জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের স্থানীয় নির্বাচনে উগ্র ডানপন্থী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) ঐতিহাসিক সাফল্য পেয়েছে। ৬ সেপ্টেম্বরের নির্বাচনে দলটির এই জয় দেশটির রাজনীতিতে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানিতে কোনো কট্টর ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী দলের এমন সাফল্য খুব কমই দেখা গেছে।
জার্মানির তুলনামূলক ছোট ভোটার-অঞ্চল স্যাক্সনি-আনহাল্টের এই ফলাফল শুধু একটি আঞ্চলিক নির্বাচনের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর মধ্য দিয়ে দেশটির মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি মানুষের আস্থার পরিবর্তন এবং অভিবাসনবিরোধী রাজনীতির ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিষয়টি সামনে এসেছে।
নির্বাচনে এএফডি রাজ্য আইনসভায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে দলটি মাত্র তিনটি আসন পিছিয়ে রয়েছে। নির্বাচনের আগে এএফডির লক্ষ্য ছিল এমন একটি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা, যাতে অন্য কোনো দলের সহযোগিতা ছাড়াই তারা রাজ্য সরকার পরিচালনা করতে পারে।
এএফডির জন্য এর গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ জার্মানির মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে দলটির সঙ্গে জোট বা রাজনৈতিক সহযোগিতা প্রত্যাখ্যান করে আসছে। জার্মান রাজনীতিতে এই অবস্থানকে অনেক সময় ‘ফায়ারওয়াল’ নীতি বলা হয়। অর্থাৎ এএফডিকে ক্ষমতার অংশীদার না করে দলটির রাজনৈতিক প্রভাব সীমিত রাখার চেষ্টা করে আসছে মধ্যপন্থী ও মূলধারার দলগুলো।
কিন্তু স্যাক্সনি-আনহাল্টের ফলাফল সেই কৌশল কতটা কার্যকর থাকছে, তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। এএফডির ভোট বাড়ার অর্থ হলো অভিবাসন, জাতীয় পরিচয়, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক চাপের মতো বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে দলটির বক্তব্যের প্রতি ভোটারদের একটি অংশের সমর্থন বাড়ছে।
এই ফলাফল জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মের্জের জন্যও বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। মের্জের মধ্য-ডানপন্থী ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন (সিডিইউ) এএফডির সঙ্গে কাজ না করার অবস্থান স্পষ্ট রেখেছে। কিন্তু একই সঙ্গে স্যাক্সনি-আনহাল্টে এএফডির সাফল্য দেখিয়ে দিয়েছে যে সিডিইউসহ প্রচলিত দলগুলোর জন্য ডানপন্থী ভোটারদের ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
মের্জ অবশ্য জার্মানির গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ কমানোর চেষ্টা করেছেন। তবে নির্বাচনের ফলাফলকে তিনি সিডিইউর জন্য কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন পরাজয়গুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এখানেই স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচন জার্মানির জাতীয় রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একটি আঞ্চলিক নির্বাচনে এএফডি সংখ্যাগরিষ্ঠতার এত কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়াকে শুধু স্থানীয় ভোটের ফল হিসেবে দেখলে হয়তো পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। বরং এটি দেশটির রাজনৈতিক মেরুকরণ, মূলধারার দলগুলোর জনপ্রিয়তা এবং উগ্র ডানপন্থীদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে।
জার্মানির ইতিহাসের কারণে এএফডির উত্থান নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক মহলে উদ্বেগ অন্য অনেক ইউরোপীয় দেশের তুলনায় বেশি। নাৎসি শাসন ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থায় উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তির উত্থান ঠেকাতে দীর্ঘদিন ধরেই সতর্কতা দেখা গেছে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অভিবাসন, জীবনযাত্রার ব্যয়, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে এএফডি নিজেদের ভোটভিত্তি সম্প্রসারণ করেছে। স্যাক্সনি-আনহাল্টের ফলাফল সেই প্রবণতাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
তবে এএফডির এই সাফল্যকে সরাসরি জাতীয় ক্ষমতার পথে অগ্রযাত্রা হিসেবে দেখাও এখনই সহজ নয়। কারণ দলটির সঙ্গে সহযোগিতা না করার নীতি এখনো জার্মানির প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বহাল রয়েছে। ফলে ভোট বাড়লেও সরকার গঠনের ক্ষেত্রে এএফডিকে বড় রাজনৈতিক বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে।
তারপরও স্যাক্সনি-আনহাল্টের ফলাফল একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—জার্মান রাজনীতিতে এএফডিকে আর কেবল প্রান্তিক শক্তি হিসেবে দেখার সুযোগ ক্রমেই কমছে। দলটি যত বেশি ভোট পাবে, ততই মূলধারার দলগুলোর সামনে প্রশ্ন উঠবে, কীভাবে তারা এএফডির উত্থানের মোকাবিলা করবে এবং একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি ভোটারদের আস্থা ধরে রাখবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















