ইয়েমেনে হুথি বাহিনীর নতুন সামরিক অভিযান দেশটির সংঘাতকে আরও তীব্র করে তুলেছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা দখলের চেষ্টা করছে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীটি। এসব অবস্থান নিয়ন্ত্রণে নিতে পারলে লোহিত সাগরের উপকূলকে সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
চলতি মাসে ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় দ্রুত অগ্রসর হয়েছে হুথিরা। তাদের সাম্প্রতিক সাফল্য মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে নতুন একটি ফ্রন্ট তৈরি করেছে। একই সঙ্গে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নৌ ও জ্বালানি সরবরাহপথগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
কাহবুব পাহাড় ঘিরে নতুন লড়াই
ইয়েমেনের পাঁচ সামরিক সূত্র জানিয়েছে, হুথিরা এখন তাইজ ও লাহিজ প্রদেশের কাহবুব পাহাড় দখলের দিকে নজর দিয়েছে। লোহিত সাগরের উপকূল এবং দক্ষিণাঞ্চলে সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ডের মাঝামাঝি অবস্থানের কারণে পাহাড়ি এলাকাটি সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এই উচ্চভূমি নিয়ন্ত্রণে এলে হুথিরা সাম্প্রতিক দখল করা এলাকাগুলো ধরে রাখার ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পেতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি বাহিনীর ওপর চাপ বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হবে।
তাইজ প্রদেশের দুর্গম আল-ওয়াজিয়াহ এলাকায় এবং ভারত মহাসাগরীয় উপকূলের কাছে রাস আল-আরায় সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। এলাকাটি বাব আল-মান্দেব প্রণালি ও এডেনের মাঝামাঝি। বাব আল-মান্দেব লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ, যা লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তা
হুথিদের অগ্রযাত্রার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক ভূমিকা নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রেসিডেন্ট রাশিদ আল-আলিমি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলে সামরিক সহায়তা চেয়েছিলেন বলে চারটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে।
এর মধ্যে ইয়েমেনি ও পশ্চিমা—দুই সূত্র জানিয়েছে, ওই ফোনালাপে ট্রাম্প সরাসরি সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেননি।
এর আগে নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নতুন করে সামরিক সহায়তার আহ্বানের পর হুথি লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলার প্রস্তুতি নিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন। তবে বিমানগুলোতে বোমা তোলার সময় শেষ মুহূর্তে ট্রাম্প হামলা বাতিলের নির্দেশ দেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। রয়টার্স স্বাধীনভাবে এ তথ্য নিশ্চিত করতে পারেনি।
লোহিত সাগরের বাণিজ্যপথে প্রভাব
২০১৪ সাল থেকে ইয়েমেনের রাজধানী সানা নিয়ন্ত্রণ করছে হুথিরা। সাম্প্রতিক অভিযানে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীকে পরাজিত করে তারা লোহিত সাগরের উপকূলের কিছু এলাকাও দখলে নিয়েছে।
সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে হুথিদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আরও সক্রিয় ভূমিকা চেয়ে আসছে। তবে এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটন সৌদি-সমর্থিত সামরিক অভিযানে সরাসরি যোগ দেয়নি।
ইয়েমেনি সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোহাম্মদ আল-কাদি বলেন, বাব আল-মান্দেব এলাকার নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর সরকারি বাহিনী মূলত প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে, ব্যাপক বিমান হামলার মুখেও হুথিরা তাদের অগ্রযাত্রার গতি ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
তার মতে, কাহবুব পাহাড় আগামী দিনের গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে। এই এলাকার নিয়ন্ত্রণ হুথিদের সাম্প্রতিক সাফল্য কতটা স্থায়ী হবে এবং সরকারি বাহিনী পাল্টা আক্রমণের জন্য পর্যাপ্ত ভূখণ্ড ধরে রাখতে পারবে কি না—তা নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে।
ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় বাব আল-মান্দেবকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক নৌপথ ও জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















