ভিয়েতনামের বৈদ্যুতিক যানবাহনভিত্তিক পরিবহন প্রতিষ্ঠান গ্রিন অ্যান্ড স্মার্ট মোবিলিটি (জিএসএম) ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় বৈদ্যুতিক মোটরবাইক ট্যাক্সি সেবা চালু করেছে। ভিয়েতনামের বাইরে এই প্রথম মোটরবাইকভিত্তিক সেবা চালু করল প্রতিষ্ঠানটি। এর মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বড় পরিবহন বাজারে নিজেদের উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি ভিয়েতনামের বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা ভিনফাস্টের জন্যও নতুন বিক্রির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ভিয়েতনামের শিল্পগোষ্ঠী ভিনগ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান জিএসএম ‘গ্রিন এসএম’ ব্র্যান্ডের অধীনে এই সেবা পরিচালনা করছে। প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে জাকার্তায় চার আসনের বৈদ্যুতিক ট্যাক্সি চালাচ্ছে। এর পাশাপাশি শনিবার আরও ৫০০টি ছয় আসনের ভিনফাস্ট গাড়ি বহরে যুক্ত করা হয়েছে। বুধবার থেকে শুরু হয়েছে বৈদ্যুতিক মোটরবাইক ট্যাক্সি সেবা।
২০২৪ সালে ১ হাজার গাড়ি নিয়ে ইন্দোনেশিয়ার বাজারে প্রবেশ করেছিল জিএসএম। বর্তমানে দেশটিতে তাদের মোট কতটি গাড়ি বা মোটরবাইক চলছে, সে তথ্য প্রকাশ করেনি প্রতিষ্ঠানটি। তবে জিএসএমের পুরো বহরই ভিনফাস্টের তৈরি যানবাহন দিয়ে গঠিত। ফলে জিএসএমের কার্যক্রম যত বাড়বে, ভিনফাস্টের গাড়ি ও মোটরবাইকের চাহিদাও তত বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভিনফাস্টের জন্য নতুন বিক্রির পথ
জিএসএমের বহরে ভিনফাস্টের যানবাহন ব্যবহারের কারণে প্রতিষ্ঠানটির সম্প্রসারণ ভিনফাস্টের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ভিনফাস্টের মোট সরবরাহের ১৩ শতাংশই এসেছে সংশ্লিষ্ট পক্ষের কাছে বিক্রি থেকে। জিএসএমকে বিক্রি করা যানবাহনও এই হিসাবের মধ্যে রয়েছে।
বিশ্বের গাড়ির বাজারে ভিনফাস্ট এখনো বড় প্রতিযোগীদের তুলনায় পিছিয়ে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের যাত্রীবাহী গাড়ির বাজারে প্রত্যাশিত গতি না পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি এশিয়ার বাজারে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। সেই কৌশলের অংশ হিসেবে জিএসএম ভিনফাস্টের গাড়ি ও মোটরবাইককে সরাসরি রাস্তায় নামিয়ে সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে ব্র্যান্ডটি পরিচিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
একটি যাত্রী যখন জিএসএমের বৈদ্যুতিক গাড়ি বা মোটরবাইক ব্যবহার করেন, তখন তিনি শুধু পরিবহনসেবা নেন না; একই সঙ্গে ভিনফাস্টের যানবাহনের অভিজ্ঞতাও পান। ফলে পরিবহন ব্যবসা ধীরে ধীরে গাড়ি বিক্রির প্রচারের একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবেও কাজ করতে পারে।
চালকদের জন্য আয় নিশ্চিত করার পরিকল্পনা
জিএসএম ইন্দোনেশিয়ায় চালকদের জন্য একটি ইজারা বা ভাড়া-ভিত্তিক মডেল চালু করেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, চালকদের অন্তত দুই মাসের জন্য দৈনিক ন্যূনতম আয় নিশ্চিত করা হবে।

গাড়ির চালকদের জন্য দৈনিক আয় ধরা হয়েছে ৪ লাখ ইন্দোনেশীয় রুপিয়া, যা প্রায় ২২ মার্কিন ডলারের সমান। মোটরবাইক চালকদের জন্য দৈনিক ন্যূনতম আয় ১ লাখ ৬০ হাজার রুপিয়া। যারা জিএসএমের কাছ থেকে মোটরবাইক ইজারা নেবেন, তারা দুই বছর পর সেই মোটরবাইক কেনার সুযোগও পাবেন।
এই মডেলের মাধ্যমে চালকদের কাছে বৈদ্যুতিক মোটরবাইক ব্যবহারের ঝুঁকি কিছুটা কমানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে তাদের নিজস্ব যানবাহনের মালিক হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে চাইছে প্রতিষ্ঠানটি।
গ্র্যাব ও গোজেকের বড় বাজারে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী
জাকার্তায় মোটরবাইকভিত্তিক যাত্রী পরিবহন নতুন কোনো ধারণা নয়। গ্র্যাব ও গোজেকের মতো বড় প্রযুক্তিনির্ভর পরিবহন সেবা ইতিমধ্যে দেশটির মোটরবাইক যাতায়াতের বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
এই বাজারেই জিএসএমের বিশেষত্ব হচ্ছে—তাদের বহর পুরোপুরি বৈদ্যুতিক। প্রতিষ্ঠানটি মনে করছে, প্রচলিত মোটরবাইকভিত্তিক সেবার পাশাপাশি সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক পরিবহন ব্যবস্থা তাদের আলাদা পরিচয় তৈরি করতে পারে। তবে জাকার্তার বাজারে তারা কত শতাংশ অংশীদারিত্ব অর্জন করতে চায়, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য প্রকাশ করেনি।
জিএসএম জানিয়েছে, ইন্দোনেশিয়ায় তারা ধাপে ধাপে এগোতে চায়। প্রথম পর্যায়ে যানবাহনের সরবরাহ, সেবার মান এবং দৈনন্দিন পরিচালন ব্যবস্থা ঠিকভাবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এরপর বাজারের চাহিদা দেখে সম্প্রসারণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হবে।
গাড়ির চেয়ে মোটরবাইকেই বড় বহর
বিশ্বজুড়ে জিএসএমের বহরে বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার গাড়ি এবং ৬০ হাজার মোটরবাইক রয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ তাদের মোটরবাইকের সংখ্যা গাড়ির তুলনায় প্রায় তিন গুণ।

এই হিসাব থেকেই বোঝা যায়, মোটরবাইকভিত্তিক বৈদ্যুতিক পরিবহন জিএসএমের ব্যবসায় কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জাকার্তায় প্রথমবার বিদেশে মোটরবাইক সেবা চালু করার সিদ্ধান্তও সেই কৌশলেরই অংশ।
নতুন নেতৃত্বে জিএসএমের নতুন অধ্যায়
জাকার্তায় এই সম্প্রসারণের সময়টি জিএসএমের জন্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ চলতি মাসেই প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে। ভিনগ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ফাম ন্যাত ভুওংয়ের দ্বিতীয় ছেলে ফাম ন্যাত মিন হোয়াং মাত্র ২৬ বছর বয়সে জিএসএমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন।
একই সময়ে তার ভাইকে ভিনফাস্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা করা হয়েছে। ফলে দুই ভাইয়ের নেতৃত্বে ভিনগ্রুপের পরিবহন ও বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবসায় নতুন পর্যায়ের সম্প্রসারণ শুরু হয়েছে।
হোয়াং বলেছেন, তাদের লক্ষ্য হলো গাড়ি ও মোটরবাইক—দুই ধরনের বৈদ্যুতিক যানকে একসঙ্গে নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বৈদ্যুতিক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের আরও বিস্তৃত প্রয়োজন পূরণ করা যায়।
এশিয়াকেন্দ্রিক হচ্ছে ভিনফাস্ট
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের যাত্রীবাহী গাড়ির বাজারে প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জনে ভিনফাস্টকে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। এর পর প্রতিষ্ঠানটি এশিয়ার বাজারকে তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
জিএসএম এই কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। বর্তমানে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, লাওস, ভারত, ডেনমার্ক ও কাজাখস্তানে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম রয়েছে।
চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্র, সুইডেন ও নেদারল্যান্ডসে প্রবেশের বিষয়টি বিবেচনা করছে জিএসএম। বাজার পরিস্থিতি ও পরিচালন পরিকল্পনা অনুকূলে থাকলে ২০২৭ সালে আরও কয়েকটি ইউরোপীয় দেশে কার্যক্রম শুরু করার সম্ভাবনাও রয়েছে।
তবে প্রতিষ্ঠানটি এখনই বড় কোনো সম্প্রসারণের ঘোষণা না দিয়ে ধাপে ধাপে এগোতে চাইছে। জাকার্তায় বৈদ্যুতিক মোটরবাইক ট্যাক্সি চালুর মাধ্যমে সেই কৌশলেরই বাস্তব প্রয়োগ শুরু হলো। একদিকে এতে জিএসএমের আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যবসা বাড়তে পারে, অন্যদিকে ভিনফাস্টের বৈদ্যুতিক যানবাহনের জন্যও নতুন বাজার ও নতুন ক্রেতা তৈরির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















