মিয়ানমারের ছায়া সরকার ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট বা এনইউজি নথি প্রকাশ করে জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি সামরিক জান্তার বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ আইন কার্যকরের পর থেকে ২৭টি ধাপে প্রায় এক লাখ পঁয়ত্রিশ হাজার আশি জন পুরুষকে জোর করে সেনাবাহিনীতে নেওয়া হয়েছে। এনইউজি এই মিয়ানমারে বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগকে জান্তার “টিকে থাকার প্রধান হাতিয়ার” হিসেবে অভিহিত করেছে।
আইন অনুযায়ী ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী পুরুষ এবং ১৮ থেকে ২৭ বছর বয়সী নারীদের জন্য সর্বোচ্চ দুই বছরের সামরিক সেবা বাধ্যতামূলক, আর চিকিৎসকের মতো বিশেষজ্ঞদের জন্য তিন বছর। জান্তা নারীদের নিয়োগের কথা অস্বীকার করলেও নারী সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রতিবেদন বহুবার উঠে এসেছে।
২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রায় বিশ হাজার তিনশ তিরাশি জন জান্তা সেনা নিহত এবং নয় হাজার সাতশ বিরানব্বই জন আহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই বাধ্যতামূলক নিয়োগপ্রাপ্ত। এ ছাড়া তিন হাজার আটশ চুয়াত্তর জন সেনা পক্ষত্যাগ করেছেন এবং প্রায় বিশ হাজার জন সেনাবাহিনী থেকে পালিয়েছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, ১৬-১৭ বছর বয়সী কিশোরসহ বাধ্যতামূলক নিয়োগপ্রাপ্তরা প্রায় আশি শতাংশ, যাদের সামান্য প্রশিক্ষণ দিয়েই সরাসরি সংঘাত এলাকায় পাঠানো হয়েছে। ২০২৫ সালের শেষভাগ থেকে অন্তত পাঁচশরও বেশি বাধ্যতামূলক নিয়োগপ্রাপ্ত সেনা যুদ্ধবন্দি হিসেবে ধরা পড়েছেন। প্রথম ধাপের পাঁচ হাজার একশ পঞ্চান্ন জন নিয়োগপ্রাপ্তের মধ্যে মাত্র ছয়শ একত্রিশ জনকে বাড়ি ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, বাকিদের নির্ধারিত দুই বছরের মেয়াদ পেরিয়েও সম্মুখসারিতে রাখা হয়েছে।
সীমান্তের ওপারে এই মিয়ানমারে বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ ও তার ফলে সৃষ্ট সংঘাত বাংলাদেশের জন্য সরাসরি উদ্বেগের বিষয়, কারণ রাখাইন রাজ্যে চলমান সহিংসতার প্রধান শিকার হচ্ছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী, যাদের বড় অংশ ইতিমধ্যে কক্সবাজারে আশ্রয় নিয়েছে। জান্তার সেনাসংকট যত বাড়বে, সীমান্তবর্তী এলাকায় সহিংসতা ও নতুন উদ্বাস্তু স্রোতের আশঙ্কাও তত বাড়বে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয়, জান্তা সেনাবাহিনীর প্রকৃত সক্ষমতা তার প্রচারিত শক্তির চেয়ে অনেক দুর্বল, আর তরুণ প্রজন্মকে জোর করে যুদ্ধে ঠেলে দেওয়াই এখন তাদের টিকে থাকার একমাত্র কৌশল।
এনইউজির প্রকাশিত এই নথি আন্তর্জাতিক মহলে জান্তার বিরুদ্ধে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর দাবিকে নতুন করে জোরালো করছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা বহুবার সতর্ক করেছে, বাধ্যতামূলক নিয়োগের এই ধরন আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, বিশেষত যেখানে কিশোর বয়সীদেরও যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে ন্যূনতম প্রশিক্ষণ দিয়ে। এই মিয়ানমারে বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ সংক্রান্ত তথ্য যত বেশি প্রকাশ পাচ্ছে, আন্তর্জাতিক মহলে জান্তার বিরুদ্ধে জবাবদিহির দাবিও ততই জোরালো হচ্ছে।
Sarakhon Report 



















