০১:৪২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬
নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অলির গ্রেপ্তার: জেন-জি বিক্ষোভে মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত জোরদার জাভার উপকূল ভাঙনে বিপর্যয়, ৮০ বিলিয়ন ডলারের সমুদ্রপ্রাচীর পরিকল্পনায় ইন্দোনেশিয়া কে-পপ ডেমন হান্টার্স সিক্যুয়েল নিশ্চিত: পরিচালক ও নেটফ্লিক্স আবারও একসঙ্গে  নাসার মঙ্গল রোভার এআই দিয়ে প্রথমবার স্বায়ত্তশাসিত অভিযান সম্পন্ন করল ইউরোপের ২০ বিলিয়ন ইউরোর ‘ডিজিটাল বিচ্ছেদ’: মার্কিন প্রযুক্তি থেকে দূরত্ব নিচ্ছে ইইউ ডেনমার্কে হঠাৎ নির্বাচন: গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পকে রুখে দিয়ে জনপ্রিয়তা পেলেন প্রধানমন্ত্রী ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার বাল্টিক তেল রপ্তানির ৪০ শতাংশ বন্ধ ট্রাম্প হরমুজের সময়সীমা ৬ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ালেন, পেন্টাগন স্থল অভিযান বিবেচনা করছে  ইরান যুদ্ধ নিয়ে জি৭ বৈঠক: রুবিও মিত্রদের একজোট করতে প্যারিসে হবিগঞ্জে গিয়াস উদ্দিন তাহেরীর মাহফিলকে কেন্দ্র করে ১৪৪ ধারা জারি

কীভাবে সিঙ্গাপুরকে ‘তৃতীয় চীন’ হওয়া থেকে রক্ষা করেছিলেন—লি কুয়ান

স্বনামধন্য সাংবাদিক ও সাবেক দ্য স্ট্রেইটস টাইমস-এর সম্পাদক চিয়ং ইয়িপ সেং-এর নতুন স্মৃতিকথা Ink and Influence: An OB Markers Sequel-এ তিনি রাজনীতি, গণমাধ্যম এবং জাতীয় পরিচয়ের জটিল ছকে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। ১৯৭৬ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউয়ের (এলকেওয়াই) চীন সফরের একটি ঘটনা সে স্মৃতিকথার গুরুত্বপূর্ণ অংশ—যেখানে সিঙ্গাপুরের স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট করতে লি কুয়ানকে সামান্য এক কৌশলেই চীনকে খাটো করেন।

বেইজিং১৯৭৬: এক কূটনৈতিক দৃষ্টান্ত

চীন সফরের আলোচনায় স্বাগতিকেরা লি কুয়ানকে উপহার দেন নেভিল ম্যাক্সওয়েলের India’s China War—ভারত-চীন সীমান্তযুদ্ধের একপেশে, চীনপন্থী বিবরণ। বই হাতে নিয়েই লি কুয়ান বলেছিলেন, “এটা আপনাদের দৃষ্টিভঙ্গি; যুদ্ধের আরেকটি কাহিনি আছে।” বইটি পাশে রেখে তিনি বুঝিয়ে দেন, সিঙ্গাপুর কোনও শিবিরে না গিয়ে নিজস্ব পথেই চলবে, আর বহুত্ববাদই তার ভিত্তি। প্রতিনিধি দলের সদস্য এস. আর. নাথন পরে বলেছিলেন, “প্রধানমন্ত্রীর সেই উত্তর আমাকে গর্বিত করেছিল।”

তৃতীয় চীন’ তত্ত্ব ভেঙে বহুত্ববাদী পরিচয় গড়া

সিঙ্গাপুরের জনসংখ্যার প্রায় তিন-চতুর্থাংশই জাতিগত চীনা। তাই ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার কিছু মহল থেকে সিঙ্গাপুরকে ‘তৃতীয় চীন’ বলে সন্দেহ করা হতো। লি কুয়ান বুঝতেন, এই ধারণা না ভাঙতে পারলে অঞ্চলজুড়ে অবিশ্বাস জন্মাবে। তাই তিনি জোর দিয়েছিলেন—সিঙ্গাপুর একটি বহু জাতিগোষ্ঠীর সার্বভৌম রাষ্ট্র; জাতিগত শিকড় নয়, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যই সর্বাগ্রে।

বিদেশি প্রভাব ঠেকাতে আইন

সিঙ্গাপুর ২০২১ সালে Foreign Interference (Countermeasures) Act পাস করে, যার আওতায় বিদেশি শক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় ‘রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ চিহ্নিত করা হয়। ২০২৪ সালে হংকং-জন্ম নেওয়া এক সিঙ্গাপুরি ব্যবসায়ী প্রথম এ আইনের অধীনে মনোনীত হন—কারণ তিনি বেইজিংয়ের বার্ষিক রাজনৈতিক সম্মেলনে গিয়ে প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, “প্রত্যেক জাতিগত চীনার দায়িত্ব—চীনকে তার গল্প বলায় সাহায্য করা।” এ ধরনের আইন দেখায় যে বহুজাতিক সিঙ্গাপুর নিজস্ব কণ্ঠস্বর রক্ষা করতে কতটা সতর্ক।

গণমাধ্যমে নিরপেক্ষতা: ২০০৫ সালের ঘটনা

২০০৫-এ প্রধানমন্ত্রী লি সিয়েন লুং দ্য স্ট্রেইটস টাইমস-এর শীর্ষ সম্পাদকদের ইস্তানায় তলব করেন। কারণ, চীনা দৈনিক লিয়ানহে ঝাওবাও-তে প্রকাশিত তিনটি প্রতিবেদনে তাঁর চোখে ‘অতিরিক্ত চীনপ্রীতি’ ধরা পড়েছিল; তার একটি আবার চীনা মূলভূমি থেকে আসা সাংবাদিকের লেখা। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, এমন ঢালাও পক্ষপাত সিঙ্গাপুরের নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতিকে খর্ব করবে।

সাংবাদিকতার ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি

চিয়ং ইয়িপ সেং বলেন, ১৯৭৪-এ প্রথম সম্পাদক হওয়ার পর থেকেই তিনি সংবাদ বাছাইয়ে ভূ-রাজনীতি মাথায় রাখতেন—কোন খবর দরকার, কীভাবে উপস্থাপন করা হবে, কোন প্রসঙ্গ বাড়িয়ে নেওয়া জরুরি। তাঁর মতে, পাঠকসেবায় এটাই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি, যা লি কুয়ান নিজের জীবন দিয়ে দেখিয়েছেন।

শ্রীলঙ্কা: জাতিগত রাজনীতির করুণ অধ্যায়

লি কুয়ান প্রায়ই শ্রীলঙ্কাকে উদাহরণ দিতেন—যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলীরা ভাষা ও শিক্ষায় সংখ্যালঘু তামিলদের বঞ্চিত করে বিদ্বেষের ডালি সাজায়। ফল: ১৯৮৩-২০০৯ গৃহযুদ্ধে এক লাখ প্রাণহানি এবং দেশজুড়ে ধ্বংসস্তূপ। ২০২৪-এ সিঙ্গাপুর প্রেস ক্লাবের সফরে চিয়ং ইয়িপ সেং জাফনার সাবেক তামিল টাইগার সদর দপ্তর দেখতে গিয়ে দেখেন, সেখানে এখনও যুদ্ধের ক্ষত বয়ে চলেছে। শ্রীলঙ্কা তাই সিঙ্গাপুরের জন্য সতর্কবার্তা—জাতিগত কার্ড খেললে উন্নয়নও ধ্বংস হতে পারে।

লি কুয়ানের তিন শক্তি

বিশাল তথ্যভান্ডার—ভ্রমণ, বিশ্বনেতাদের সঙ্গে আলাপ এবং বইপত্র থেকে সংগৃহীত তথ্য।
ভূ-রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি—অনেক আগেই ‘ডট-জোড়া’ কৌশলে তিনি বুঝতেন কোনো পথে এগোলে সিঙ্গাপুর লাভবান হবে।
অদম্য শেখার তৃষ্ণা—মৃত্যুর আগের মাসগুলোতেও তাঁর দৈনিক ম্যান্ডারিন ক্লাস বন্ধ হয়নি।

লি কুয়ান ইউয়ের দৃঢ় অবস্থান সিঙ্গাপুরকে ‘তৃতীয় চীন’ হওয়া থেকে রক্ষা করেছে এবং বহুত্ববাদী, সার্বভৌম সিঙ্গাপুরের পরিচয় মজবুত করেছে। আজও দেশটি বিদেশি প্রভাবের ঝুঁকি মোকাবিলায় কঠোর আইনকাঠামো ও মিডিয়া সতর্কতার পথ বেছে নিয়েছে। লি কুয়ান শিক্ষা স্পষ্ট—পররাষ্ট্রনীতি ও অভ্যন্তরীণ নীতি, উভয়ক্ষেত্রেই জাতিগত ভারসাম্য এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো আপস নেই।

জনপ্রিয় সংবাদ

নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অলির গ্রেপ্তার: জেন-জি বিক্ষোভে মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত জোরদার

কীভাবে সিঙ্গাপুরকে ‘তৃতীয় চীন’ হওয়া থেকে রক্ষা করেছিলেন—লি কুয়ান

১১:০০:৩৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ৭ জুলাই ২০২৫

স্বনামধন্য সাংবাদিক ও সাবেক দ্য স্ট্রেইটস টাইমস-এর সম্পাদক চিয়ং ইয়িপ সেং-এর নতুন স্মৃতিকথা Ink and Influence: An OB Markers Sequel-এ তিনি রাজনীতি, গণমাধ্যম এবং জাতীয় পরিচয়ের জটিল ছকে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। ১৯৭৬ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউয়ের (এলকেওয়াই) চীন সফরের একটি ঘটনা সে স্মৃতিকথার গুরুত্বপূর্ণ অংশ—যেখানে সিঙ্গাপুরের স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট করতে লি কুয়ানকে সামান্য এক কৌশলেই চীনকে খাটো করেন।

বেইজিং১৯৭৬: এক কূটনৈতিক দৃষ্টান্ত

চীন সফরের আলোচনায় স্বাগতিকেরা লি কুয়ানকে উপহার দেন নেভিল ম্যাক্সওয়েলের India’s China War—ভারত-চীন সীমান্তযুদ্ধের একপেশে, চীনপন্থী বিবরণ। বই হাতে নিয়েই লি কুয়ান বলেছিলেন, “এটা আপনাদের দৃষ্টিভঙ্গি; যুদ্ধের আরেকটি কাহিনি আছে।” বইটি পাশে রেখে তিনি বুঝিয়ে দেন, সিঙ্গাপুর কোনও শিবিরে না গিয়ে নিজস্ব পথেই চলবে, আর বহুত্ববাদই তার ভিত্তি। প্রতিনিধি দলের সদস্য এস. আর. নাথন পরে বলেছিলেন, “প্রধানমন্ত্রীর সেই উত্তর আমাকে গর্বিত করেছিল।”

তৃতীয় চীন’ তত্ত্ব ভেঙে বহুত্ববাদী পরিচয় গড়া

সিঙ্গাপুরের জনসংখ্যার প্রায় তিন-চতুর্থাংশই জাতিগত চীনা। তাই ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার কিছু মহল থেকে সিঙ্গাপুরকে ‘তৃতীয় চীন’ বলে সন্দেহ করা হতো। লি কুয়ান বুঝতেন, এই ধারণা না ভাঙতে পারলে অঞ্চলজুড়ে অবিশ্বাস জন্মাবে। তাই তিনি জোর দিয়েছিলেন—সিঙ্গাপুর একটি বহু জাতিগোষ্ঠীর সার্বভৌম রাষ্ট্র; জাতিগত শিকড় নয়, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যই সর্বাগ্রে।

বিদেশি প্রভাব ঠেকাতে আইন

সিঙ্গাপুর ২০২১ সালে Foreign Interference (Countermeasures) Act পাস করে, যার আওতায় বিদেশি শক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় ‘রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ চিহ্নিত করা হয়। ২০২৪ সালে হংকং-জন্ম নেওয়া এক সিঙ্গাপুরি ব্যবসায়ী প্রথম এ আইনের অধীনে মনোনীত হন—কারণ তিনি বেইজিংয়ের বার্ষিক রাজনৈতিক সম্মেলনে গিয়ে প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, “প্রত্যেক জাতিগত চীনার দায়িত্ব—চীনকে তার গল্প বলায় সাহায্য করা।” এ ধরনের আইন দেখায় যে বহুজাতিক সিঙ্গাপুর নিজস্ব কণ্ঠস্বর রক্ষা করতে কতটা সতর্ক।

গণমাধ্যমে নিরপেক্ষতা: ২০০৫ সালের ঘটনা

২০০৫-এ প্রধানমন্ত্রী লি সিয়েন লুং দ্য স্ট্রেইটস টাইমস-এর শীর্ষ সম্পাদকদের ইস্তানায় তলব করেন। কারণ, চীনা দৈনিক লিয়ানহে ঝাওবাও-তে প্রকাশিত তিনটি প্রতিবেদনে তাঁর চোখে ‘অতিরিক্ত চীনপ্রীতি’ ধরা পড়েছিল; তার একটি আবার চীনা মূলভূমি থেকে আসা সাংবাদিকের লেখা। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, এমন ঢালাও পক্ষপাত সিঙ্গাপুরের নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতিকে খর্ব করবে।

সাংবাদিকতার ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি

চিয়ং ইয়িপ সেং বলেন, ১৯৭৪-এ প্রথম সম্পাদক হওয়ার পর থেকেই তিনি সংবাদ বাছাইয়ে ভূ-রাজনীতি মাথায় রাখতেন—কোন খবর দরকার, কীভাবে উপস্থাপন করা হবে, কোন প্রসঙ্গ বাড়িয়ে নেওয়া জরুরি। তাঁর মতে, পাঠকসেবায় এটাই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি, যা লি কুয়ান নিজের জীবন দিয়ে দেখিয়েছেন।

শ্রীলঙ্কা: জাতিগত রাজনীতির করুণ অধ্যায়

লি কুয়ান প্রায়ই শ্রীলঙ্কাকে উদাহরণ দিতেন—যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলীরা ভাষা ও শিক্ষায় সংখ্যালঘু তামিলদের বঞ্চিত করে বিদ্বেষের ডালি সাজায়। ফল: ১৯৮৩-২০০৯ গৃহযুদ্ধে এক লাখ প্রাণহানি এবং দেশজুড়ে ধ্বংসস্তূপ। ২০২৪-এ সিঙ্গাপুর প্রেস ক্লাবের সফরে চিয়ং ইয়িপ সেং জাফনার সাবেক তামিল টাইগার সদর দপ্তর দেখতে গিয়ে দেখেন, সেখানে এখনও যুদ্ধের ক্ষত বয়ে চলেছে। শ্রীলঙ্কা তাই সিঙ্গাপুরের জন্য সতর্কবার্তা—জাতিগত কার্ড খেললে উন্নয়নও ধ্বংস হতে পারে।

লি কুয়ানের তিন শক্তি

বিশাল তথ্যভান্ডার—ভ্রমণ, বিশ্বনেতাদের সঙ্গে আলাপ এবং বইপত্র থেকে সংগৃহীত তথ্য।
ভূ-রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি—অনেক আগেই ‘ডট-জোড়া’ কৌশলে তিনি বুঝতেন কোনো পথে এগোলে সিঙ্গাপুর লাভবান হবে।
অদম্য শেখার তৃষ্ণা—মৃত্যুর আগের মাসগুলোতেও তাঁর দৈনিক ম্যান্ডারিন ক্লাস বন্ধ হয়নি।

লি কুয়ান ইউয়ের দৃঢ় অবস্থান সিঙ্গাপুরকে ‘তৃতীয় চীন’ হওয়া থেকে রক্ষা করেছে এবং বহুত্ববাদী, সার্বভৌম সিঙ্গাপুরের পরিচয় মজবুত করেছে। আজও দেশটি বিদেশি প্রভাবের ঝুঁকি মোকাবিলায় কঠোর আইনকাঠামো ও মিডিয়া সতর্কতার পথ বেছে নিয়েছে। লি কুয়ান শিক্ষা স্পষ্ট—পররাষ্ট্রনীতি ও অভ্যন্তরীণ নীতি, উভয়ক্ষেত্রেই জাতিগত ভারসাম্য এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো আপস নেই।