ইন্দোনেশিয়ায় সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে চলা ভয়াবহ দাবানলের ধোঁয়ায় শ্বাসযন্ত্রের রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ৭৫ হাজার ছাড়িয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্তদের মধ্যে ৪০ হাজারের বেশি শিশু, যাদের বয়স দুই বছরের কাছাকাছি।
দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তীর্ণ বন ও ভূমিতে আগুন জ্বলতে থাকায় বিষাক্ত ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে ইন্দোনেশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা। ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিবেশী মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরেও। কোথাও কোথাও বায়ুর মান ‘অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ইন্দোনেশিয়া পরিস্থিতি মোকাবিলায় বোর্নিও ও সুমাত্রা দ্বীপে ৫৪ হাজারের বেশি কর্মকর্তা ও কর্মী এবং কয়েক ডজন বিমান মোতায়েন করেছে। আগুন নেভাতে বিমান থেকে পানি ছোড়া হচ্ছে। তবে দেশটির বিশাল ভূখণ্ড, দুর্গম এলাকা এবং পিট বা জৈব পদার্থসমৃদ্ধ মাটিতে আগুন জ্বলতে থাকায় তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইন্দোনেশিয়ার মন্ত্রিপরিষদ সচিব টেডি ইন্দ্রা উইজায়া সোমবার বলেন, আকাশ থেকে মাটিতে—সব পর্যায়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ চলছে। আগুন নেভানো, ধোঁয়ার প্রভাব কমানো এবং দাবানল থেকে সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য বলে জানান তিনি।
ইন্দোনেশিয়ায় প্রতিবছর সাধারণত জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে দাবানলের প্রকোপ বাড়ে। তবে চলতি বছর পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়েছে অত্যন্ত শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে। আবহাওয়ার এই পরিস্থিতির সঙ্গে ‘গডজিলা’ এল নিনোর প্রভাবও যুক্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্বাধীন বন পর্যবেক্ষণ প্ল্যাটফর্ম নুসান্তারা অ্যাটলাসের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়াজুড়ে প্রায় ৭ লাখ ৩৪ হাজার অগ্নিকেন্দ্র শনাক্ত হয়েছে। এই সংখ্যা ২০১৯ সালের তুলনায় ৩০ শতাংশেরও বেশি বেশি। ২০১৯ সালও ইন্দোনেশিয়ার ভয়াবহ দাবানলের বছরগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত আগুনে অন্তত ৮ লাখ ৯৫ হাজার ৬৫৭ হেক্টর জমি পুড়ে গেছে। এই আয়তন বৃহত্তর লন্ডনের প্রায় ছয় গুণ।
দাবানলের প্রভাব শুধু বনাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নেই। দেশের বিভিন্ন এলাকায় স্কুল বন্ধ রাখতে হয়েছে এবং হাসপাতালগুলোতে শ্বাসযন্ত্রের অসুস্থতা নিয়ে রোগী ভর্তির সংখ্যা বেড়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দাবানল-সম্পর্কিত শ্বাসযন্ত্রের রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ১ সেপ্টেম্বর ৫০ হাজার ৮৯১ থেকে বেড়ে ৯ সেপ্টেম্বর ১ লাখ ১৩ হাজার ৩৩৬ হয়েছিল। এরপর সামগ্রিকভাবে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেড়ে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজারে পৌঁছেছে।
এই ধোঁয়া ও আগুনের প্রভাব পড়ছে বন্যপ্রাণীর ওপরও। বিশেষ করে বিপন্ন ওরাংওটাংয়ের জন্য পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম কালিমান্তান প্রদেশের একটি পাম তেলবাগানে গত মাসের শেষ দিকে একটি ওরাংওটাংকে মাটিতে ছটফট করতে দেখা যায়। এক কৃষক প্রাণীটিকে দেখতে পেয়ে উদ্ধার করেন। পরে তাকে জরুরি চিকিৎসা দেওয়া হয়। শ্বাসে অক্সিজেনের ঘাটতির কারণে প্রাণীটির চিকিৎসা চললেও শেষ পর্যন্ত সেটি মারা যায়।
পশ্চিম কালিমান্তানে দাবানল নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে স্থানীয় আদিবাসী ও নাগরিক সমাজের কয়েকটি সংগঠন গত সপ্তাহে কেন্দ্রীয় সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে যৌথ মামলা করেছে। তাদের অভিযোগ, দাবানল ও ধোঁয়াজনিত দুর্যোগের ঝুঁকি সম্পর্কে কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই জানত, কিন্তু যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

আগুন ও ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে ইন্দোনেশিয়া সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কয়েক দফা কৃত্রিম বৃষ্টি তৈরির উদ্যোগও নিয়েছে। এর কয়েকটি অভিযানে জাপানের আত্মরক্ষা বাহিনীর সদস্যরাও অংশ নিয়েছেন। তারা চলতি মাসের শুরুতে বোর্নিওতে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করছেন।
কৃত্রিম বৃষ্টির এই পদ্ধতিতে বিদ্যমান মেঘের মধ্যে লবণের কণা বা সিলভার আয়োডাইড ছড়িয়ে বৃষ্টিপাত বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। তবে এই পদ্ধতি কতটা কার্যকর, তা নিয়ে আবহাওয়াবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ার বাইরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি মালয়েশিয়ার সারাওয়াক। সেখানে চলতি মাসের শুরুতে পাঁচ দিনের কৃত্রিম বৃষ্টি তৈরির অভিযান চালানো হয়। এর উদ্দেশ্য শুধু ধোঁয়া কমানো নয়, অক্টোবরের সম্ভাব্য তীব্র শুষ্ক মৌসুমের আগে কয়েকটি জলবিদ্যুৎ বাঁধের পানির স্তর বাড়ানোও।
সারাওয়াকের উপপ্রধানমন্ত্রী ডগলাস উগাহ এমবাস সতর্ক করে বলেছেন, অক্টোবর আরও গরম ও শুষ্ক হতে পারে। তাই পরিস্থিতি আরও কঠিন হওয়ার আগে বাঁধগুলোর পানির স্তর যতটা সম্ভব বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
দাবানলের ধোঁয়া ইন্দোনেশিয়ার সীমান্ত ছাড়িয়ে ফিলিপাইনের কিছু এলাকাতেও পৌঁছেছে। সেখানে স্থানীয় কর্মকর্তারা বাসিন্দাদের যতটা সম্ভব ঘরের ভেতরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। সিঙ্গাপুরেও কর্তৃপক্ষ প্রতিদিন ধোঁয়াজনিত বায়ুদূষণ নিয়ে সতর্কতা জারি শুরু করেছে।
ফলে ইন্দোনেশিয়ার চলমান দাবানল এখন শুধু বন ও পরিবেশের সংকট নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, শিশুদের শ্বাসযন্ত্রের স্বাস্থ্য, বন্যপ্রাণী এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর বায়ুমান—সবকিছুর ওপরই বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















