১২:১৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬
“ভয়েস এআই বাজারে ডিপগ্রামের তেজি অগ্রযাত্রা” দাভোস সম্মেলনে নতুন বিশ্ব শৃঙ্খলা নিয়ে আলোচনা সরকারের অনুমোদন: এক কোটি লিটার সয়াবিন তেল ও ৪০ হাজার মেট্রিক টন সার কেনা ইরানে বিক্ষোভ দমনে সহিংসতা তীব্র, নিহতের সংখ্যা প্রায় দুই হাজারে পৌঁছানোর আশঙ্কা গ্যাস সংকট ও চাঁদাবাজিতে রেস্তোরাঁ ব্যবসা চালানো হয়ে উঠছে অসম্ভব সস্তা চিনিযুক্ত পানীয় ও অ্যালকোহলে বাড়ছে অসংক্রামক ব্যাধির ঝুঁকি রাজধানীতে স্ত্রীকে বেঁধে জামায়াত নেতাকে হত্যা হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে রান্না রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপকের বিরুদ্ধে ধর্ষণচেষ্টার মামলা টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা

পোকা মারতে ডলার মার: আমদানি-বান্ধব বাজেট কি সত্যিই কৃষক-বান্ধব?

পোকামাকড় ও রোগ-জীবাণুর বহুমুখী চাপ

বাংলাদেশের খাদ্য-স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও জনস্বাস্থ্য—দুটিই ক্রমবর্ধমানভাবে পোকামাকড় ও বাহক-মশার হুমকিতে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO)-র সমীক্ষায় দেখা যায়, ২০০৮-১৮ সময়কালে বিশ্বব্যাপী ফসল ও পশু উৎপাদনের প্রায় ৯ শতাংশ নষ্ট হয়েছে নানা জীববৈচিত্র্য-জনিত আক্রমণে; দক্ষিণ এশিয়ায় হারটি আরও বেশি। একই সঙ্গে ২০২৪ সালে ডেঙ্গুতে ১ লাখের বেশি আক্রান্ত ও ৫৭৫টি মৃত্যু বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার ‘হটস্পট’ হিসেবে স্পষ্ট করেছে। এ বছর ডেঙ্গু ব্যাপক আকারে ছড়াচ্ছে দেশের প্রত্যন্ত এলাকায়। এই দুই বাস্তবতা কীটনাশক সরবরাহকে কেবল কৃষকেরই নয়, শহর-গ্রামের প্রতিটি পরিবারের অপরিহার্য চাহিদায় পরিণত করেছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ৪০ কমিশনার বদলি

বাজেট ২০২৫-২৬: শুল্ক ২৫ থেকে ৫ শতাংশে নামিয়ে কার লাভ?

গত বছরের সংশোধিত শুল্ক কাঠামোয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কীটনাশক আমদানির শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে নামিয়ে নিয়েছে—পেঁয়াজ ও আলুর বিপরীতে একই ছাড়ের তালিকায় এর উল্লেখ আছে। সদ্য প্রকাশিত কাস্টমস ট্যারিফ বুকেও ৫ শতাংশ ‘বেসিক ডিউটি’ বহাল রয়েছে। নীতিপ্রণেতাদের যুক্তি, দাম কমলে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমবে। কিন্তু বাস্তবে শুল্ক-ছাড়ে সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী হয়েছেন আমদানিকারক ও তাঁদের বিদেশি সরবরাহকারী; দেশীয় উৎপাদকদের প্রতিযোগিতা কঠিন হয়েছে।

বাজারের চিত্র: ৩৬০ মিলিয়ন ডলারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা

২০২৪ সালে বাংলাদেশি কীটনাশক বাজার ১৩ শতাংশ বেড়ে ৩৬০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। গবেষণা সংস্থা 6Wresearch-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫-৩১ সময়কালে বার্ষিক চাহিদা বেশি থাকবে। অথচ বাজারের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই এখনো আমদানিনির্ভর—যার বেশির ভাগ আসে চীন ও ভারত থেকে; ফলে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ বাড়ছে।

দেশে যেসব কারখানা এগিয়ে: সুযোগ ও সীমাবদ্ধতা

দেশে অনেকগুলো কোম্পানি প্রযুক্তিসমৃদ্ধ প্ল্যান্ট গড়ে তুলেছে। একটি বড় কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে—দেশীয় বাজারের পাশাপাশি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলো আফ্রিকা-মধ্যপ্রাচ্যেও বাজার খুঁজছে। কিন্তু উৎপাদন প্রচলিত ‘টোল-ম্যানুফ্যাকচারিং’-এ সীমিত; কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চ জটিলতার পাশাপাশি ‘মাঠ-টেস্ট’ বাধ্যতামূলক হওয়ায় পণ্যে দ্রুত বৈচিত্র্য আনা কঠিন।

খাদ্য নিরাপত্তা ও উৎপাদন বাড়ানোর উপায়

সার ও বালাইনাশক ব্যবহার ছাড়া উচ্চ ফলন ভাবাই যায় না। ২০১০-এর পর বাংলাদেশ ধান-গমের পাশাপাশি ফল, শাক-সবজি ও মসলার বিস্তৃত উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে; তবে কীট-পতঙ্গমুক্তকরণ নিশ্চিত না হলে ফলন থেকে ভোক্তা—দুই পর্যায়েই অপচয় বাড়ে। FAO-র জরিপ দেখায়, এশিয়ায় অনিয়ন্ত্রিত পোকামাকড়ে ফসলহানি গড়ে ২০ শতাংশের কাছাকাছি। স্বাস্থ্যকর, অবশিষ্টাংশ-নিয়ন্ত্রিত (MRL) কীটনাশক দেশেই উৎপাদন করলে মান নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়; রপ্তানি ক্ষেত্রেও ‘ফুড সেফটি সনদ’ পেতে সহায়ক।

জনস্বাস্থ্য ও নগর জীবনে রোধ-ব্যবস্থা

ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়ার মতো রোগ-বাহক মশা নির্মূলে অতিদ্রুত ও কার্যকর লার্ভিসাইড-এয়ারোসলের প্রয়োজন বাড়ছে। ২০২৩-২৪-এর রেকর্ড ডেঙ্গু-মৃত্যুর পর বিশেষজ্ঞরা ‘সারা বছর নজরদারি’র ওপর জোর দিচ্ছেন। নির্ভরযোগ্য উৎপাদক কম থাকায় সিটি করপোরেশনগুলোর সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত হয় না; অনেক ক্ষেত্রেই নিম্নমানের আমদানি-কীটনাশকে মশা মরে না—ফলে জনস্বাস্থ্যে দ্বিগুণ খরচ পড়ে।

আন্তর্জাতিক তুলনা: ভারতীয় মেক-ইন-ইন্ডিয়া’ মডেল

ভারত ২০২৪-২৫ বাজেটে কীটনাশক ফর্মুলেশনের আমদানি শুল্ক ১০ থেকে ১৫ শতাংশে তুলেছে। রপ্তানি-মুখী কৃষি-রসায়ন শিল্প গড়তে সরকার জিএসটি ছাড়, দ্রুত লাইসেন্স ও গবেষণাভর্তুকি দিয়েছে। বাংলাদেশে উল্টো চিত্র—৫ শতাংশ শুল্ক, কঠোর মান-টেস্ট না থাকায় কমদামী পণ্য বাজার প্লাবিত করে; স্থানীয় প্রতিষ্ঠান মূলধন বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হয়।

অর্থনৈতিক সুফল বনাম সম্ভাব্য ক্ষতি

  • বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়: প্রয়োজনীয়তার ৫০ শতাংশ দেশেই উৎপাদিত হলে বছরে অন্তত ১৫০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় রক্ষা সম্ভব।
    •কর্মসংস্থান: গড়ে প্রতি ১ কোটি টাকার মূলধনে ২৫-৩০টি সরাসরি ও ৫০টি পরোক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হয়—রিয়েল-এস্টেট ফিটিংস শিল্পের মতো সম্ভাবনা নষ্ট না করার সতর্কবার্তা প্রযোজ্য।
    • রপ্তানি সম্ভাবনা: ওষুধ খাতে ১১৩টি দেশে পণ্য পাঠানোর অভিজ্ঞতা দেখায়, সঠিক নীতি হলে কীটনাশকও দক্ষিণ-এশিয়া-আফ্রিকায় রপ্তানিযোগ্য।
    • স্বাস্থ্য-সামাজিক ঝুঁকি: অবাধ আমদানিতে মানহীন রাসায়নিক ঢুকলে খাদ্য-শৃঙ্খলে অবশিষ্টাংশ, পরিবেশ-দূষণ ও অ্যান্টি-ডাম্পিং ঝুঁকি বাড়ে। নিয়ন্ত্রিত স্থানীয় উৎপাদনে ‘গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস’ (GMP) কার্যকর করা সহজ।

কেমন ছিল বাংলাদেশের ৫৩ বাজেট

নীতিগত সুপারিশ

  • ধীরে ধীরে শুল্ক সমন্বয়: অবিলম্বে ১৫ শতাংশ ‘বেসিক ডিউটি’ ও ৫ শতাংশ রেগুলেটরি কর আরোপ করে স্থানীয় কারখানাকে শ্বাসফেলার সময় দিতে হবে।
  • কাঁচামাল উৎস উন্মুক্ত: ওষুধ খাতের মতো বন্দরে নয়—কারখানায় দ্রুত ল্যাব-টেস্ট চালু করে ডেমারেজ কমাতে হবে।
  • বায়োপেস্টিসাইড গবেষণা ভর্তুকি: বিশ্ব বাজারে জৈব-কীটনাশকের প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের বেশি; বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয়-কারখানা যৌথ প্রকল্পে উদ্ভাবন ত্বরান্বিত করা দরকার।
  • মাঠ-টেস্ট পুনর্বিবেচনা: একই অ্যাগ্রো-ক্লিম্যাটিক জোনে একাধিকবার টেস্ট বাধ্যতামূলক না করে WHO-AQIS-সিদ্ধ ফলাফল গ্রহণযোগ্য করলে পণ্য বাজারে আনতে সময় কমবে।
  • বহুমাত্রিক নজরদারি: ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মতো একটি ‘কীটনাশক নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ’ গঠন করে আমদানির প্রতিটি চালানকে MRL ও পরিবেশ-প্রভাব পরীক্ষার আওতায় আনা উচিত।

বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধ—এই তিন ক্ষেত্রেই কীটনাশক শিল্পের স্থানীয় বিকাশ অপরিহার্য। কিন্তু চলতি বাজেটে ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের পরিবেশ নষ্ট করে আমদানিকারকদের জন্য ‘কমফোর্ট জোন’ তৈরি করেছে। ভারতীয় অভিজ্ঞতা দেখায়, উচ্চ শুল্ক ও ঘরোয়া উদ্ভাবনে অর্থনীতি, শিল্প ও জনস্বাস্থ্যে একযোগে ইতিবাচক ফল মেলে। ওষুধনীতির সাফল্য আমাদের পথ দেখিয়েছে; এবার সময় সমন্বিত ‘কীটনাশক শিল্পনীতি’ প্রণয়নের—যাতে ২০৩০-এর মধ্যেই প্রয়োজনীয় রাসায়নিকের ৯৭ শতাংশ দেশেই উৎপাদিত হয়ে কৃষক, ভোক্তা ও রাষ্ট্র—সকলেই লাভবান হতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

“ভয়েস এআই বাজারে ডিপগ্রামের তেজি অগ্রযাত্রা”

পোকা মারতে ডলার মার: আমদানি-বান্ধব বাজেট কি সত্যিই কৃষক-বান্ধব?

০৬:২১:০৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৮ জুন ২০২৫

পোকামাকড় ও রোগ-জীবাণুর বহুমুখী চাপ

বাংলাদেশের খাদ্য-স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও জনস্বাস্থ্য—দুটিই ক্রমবর্ধমানভাবে পোকামাকড় ও বাহক-মশার হুমকিতে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO)-র সমীক্ষায় দেখা যায়, ২০০৮-১৮ সময়কালে বিশ্বব্যাপী ফসল ও পশু উৎপাদনের প্রায় ৯ শতাংশ নষ্ট হয়েছে নানা জীববৈচিত্র্য-জনিত আক্রমণে; দক্ষিণ এশিয়ায় হারটি আরও বেশি। একই সঙ্গে ২০২৪ সালে ডেঙ্গুতে ১ লাখের বেশি আক্রান্ত ও ৫৭৫টি মৃত্যু বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার ‘হটস্পট’ হিসেবে স্পষ্ট করেছে। এ বছর ডেঙ্গু ব্যাপক আকারে ছড়াচ্ছে দেশের প্রত্যন্ত এলাকায়। এই দুই বাস্তবতা কীটনাশক সরবরাহকে কেবল কৃষকেরই নয়, শহর-গ্রামের প্রতিটি পরিবারের অপরিহার্য চাহিদায় পরিণত করেছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ৪০ কমিশনার বদলি

বাজেট ২০২৫-২৬: শুল্ক ২৫ থেকে ৫ শতাংশে নামিয়ে কার লাভ?

গত বছরের সংশোধিত শুল্ক কাঠামোয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কীটনাশক আমদানির শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে নামিয়ে নিয়েছে—পেঁয়াজ ও আলুর বিপরীতে একই ছাড়ের তালিকায় এর উল্লেখ আছে। সদ্য প্রকাশিত কাস্টমস ট্যারিফ বুকেও ৫ শতাংশ ‘বেসিক ডিউটি’ বহাল রয়েছে। নীতিপ্রণেতাদের যুক্তি, দাম কমলে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমবে। কিন্তু বাস্তবে শুল্ক-ছাড়ে সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী হয়েছেন আমদানিকারক ও তাঁদের বিদেশি সরবরাহকারী; দেশীয় উৎপাদকদের প্রতিযোগিতা কঠিন হয়েছে।

বাজারের চিত্র: ৩৬০ মিলিয়ন ডলারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা

২০২৪ সালে বাংলাদেশি কীটনাশক বাজার ১৩ শতাংশ বেড়ে ৩৬০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। গবেষণা সংস্থা 6Wresearch-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫-৩১ সময়কালে বার্ষিক চাহিদা বেশি থাকবে। অথচ বাজারের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই এখনো আমদানিনির্ভর—যার বেশির ভাগ আসে চীন ও ভারত থেকে; ফলে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ বাড়ছে।

দেশে যেসব কারখানা এগিয়ে: সুযোগ ও সীমাবদ্ধতা

দেশে অনেকগুলো কোম্পানি প্রযুক্তিসমৃদ্ধ প্ল্যান্ট গড়ে তুলেছে। একটি বড় কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে—দেশীয় বাজারের পাশাপাশি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলো আফ্রিকা-মধ্যপ্রাচ্যেও বাজার খুঁজছে। কিন্তু উৎপাদন প্রচলিত ‘টোল-ম্যানুফ্যাকচারিং’-এ সীমিত; কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চ জটিলতার পাশাপাশি ‘মাঠ-টেস্ট’ বাধ্যতামূলক হওয়ায় পণ্যে দ্রুত বৈচিত্র্য আনা কঠিন।

খাদ্য নিরাপত্তা ও উৎপাদন বাড়ানোর উপায়

সার ও বালাইনাশক ব্যবহার ছাড়া উচ্চ ফলন ভাবাই যায় না। ২০১০-এর পর বাংলাদেশ ধান-গমের পাশাপাশি ফল, শাক-সবজি ও মসলার বিস্তৃত উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে; তবে কীট-পতঙ্গমুক্তকরণ নিশ্চিত না হলে ফলন থেকে ভোক্তা—দুই পর্যায়েই অপচয় বাড়ে। FAO-র জরিপ দেখায়, এশিয়ায় অনিয়ন্ত্রিত পোকামাকড়ে ফসলহানি গড়ে ২০ শতাংশের কাছাকাছি। স্বাস্থ্যকর, অবশিষ্টাংশ-নিয়ন্ত্রিত (MRL) কীটনাশক দেশেই উৎপাদন করলে মান নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়; রপ্তানি ক্ষেত্রেও ‘ফুড সেফটি সনদ’ পেতে সহায়ক।

জনস্বাস্থ্য ও নগর জীবনে রোধ-ব্যবস্থা

ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়ার মতো রোগ-বাহক মশা নির্মূলে অতিদ্রুত ও কার্যকর লার্ভিসাইড-এয়ারোসলের প্রয়োজন বাড়ছে। ২০২৩-২৪-এর রেকর্ড ডেঙ্গু-মৃত্যুর পর বিশেষজ্ঞরা ‘সারা বছর নজরদারি’র ওপর জোর দিচ্ছেন। নির্ভরযোগ্য উৎপাদক কম থাকায় সিটি করপোরেশনগুলোর সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত হয় না; অনেক ক্ষেত্রেই নিম্নমানের আমদানি-কীটনাশকে মশা মরে না—ফলে জনস্বাস্থ্যে দ্বিগুণ খরচ পড়ে।

আন্তর্জাতিক তুলনা: ভারতীয় মেক-ইন-ইন্ডিয়া’ মডেল

ভারত ২০২৪-২৫ বাজেটে কীটনাশক ফর্মুলেশনের আমদানি শুল্ক ১০ থেকে ১৫ শতাংশে তুলেছে। রপ্তানি-মুখী কৃষি-রসায়ন শিল্প গড়তে সরকার জিএসটি ছাড়, দ্রুত লাইসেন্স ও গবেষণাভর্তুকি দিয়েছে। বাংলাদেশে উল্টো চিত্র—৫ শতাংশ শুল্ক, কঠোর মান-টেস্ট না থাকায় কমদামী পণ্য বাজার প্লাবিত করে; স্থানীয় প্রতিষ্ঠান মূলধন বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হয়।

অর্থনৈতিক সুফল বনাম সম্ভাব্য ক্ষতি

  • বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়: প্রয়োজনীয়তার ৫০ শতাংশ দেশেই উৎপাদিত হলে বছরে অন্তত ১৫০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় রক্ষা সম্ভব।
    •কর্মসংস্থান: গড়ে প্রতি ১ কোটি টাকার মূলধনে ২৫-৩০টি সরাসরি ও ৫০টি পরোক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হয়—রিয়েল-এস্টেট ফিটিংস শিল্পের মতো সম্ভাবনা নষ্ট না করার সতর্কবার্তা প্রযোজ্য।
    • রপ্তানি সম্ভাবনা: ওষুধ খাতে ১১৩টি দেশে পণ্য পাঠানোর অভিজ্ঞতা দেখায়, সঠিক নীতি হলে কীটনাশকও দক্ষিণ-এশিয়া-আফ্রিকায় রপ্তানিযোগ্য।
    • স্বাস্থ্য-সামাজিক ঝুঁকি: অবাধ আমদানিতে মানহীন রাসায়নিক ঢুকলে খাদ্য-শৃঙ্খলে অবশিষ্টাংশ, পরিবেশ-দূষণ ও অ্যান্টি-ডাম্পিং ঝুঁকি বাড়ে। নিয়ন্ত্রিত স্থানীয় উৎপাদনে ‘গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস’ (GMP) কার্যকর করা সহজ।

কেমন ছিল বাংলাদেশের ৫৩ বাজেট

নীতিগত সুপারিশ

  • ধীরে ধীরে শুল্ক সমন্বয়: অবিলম্বে ১৫ শতাংশ ‘বেসিক ডিউটি’ ও ৫ শতাংশ রেগুলেটরি কর আরোপ করে স্থানীয় কারখানাকে শ্বাসফেলার সময় দিতে হবে।
  • কাঁচামাল উৎস উন্মুক্ত: ওষুধ খাতের মতো বন্দরে নয়—কারখানায় দ্রুত ল্যাব-টেস্ট চালু করে ডেমারেজ কমাতে হবে।
  • বায়োপেস্টিসাইড গবেষণা ভর্তুকি: বিশ্ব বাজারে জৈব-কীটনাশকের প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের বেশি; বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয়-কারখানা যৌথ প্রকল্পে উদ্ভাবন ত্বরান্বিত করা দরকার।
  • মাঠ-টেস্ট পুনর্বিবেচনা: একই অ্যাগ্রো-ক্লিম্যাটিক জোনে একাধিকবার টেস্ট বাধ্যতামূলক না করে WHO-AQIS-সিদ্ধ ফলাফল গ্রহণযোগ্য করলে পণ্য বাজারে আনতে সময় কমবে।
  • বহুমাত্রিক নজরদারি: ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মতো একটি ‘কীটনাশক নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ’ গঠন করে আমদানির প্রতিটি চালানকে MRL ও পরিবেশ-প্রভাব পরীক্ষার আওতায় আনা উচিত।

বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধ—এই তিন ক্ষেত্রেই কীটনাশক শিল্পের স্থানীয় বিকাশ অপরিহার্য। কিন্তু চলতি বাজেটে ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের পরিবেশ নষ্ট করে আমদানিকারকদের জন্য ‘কমফোর্ট জোন’ তৈরি করেছে। ভারতীয় অভিজ্ঞতা দেখায়, উচ্চ শুল্ক ও ঘরোয়া উদ্ভাবনে অর্থনীতি, শিল্প ও জনস্বাস্থ্যে একযোগে ইতিবাচক ফল মেলে। ওষুধনীতির সাফল্য আমাদের পথ দেখিয়েছে; এবার সময় সমন্বিত ‘কীটনাশক শিল্পনীতি’ প্রণয়নের—যাতে ২০৩০-এর মধ্যেই প্রয়োজনীয় রাসায়নিকের ৯৭ শতাংশ দেশেই উৎপাদিত হয়ে কৃষক, ভোক্তা ও রাষ্ট্র—সকলেই লাভবান হতে পারে।