০৬:৪৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
ব্রিটেনে ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধের পরিকল্পনা ফ্রান্সে জি-৭ সম্মেলনে ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্য আলোচনার কেন্দ্রে হরমুজ সংকটে বাংলাদেশের সার কারখানা বন্ধ, কৃষিতে শঙ্কা এখনো কাটেনি চুক্তির আগেই হরমুজে ট্যাংকার চলাচল শুরু যুদ্ধ শেষ, তবু আটকে হাজারো প্রবাসী — ফিরতে আরও অপেক্ষা হরমুজ চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বস্তির সুযোগ: প্রবাসী, রেমিট্যান্স ও জ্বালানির ভবিষ্যৎ ট্রাম্প-ইরান চুক্তিতে হরমুজ খুলছে শুক্রবার, তেলের বাজারে স্বস্তি পাঞ্জাবে ভাইরাল ভিডিও ঘিরে তীব্র বিতর্ক, ‘গুরু দোখি’ ঘোষণা ভগবন্ত মানকে তৃণমূলে বড় ভাঙনের আশঙ্কা, ২০ সাংসদের এনসিপিআইতে যোগদানের দাবি; আদালতে ভবানীপুর ফল চ্যালেঞ্জ মমতার মার্কিন অবরোধ উপেক্ষা করে ইরানের বন্দরের পথে পাঁচ জাহাজ, দাবি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের

অপরিশোধ্য ঋণ

  • Sarakhon Report
  • ০৬:৫৫:০১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৫
  • 124

আবু ইসহাক

আমার সাহিত্য-জীবনের অনেকেই আমার হিতৈষী ছিলেন। আমি তাঁদের কাছে ঋণী। সাহিত্যের সিঁড়িতে পা রাখার সময়ে যাঁরা উৎসাহ ও পরামর্শ দিয়ে আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছেন তাঁদের মধ্যে আছেন কবি ও গীতিকার আনিসুল হক চৌধুরী, সাহিত্যিক এম. আবু তাহের এবং ডা. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। পরবর্তীকালে কবি গোলাম মোস্তফা, কবি জসীম উদ্‌দীন, ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সাহিত্যিক ও আইনবিদ গাজী শামছুর রহমান, সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায়, মনোজ বসু ও এবং আরো অনেকে আমাকে উৎসাহিত করেছেন। এঁদের সকলের কাছে আমি অশেষ ঋণী। তাঁদের ঋণ কোনো কিছু দিয়ে কোনো কালেই পরিশোধ করা সম্ভব নয়।

এমনি এক হিতৈষীর অপরিশোধ্য ঋণের অক্ষয় স্মৃতি জ্বলজ্বল করছে আমার স্মৃতির মণিকোঠায়। যাঁর কাছে আমার এ ঋণ তিনি খ্যাতনামা কোনো ব্যক্তি ছিলেন না। তিনি ছিলেন নিম্নপদস্থ এক সরকারি কর্মচারী।

১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার পর ব্রিটিশ সরকারের চাকরি থেকে নবসৃষ্ট পাকিস্তান সরকারের অধীনে চাকরি করার ইচ্ছা প্রকাশ করে কলকাতা থেকে ঢাকা এলাম। আমার পোস্টিং হলো নারায়ণগঞ্জে। ১৯৪৪ থেকে ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আমি এই নারায়ণগঞ্জেই ছিলাম। পুরনো সহকর্মীদের অনেককেই সেখানে পেলাম। তাঁদেরই কয়েকজন থাকেন খানপুরের ‘হামিদা কুটির’-এর মেসে। সেই মেসে থাকার জায়গা পেয়ে গেলাম। চার কামরার এ মেসে এক-শয্যাবিশিষ্ট দুটো কামরায় দুজন আর দুই-শয্যাবিশিষ্ট এক কামরায় দুজন আছেন। দুই শয্যাবিশিষ্ট যে কামরায় একজন আছেন সেখানেই আমার ঠাঁই হলো। কামরাটায় কয়েকদিন থাকার পর বুঝতে পারলাম এখানে রাত জেগে লেখালেখির কাজ করা সম্ভব নয়। এদিকে তখন “সূর্য-দীঘল বাড়ী”-র প্লট আমার মাথার মধ্যে শাখা বিস্তার করতে শুরু করেছে। এক-শয্যাবিশিষ্ট দুই কামরার একটায় থাকেন পুরনো সহকর্মী ফজলুল করিম। আমি যে কিছু লেখালেখি করি তা তিনি জানতেন। তাঁকে বললাম, ভাই, আপনার রুমটা আমাকে ছেড়ে দিয়ে আপনি যদি আমার জায়গায় আসেন, তা হলে আমার লেখালেখির কাজটা চলতে পারে।

তিনি যে আমার অনুরোধে তাঁর আরামের জায়গাটি ছেড়ে দিয়ে আরেকজনের সাথে ভাগাভাগি করে থাকবার জন্য আমার জায়গায় আসবেন তা ভাবতেই পারিনি। কিন্তু আমার ভাবনাকে হারিয়ে দিয়ে তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে সেই মুহূর্তে রাজি হয়ে গেলেন। সেদিনই জায়গা বদলাবদলি করে আমি ফজলুল করিমের কামরায় গিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।

মনকে ধ্যানমগ্ন করার জন্য চিন্তার জাল বোনার জন্য, কল্পনার রাজ্যে বিচরণের জন্য লেখকের একটি নির্জন নীরব নিভৃত আশ্রয়ের প্রয়োজন। ফজলুল করিমের উদারতায় আমি সেই আশ্রয় পেয়েছিলাম। সেখানে দরজা বন্ধ করে নিবিষ্ট মনে লেখালেখির সুযোগ আমি পেয়েছি। সেই নিভৃত কক্ষেই আমি “সূর্য-দীঘল বাড়ী” লেখা শুরু করি। উপন্যাসটির অর্ধেকটা ওখানে বসেই লেখা।

* ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মাসে আমি বদলি হয়ে যাই পাবনা। সেখানে কিছুদিন এক মোস সম্ভব শীদিন এক সে-সময়ে পাবনা শহরের সর্বদক্ষিণে অবস্থিত এক প্রখ্যাত সপ্ততীর্থ পণ্ডিতের মিডীর্থকুটির ভাড়া দেওয়া হবে শুনে একাই সে দোতলা বাড়িটা নিলাম মাসিক পঞ্চাশ টাকা ভাড়ায়। তখনকার পঞ্চাশ টাকার দাম এখন কম করে হলেও দুহাজার টাকা পালের বাড়ির নিভৃত নির্জন দোতলায় বসে ১৯৪৮ সালের আগস্ট মাসে “সূর্য-দীঘল বাড়ীই লেখা শেষ করি।

১৯৪৮ সালের নভেম্বর মাসে নারায়ণগঞ্জে গিয়ে ফজলুল করিমের খোঁজ করেছিলাম। জানতে পারলাম, তিনি ছুটিতে তাঁর দেশের বাড়ি বরিশালে গেছেন। তারপর ১৯৪৯ সালে আমি পুলিস বিভাগে চাকরি নিয়ে প্রশিক্ষণের জন্য সারদা পুলিস ট্রেনিং কলেজে যোগদান করি।

১৯৫১ সালে আমি বদলি হই মুন্সীগঞ্জ থানায়। সে-সময় “সূর্য-দীঘল বাড়ী” ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল মাসিকপত্র “নওবাহার”-এ।

গত তিন বছরের মধ্যে ফজলুল করিমের আর কোনো সংবাদাদি পাইনি। মুন্সীগঞ্জ খানায় যোগদানের কয়েকদিন পর থানার সেকেন্ড অফিসার মাহবুব সাহেবের টেবিলের পাশে বসে আলাপ করছিলাম। তিনি একটা মামলার চার্জশীট আমাকে দেখতে বললেন। তাঁর ইংরেজি হাতের লেখা দেখে আমি চমকে উঠলাম। বিস্ময় কাটিয়ে উঠতেই আমি জিজ্ঞেস করলাম, মাহবুব সাহেব, আপনি কি বরিশালের পাদ্রিশিবপুর স্কুলে লেখাপড়া করেছেন?

মাহবু- সাহেব বিস্ময়বিমূঢ় দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে। তারপর বললেন, হ্যাঁ, আমি পাদ্রিশিবপুর স্কুলের ছাত্র। কিন্তু আপনি জানলেন কী করে?

আমার অনুমান সত্য হওয়ায় আমি তখন বেশ উৎফুল্ল। বললাম, সিভিল সাপ্লাইয়ে আমার এক সহকর্মীর হাতের লেখা ছিল ঠিক আপনার হাতের লেখার মতো। তিনি বলেছিলেন, মিশনারি স্কুলের শিক্ষকদের হাতের খেলার প্রভাবে নাকি তাঁর হাতের লেখা ওই রকম। প্রতিটি অক্ষর ওপর থেকে ক্রমশ নিচের বাঁ দিকে বাঁকানো এবং প্রতিটি অক্ষরের বাঁকা লাইন প্রায় সমান্তরাল।

-হ্যাঁ, তাই, মাহবুব সাহেব বললেন।- আপনার সে সহকর্মীর নাম কী, বলুন তো?

-ফজলুল করিম। আমি বললাম।

-আরে! সে তো আমার মামাতো ভাই!

-সে এখন কোথায় আছে, কী করছে? জিজ্ঞস করি আমি।

-সে আর নেই।

-নেই!!! আমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। ধরা-গলায় জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছিল তাঁর?

-টি. বি. হয়েছিল। গতবছর মারা গেছে।

আমার চোখ ঝাপসা হয়ে এল। আমি আর কথা বলতে পারছিলাম না।

ফজলুল করিম “সূর্য-দীর্ঘল বাড়ী” গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হওয়ার পাঁচ বছর আগে এ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। প্রকাশিত হওয়ার পর উপন্যাসটি তিনি দেখে যেতে পারলে আমার দুঃখের কিছুটা লাঘব হতো। আমার জন্য তিনি যে ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন তা আমি কোনো দিন ভুলব না। তাঁর অপরিশোধ্য ঋণের কথা মৃত্যু পর্যন্ত উজ্জ্বল হয়ে থাকবে আমার অন্তরের স্মৃতিকোঠায়। আগেও একবার বলেছি, এ ধরনের ঋণ কোনো কিছুর বিনিময়ে কোনো কালেই পরিশোধ করা যায় না।

জনপ্রিয় সংবাদ

ব্রিটেনে ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধের পরিকল্পনা

অপরিশোধ্য ঋণ

০৬:৫৫:০১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৫

আবু ইসহাক

আমার সাহিত্য-জীবনের অনেকেই আমার হিতৈষী ছিলেন। আমি তাঁদের কাছে ঋণী। সাহিত্যের সিঁড়িতে পা রাখার সময়ে যাঁরা উৎসাহ ও পরামর্শ দিয়ে আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছেন তাঁদের মধ্যে আছেন কবি ও গীতিকার আনিসুল হক চৌধুরী, সাহিত্যিক এম. আবু তাহের এবং ডা. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। পরবর্তীকালে কবি গোলাম মোস্তফা, কবি জসীম উদ্‌দীন, ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সাহিত্যিক ও আইনবিদ গাজী শামছুর রহমান, সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায়, মনোজ বসু ও এবং আরো অনেকে আমাকে উৎসাহিত করেছেন। এঁদের সকলের কাছে আমি অশেষ ঋণী। তাঁদের ঋণ কোনো কিছু দিয়ে কোনো কালেই পরিশোধ করা সম্ভব নয়।

এমনি এক হিতৈষীর অপরিশোধ্য ঋণের অক্ষয় স্মৃতি জ্বলজ্বল করছে আমার স্মৃতির মণিকোঠায়। যাঁর কাছে আমার এ ঋণ তিনি খ্যাতনামা কোনো ব্যক্তি ছিলেন না। তিনি ছিলেন নিম্নপদস্থ এক সরকারি কর্মচারী।

১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার পর ব্রিটিশ সরকারের চাকরি থেকে নবসৃষ্ট পাকিস্তান সরকারের অধীনে চাকরি করার ইচ্ছা প্রকাশ করে কলকাতা থেকে ঢাকা এলাম। আমার পোস্টিং হলো নারায়ণগঞ্জে। ১৯৪৪ থেকে ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আমি এই নারায়ণগঞ্জেই ছিলাম। পুরনো সহকর্মীদের অনেককেই সেখানে পেলাম। তাঁদেরই কয়েকজন থাকেন খানপুরের ‘হামিদা কুটির’-এর মেসে। সেই মেসে থাকার জায়গা পেয়ে গেলাম। চার কামরার এ মেসে এক-শয্যাবিশিষ্ট দুটো কামরায় দুজন আর দুই-শয্যাবিশিষ্ট এক কামরায় দুজন আছেন। দুই শয্যাবিশিষ্ট যে কামরায় একজন আছেন সেখানেই আমার ঠাঁই হলো। কামরাটায় কয়েকদিন থাকার পর বুঝতে পারলাম এখানে রাত জেগে লেখালেখির কাজ করা সম্ভব নয়। এদিকে তখন “সূর্য-দীঘল বাড়ী”-র প্লট আমার মাথার মধ্যে শাখা বিস্তার করতে শুরু করেছে। এক-শয্যাবিশিষ্ট দুই কামরার একটায় থাকেন পুরনো সহকর্মী ফজলুল করিম। আমি যে কিছু লেখালেখি করি তা তিনি জানতেন। তাঁকে বললাম, ভাই, আপনার রুমটা আমাকে ছেড়ে দিয়ে আপনি যদি আমার জায়গায় আসেন, তা হলে আমার লেখালেখির কাজটা চলতে পারে।

তিনি যে আমার অনুরোধে তাঁর আরামের জায়গাটি ছেড়ে দিয়ে আরেকজনের সাথে ভাগাভাগি করে থাকবার জন্য আমার জায়গায় আসবেন তা ভাবতেই পারিনি। কিন্তু আমার ভাবনাকে হারিয়ে দিয়ে তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে সেই মুহূর্তে রাজি হয়ে গেলেন। সেদিনই জায়গা বদলাবদলি করে আমি ফজলুল করিমের কামরায় গিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।

মনকে ধ্যানমগ্ন করার জন্য চিন্তার জাল বোনার জন্য, কল্পনার রাজ্যে বিচরণের জন্য লেখকের একটি নির্জন নীরব নিভৃত আশ্রয়ের প্রয়োজন। ফজলুল করিমের উদারতায় আমি সেই আশ্রয় পেয়েছিলাম। সেখানে দরজা বন্ধ করে নিবিষ্ট মনে লেখালেখির সুযোগ আমি পেয়েছি। সেই নিভৃত কক্ষেই আমি “সূর্য-দীঘল বাড়ী” লেখা শুরু করি। উপন্যাসটির অর্ধেকটা ওখানে বসেই লেখা।

* ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মাসে আমি বদলি হয়ে যাই পাবনা। সেখানে কিছুদিন এক মোস সম্ভব শীদিন এক সে-সময়ে পাবনা শহরের সর্বদক্ষিণে অবস্থিত এক প্রখ্যাত সপ্ততীর্থ পণ্ডিতের মিডীর্থকুটির ভাড়া দেওয়া হবে শুনে একাই সে দোতলা বাড়িটা নিলাম মাসিক পঞ্চাশ টাকা ভাড়ায়। তখনকার পঞ্চাশ টাকার দাম এখন কম করে হলেও দুহাজার টাকা পালের বাড়ির নিভৃত নির্জন দোতলায় বসে ১৯৪৮ সালের আগস্ট মাসে “সূর্য-দীঘল বাড়ীই লেখা শেষ করি।

১৯৪৮ সালের নভেম্বর মাসে নারায়ণগঞ্জে গিয়ে ফজলুল করিমের খোঁজ করেছিলাম। জানতে পারলাম, তিনি ছুটিতে তাঁর দেশের বাড়ি বরিশালে গেছেন। তারপর ১৯৪৯ সালে আমি পুলিস বিভাগে চাকরি নিয়ে প্রশিক্ষণের জন্য সারদা পুলিস ট্রেনিং কলেজে যোগদান করি।

১৯৫১ সালে আমি বদলি হই মুন্সীগঞ্জ থানায়। সে-সময় “সূর্য-দীঘল বাড়ী” ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল মাসিকপত্র “নওবাহার”-এ।

গত তিন বছরের মধ্যে ফজলুল করিমের আর কোনো সংবাদাদি পাইনি। মুন্সীগঞ্জ খানায় যোগদানের কয়েকদিন পর থানার সেকেন্ড অফিসার মাহবুব সাহেবের টেবিলের পাশে বসে আলাপ করছিলাম। তিনি একটা মামলার চার্জশীট আমাকে দেখতে বললেন। তাঁর ইংরেজি হাতের লেখা দেখে আমি চমকে উঠলাম। বিস্ময় কাটিয়ে উঠতেই আমি জিজ্ঞেস করলাম, মাহবুব সাহেব, আপনি কি বরিশালের পাদ্রিশিবপুর স্কুলে লেখাপড়া করেছেন?

মাহবু- সাহেব বিস্ময়বিমূঢ় দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে। তারপর বললেন, হ্যাঁ, আমি পাদ্রিশিবপুর স্কুলের ছাত্র। কিন্তু আপনি জানলেন কী করে?

আমার অনুমান সত্য হওয়ায় আমি তখন বেশ উৎফুল্ল। বললাম, সিভিল সাপ্লাইয়ে আমার এক সহকর্মীর হাতের লেখা ছিল ঠিক আপনার হাতের লেখার মতো। তিনি বলেছিলেন, মিশনারি স্কুলের শিক্ষকদের হাতের খেলার প্রভাবে নাকি তাঁর হাতের লেখা ওই রকম। প্রতিটি অক্ষর ওপর থেকে ক্রমশ নিচের বাঁ দিকে বাঁকানো এবং প্রতিটি অক্ষরের বাঁকা লাইন প্রায় সমান্তরাল।

-হ্যাঁ, তাই, মাহবুব সাহেব বললেন।- আপনার সে সহকর্মীর নাম কী, বলুন তো?

-ফজলুল করিম। আমি বললাম।

-আরে! সে তো আমার মামাতো ভাই!

-সে এখন কোথায় আছে, কী করছে? জিজ্ঞস করি আমি।

-সে আর নেই।

-নেই!!! আমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। ধরা-গলায় জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছিল তাঁর?

-টি. বি. হয়েছিল। গতবছর মারা গেছে।

আমার চোখ ঝাপসা হয়ে এল। আমি আর কথা বলতে পারছিলাম না।

ফজলুল করিম “সূর্য-দীর্ঘল বাড়ী” গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হওয়ার পাঁচ বছর আগে এ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। প্রকাশিত হওয়ার পর উপন্যাসটি তিনি দেখে যেতে পারলে আমার দুঃখের কিছুটা লাঘব হতো। আমার জন্য তিনি যে ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন তা আমি কোনো দিন ভুলব না। তাঁর অপরিশোধ্য ঋণের কথা মৃত্যু পর্যন্ত উজ্জ্বল হয়ে থাকবে আমার অন্তরের স্মৃতিকোঠায়। আগেও একবার বলেছি, এ ধরনের ঋণ কোনো কিছুর বিনিময়ে কোনো কালেই পরিশোধ করা যায় না।