০৮:১৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত ভারতের বিএসএফ ২,৩৬৯ জনকে বাংলাদেশে পুশ-ইন করেছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মসজিদের জন্য মাইক কিনতে গিয়ে প্রাণ গেল দুই ভাইয়ের সিন্ধু পানি চুক্তি: আইনের শাসন নাকি উজানের একতরফা ক্ষমতা? অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ, অধিনায়ক হিসেবে নতুন দায়িত্বে হৃদয় ভারতে থমকে থাকা মৌসুমী বৃষ্টি, বৃষ্টির ঘাটতি ৩৫ শতাংশ; কৃষিতে সতর্কতা জোরদার রাম মন্দিরের অনুদান কেলেঙ্কারি নিয়ে তোলপাড়, উচ্চ আদালতের বিচারকের তত্ত্বাবধানে তদন্ত দাবি কংগ্রেসের তৃণমূলে শক্তি প্রদর্শন রিতব্রতের, সমর্থন বেড়ে ৬৫ বিধায়ক দাবি; ফ্লোর টেস্টের চ্যালেঞ্জ তৃণমূলে ভাঙনের জল্পনা, বিদ্রোহী এমপিদের আবেদনে অবস্থান ব্যাখ্যার আহ্বান স্পিকারের ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ মহিষ এখন ঢাকার চিড়িয়াখানায়, বিশ্বজুড়ে ভাইরাল বাংলাদেশের অ্যালবিনো মহিষ বিটিএস-মাডোনা-শাকিরা একসঙ্গে, বিশ্বকাপ ফাইনালে ইতিহাসের প্রথম হাফটাইম শো

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা (পর্ব-২২০)

  • Sarakhon Report
  • ১১:০০:০৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৫
  • 184

দীনেশচন্দ্র

তাঁহাকে প্রায় সব সময়েই কোনো কিছু লিখিতে দেখা যাইত। লোকজনের সঙ্গে তিনি কথাবার্তা বলিতেন, আবার সেই সঙ্গে তিনি বই পুস্তকও লিখিতেন। ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’র ইংরেজি অনুবাদ, ‘বৃহৎবঙ্গের’ পান্ডুলিপিগুলি তিনি এইভাবে প্রস্তুত করিয়াছিলেন।

বই-পুস্তকের মধ্যে তাঁহার সেই গভীর ধ্যানস্থ মূর্তি আজও যেন ছবির মতো আমার চক্ষুর সম্মুখে ভাসিতেছে। জ্ঞানপথের এত বড় একনিষ্ঠ সাধক আর কোথাও দেখি নাই। তাঁহার বিরাট ‘বৃহৎবঙ্গ’ পুস্তকখানা প্রায় দীর্ঘ তিন বৎসরে তিনি সম্পূর্ণ করিয়াছেন। এই সময়ের মধ্যে তাঁহার দৌহিত্রদের ভীষণ মরণাপন্ন অসুখ হইয়াছে। একজনের মৃত্যুও হইয়াছে। তাঁহার স্ত্রী মৃত্যুর কোলে ঢলিয়া পড়িয়াছেন। এই সমস্ত দুঃসময়েও দেখিয়াছি তিনি পূর্বের মতোই সকাল হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত একাগ্রমনে বসিয়া ‘বৃহৎবঙ্গের’ পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করিতেছেন। এই ছবি জীবনে কোনো দিনই ভুলিতে পারিব না।

‘ময়মনসিংহ গীতিকা’ সংগ্রহ করিতে যাইয়া আমার মনে সন্দেহের উদয় হইল, এগুলি গ্রামে যেভাবে গাওয়া হয় যথাযথ সেই ভাবেই সংগ্রহ করা হয় নাই। গীতিকা-সংগ্রাহক

উহার উপর কিছু রং চড়াইয়াছেন। এই কথা আমি দুই এক জন বন্ধু-বান্ধবের নিকট আলোচনা করি। তাহা দীনেশবাবুর কানে যায়। দীনেশবাবু আমাকে এ বিষয়ে জবাবদিহি করিতে পত্র লিখিলেন।

আমি তখন সবেমাত্র ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’ সংগ্রহের ভার পাইয়াছি। দীনেশবাবুর পত্র পাইয়া আমার মাথায় আকাশ ভাঙিয়া পড়িল। সত্য কথা বলিলে দীনেশবাবু নিশ্চয় আমাকে এ কার্যে আর রাখিবেন না। আমি চারিদিন নির্জনে বসিয়া চিন্তা করিলাম। তখনকার ছেলেমানুষির কথা ভাবিলে এখন হাসি পায়। গ্রাম্য ফকিরদের বৈঠকে বসিয়া কত প্রার্থনা করিলাম। তারপর দীনেশবাবুকে আগাগোড়া সব কথা খুলিয়া লিখিলাম। দীনেশবাবু আমার বিরুদ্ধে কোনো কিছু করিলেন না। তিনি শুধু লিখিলেন, “এ বিষয়ে তোমার ধারণা ভুল। পরে বুঝিতে পারিবে।”

মাঝে মাঝে আমি বন্ধু-বান্ধবদের বলিয়াছি, “দীনেশবাবুর মৃত্যুর পর ময়মনসিংহ গীতিকা সংগ্রহের গলদগুলি নিয়ে আলোচনা করব। তিনি আমার জীবনে সবচাইতে উপকারী বন্ধু, তিনি দুঃখ পান এমন কোনো কাজ তিনি জীবিত থাকতে আমি করব না।” এই খবর লোকমুখে শুনিয়া কবি কালিদাস রায়কে তিনি বলিয়াছিলেন, “জসীম মনে করেছে আমার মৃত্যুর পর সে ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’র বিরুদ্ধে সমালোচনা করবে। আমি মরলে এই বাঙলা দেশেই আবার ফিরে আসব। এই দেশের চাইতে সুন্দরতর স্বর্গ কোনো দিনই আমি কামনা করিনি। দেহের দিক দিয়ে হয়তো আমার মৃত্যু হবে, কিন্তু মনের দিক দিয়ে এই বাংলা দেশ ছেড়ে আমি আর কোথাও যাব না।”

আজ দীনেশবাবু আমাদের মধ্যে আর নাই। তাঁহার আত্মা হয়তো বাঙলা দেশ ছাড়িয়া আর কোনো স্বর্গলোকেই বিরাজ করিতেছেন। তাঁহার মৃত্যুতে বাঙলা দেশের যে ক্ষতি হইল, বাংলাসাহিত্য গগনে একদা নূতন নক্ষত্রের উদয় হইয়া সেই ক্ষতির হয়তো কতকটা পূরণ হইবে, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে আমি যাহা হারাইলাম তাহা আর কোনো দিনই পাইব না।

 

চলবে…..

জনপ্রিয় সংবাদ

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত ভারতের বিএসএফ ২,৩৬৯ জনকে বাংলাদেশে পুশ-ইন করেছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা (পর্ব-২২০)

১১:০০:০৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৫

দীনেশচন্দ্র

তাঁহাকে প্রায় সব সময়েই কোনো কিছু লিখিতে দেখা যাইত। লোকজনের সঙ্গে তিনি কথাবার্তা বলিতেন, আবার সেই সঙ্গে তিনি বই পুস্তকও লিখিতেন। ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’র ইংরেজি অনুবাদ, ‘বৃহৎবঙ্গের’ পান্ডুলিপিগুলি তিনি এইভাবে প্রস্তুত করিয়াছিলেন।

বই-পুস্তকের মধ্যে তাঁহার সেই গভীর ধ্যানস্থ মূর্তি আজও যেন ছবির মতো আমার চক্ষুর সম্মুখে ভাসিতেছে। জ্ঞানপথের এত বড় একনিষ্ঠ সাধক আর কোথাও দেখি নাই। তাঁহার বিরাট ‘বৃহৎবঙ্গ’ পুস্তকখানা প্রায় দীর্ঘ তিন বৎসরে তিনি সম্পূর্ণ করিয়াছেন। এই সময়ের মধ্যে তাঁহার দৌহিত্রদের ভীষণ মরণাপন্ন অসুখ হইয়াছে। একজনের মৃত্যুও হইয়াছে। তাঁহার স্ত্রী মৃত্যুর কোলে ঢলিয়া পড়িয়াছেন। এই সমস্ত দুঃসময়েও দেখিয়াছি তিনি পূর্বের মতোই সকাল হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত একাগ্রমনে বসিয়া ‘বৃহৎবঙ্গের’ পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করিতেছেন। এই ছবি জীবনে কোনো দিনই ভুলিতে পারিব না।

‘ময়মনসিংহ গীতিকা’ সংগ্রহ করিতে যাইয়া আমার মনে সন্দেহের উদয় হইল, এগুলি গ্রামে যেভাবে গাওয়া হয় যথাযথ সেই ভাবেই সংগ্রহ করা হয় নাই। গীতিকা-সংগ্রাহক

উহার উপর কিছু রং চড়াইয়াছেন। এই কথা আমি দুই এক জন বন্ধু-বান্ধবের নিকট আলোচনা করি। তাহা দীনেশবাবুর কানে যায়। দীনেশবাবু আমাকে এ বিষয়ে জবাবদিহি করিতে পত্র লিখিলেন।

আমি তখন সবেমাত্র ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’ সংগ্রহের ভার পাইয়াছি। দীনেশবাবুর পত্র পাইয়া আমার মাথায় আকাশ ভাঙিয়া পড়িল। সত্য কথা বলিলে দীনেশবাবু নিশ্চয় আমাকে এ কার্যে আর রাখিবেন না। আমি চারিদিন নির্জনে বসিয়া চিন্তা করিলাম। তখনকার ছেলেমানুষির কথা ভাবিলে এখন হাসি পায়। গ্রাম্য ফকিরদের বৈঠকে বসিয়া কত প্রার্থনা করিলাম। তারপর দীনেশবাবুকে আগাগোড়া সব কথা খুলিয়া লিখিলাম। দীনেশবাবু আমার বিরুদ্ধে কোনো কিছু করিলেন না। তিনি শুধু লিখিলেন, “এ বিষয়ে তোমার ধারণা ভুল। পরে বুঝিতে পারিবে।”

মাঝে মাঝে আমি বন্ধু-বান্ধবদের বলিয়াছি, “দীনেশবাবুর মৃত্যুর পর ময়মনসিংহ গীতিকা সংগ্রহের গলদগুলি নিয়ে আলোচনা করব। তিনি আমার জীবনে সবচাইতে উপকারী বন্ধু, তিনি দুঃখ পান এমন কোনো কাজ তিনি জীবিত থাকতে আমি করব না।” এই খবর লোকমুখে শুনিয়া কবি কালিদাস রায়কে তিনি বলিয়াছিলেন, “জসীম মনে করেছে আমার মৃত্যুর পর সে ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’র বিরুদ্ধে সমালোচনা করবে। আমি মরলে এই বাঙলা দেশেই আবার ফিরে আসব। এই দেশের চাইতে সুন্দরতর স্বর্গ কোনো দিনই আমি কামনা করিনি। দেহের দিক দিয়ে হয়তো আমার মৃত্যু হবে, কিন্তু মনের দিক দিয়ে এই বাংলা দেশ ছেড়ে আমি আর কোথাও যাব না।”

আজ দীনেশবাবু আমাদের মধ্যে আর নাই। তাঁহার আত্মা হয়তো বাঙলা দেশ ছাড়িয়া আর কোনো স্বর্গলোকেই বিরাজ করিতেছেন। তাঁহার মৃত্যুতে বাঙলা দেশের যে ক্ষতি হইল, বাংলাসাহিত্য গগনে একদা নূতন নক্ষত্রের উদয় হইয়া সেই ক্ষতির হয়তো কতকটা পূরণ হইবে, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে আমি যাহা হারাইলাম তাহা আর কোনো দিনই পাইব না।

 

চলবে…..