঐতিহ্য ও জাপানি ফ্যাশনের এই মিশ্রণ আবার জাপানেও নজর কাড়ছে। ফলে শুধু জাপান থেকে চীনে নয়, চীন থেকেও নতুন নকশা জাপানের বাজারে ফিরে যাচ্ছে।

রাজনীতি একদিকে, সংস্কৃতির স্রোত অন্যদিকে

জাপান ও চীনের রাজনৈতিক সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা কারণে উত্তেজনাপূর্ণ হয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির তাইওয়ান পরিস্থিতি নিয়ে সংসদে দেওয়া মন্তব্যের পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও টানাপোড়েনের মধ্যে পড়ে। এর জেরে চীন জাপানি সাংস্কৃতিক কনটেন্টের ওপরও কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করে, যার মধ্যে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের সীমাবদ্ধতাও ছিল।

তবে ভোক্তা পর্যায়ে দুই দেশের সাংস্কৃতিক যোগাযোগ পুরোপুরি থেমে যায়নি। বরং লোলিটা ফ্যাশনের মতো একটি বিশেষায়িত তরুণ সংস্কৃতি দেখিয়ে দিচ্ছে, রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেও জনপ্রিয় সংস্কৃতি কীভাবে সীমান্ত পেরিয়ে যেতে পারে।

জাপানের তৈরি ফ্যাশন চীনের তরুণীরা নিজেদের মতো করে গ্রহণ করছেন। আবার চীনা ডিজাইনাররা সেই ফ্যাশনে নিজেদের ঐতিহ্য ও নকশা যুক্ত করে নতুন রূপ দিচ্ছেন। ফলে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের দ্বিমুখী সাংস্কৃতিক প্রবাহ।

জাপানের ‘কাওয়াই’ বা মিষ্টি-আকর্ষণীয় সংস্কৃতি তাই এখন শুধু জাপানের নিজস্ব বিষয় নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অ্যানিমে-মাঙ্গা এবং তরুণদের ভোক্তা সংস্কৃতির মাধ্যমে এটি চীনের বাজারেও নতুন জীবন পাচ্ছে। রাজনৈতিক দূরত্ব যতই থাকুক, পোশাকের নকশা ও তরুণদের পছন্দের এই আদান-প্রদান আপাতত থামেনি।