০৬:৫১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬
ইসরায়েলের ‘শিরশ্ছেদ’ কৌশলে ফাটল? ইরানে নেতৃত্ব হত্যা বাড়ালেও জোরদার হচ্ছে কঠোরপন্থা বাব আল-মান্দাব প্রণালী দখল সহজ হবে, দাবি হুথিদের ভারতের ডাল আমদানি চুক্তি ৫ বছর বাড়ছে, মিয়ানমারের ওপর নির্ভরতা বাড়ল খার্গ দ্বীপ ঘিরে উত্তেজনা, স্থলযুদ্ধ হলে শত্রুর জন্য ‘ব্যয়বহুল ও বিপজ্জনক’ সতর্কবার্তা ইরানকে চাপে ফেলতে ট্রাম্পের কড়া বার্তা, যুদ্ধ থামাতে ১৫ দফা পরিকল্পনা রাস লাফান হামলায় জ্বালানি সংকটের শঙ্কা, ভারতের উদ্বেগ তীব্র কুয়েত ও সৌদি আরবে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলা মেক্সিকোর ড্রাগ কার্টেলে মার্কিন নাগরিকের উত্থান, নতুন সংকটে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা কমাতে গোপন বার্তা আদান-প্রদানে পাকিস্তানের ভূমিকা ইসরায়েলের হামলায় নিহত ইরানি নৌ কমান্ডার, হরমুজ প্রণালী বন্ধে বড় ভূমিকা

সুন্দরবনের মাডস্কিপার: হারিয়ে যাওয়া ইন্ডিকেটর প্রজাতি ও ডাঙায় ওঠার বিবর্তন-গল্প

সুন্দরবনের খালপাড়কাদা চরশিকড়ের মাথায় একসময় চোখে পড়ত যে সব মাডস্কিপারআজ সেগুলো অনেকটাই বিরল। ম্যানগ্রোভের এই ইন্ডিকেটর স্পিসিস’ কমে যাওয়া মানে বন-বাস্তুতন্ত্র গুরুতর চাপে পড়ছে। একই সঙ্গে মাডস্কিপার আমাদের মনে করিয়ে দেয় কোটি কোটি বছরের সেই বিবর্তন-গল্পযেখান থেকে জলজ প্রাণীরা ধীরে ধীরে ডাঙায় টিকে থাকার কৌশল আয়ত্ত করে শেষ পর্যন্ত ফুসফুসের বিকাশ ঘটিয়েছে।

সুন্দরবনে মাডস্কিপার কেন গুরুত্বপূর্ণ
মাডস্কিপার ম্যানগ্রোভের স্বাস্থ্যের ব্যারোমিটার। আগে যেখানে-সেখানে দেখা যেতখালের ধারেকাদায়শ্বাসমূলের ফাঁকেসেই ভিড় এখন আর নেই। ইন্ডিকেটর প্রজাতির কমে যাওয়া দেখায়আবাসস্থল ও খাদ্যশৃঙ্খলে বিপর্যয় ঘটছে।

সকালের ছন্দ: প্রাণীদের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়
ভোরে শিশির ভেজা শরীর গরম করতে রোদে বসাক্ষুধা মেটাতে খাবার খোঁজাএ সময়েই অধিকাংশ পাখি ও বন্যপ্রাণী সবচেয়ে সক্রিয়। দিন গড়ালে চড়া রোদ এড়াতে তারা পাতার ছায়া বা ঝোপে সরে যায়তাই দুপুরে খালপাড় প্রায় স্তব্ধ।

ফটোগ্রাফারের চোখে অলস দুপুর
সকালের নরম আলোয় ছবি সুন্দর আসে। আর দুপুরে আমরা নৌকা ছায়ায় বেঁধে চুপচাপ বসে থাকিকখনো হঠাৎ কোনো প্রাণী বেরিয়ে আসেনা হয় কাদায় ছোট ছোট নানা রঙের ফিডলার কাঁকড়া বা জলের ধারে ব্যস্ত মাডস্কিপারদের দেখি। প্রতিটি ছবিই যেন একটি জানালাযেখান দিয়ে অনেক পুরোনো এক বিবর্তন-গল্প চোখে ভেসে ওঠে।

মাডস্কিপার: পানির মাছতবু ডাঙায় টিকে থাকা
সাধারণ মাছের ফুসফুস নেইতারা ফুলকা দিয়ে পানির অক্সিজেন নেয়তাই ডাঙায় তুললে মারা যায়। কিন্তু মাডস্কিপারদের পূর্বসূরীরা ডাঙায় টিকতে দুই কৌশল আয়ত্ত করেছিল
১) বড় মুখে পানি জমিয়ে রাখা: ডাঙায় থাকা অবস্থায় ফুলকা সেই জমে থাকা পানির অক্সিজেন ব্যবহার করে। একটু পরপর পানিতে নেমে পুরোনো পানি ফেলে নতুন অক্সিজেনসমৃদ্ধ পানি নিয়ে আবার উঠে আসে।
২) ভেজা চামড়ায় অক্সিজেন শোষণ: শরীর ভেজা থাকলে চামড়া দিয়েও সামান্য শ্বাস নেয়তাই সময় পরপর গা ভিজিয়ে আসে।

৫০০ মিলিয়ন বছরের ধারাবাহিক চেষ্টা
এই প্রাথমিক উদ্ভাবনগুলোই স্থলজ প্রাণজগতে শ্বাসপ্রশ্বাসের ভিত্তি গড়েছে। ডাঙায় দীর্ঘক্ষণ থাকার সুবিধা ধীরে ধীরে বাড়তে বাড়তে এক সময় ফুসফুসের বিকাশের দিকে পথ দেখিয়েছে।

লোব-ফিনড মাছ থেকে ফুসফুসের আদি রূপ
প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন বছর আগে লোব-ফিনড (বৈজ্ঞানিক নাম: সারকপ্টেরিজি) মাছেরা এই অভিযোজনে এগিয়ে যায়। তাদের উত্তরসূরী লাংফিশে’ ৪২০ মিলিয়ন বছর আগে কার্যকর ফুসফুসের সূচনা ঘটে। জলজ মাছের শরীরে যে গ্যাস ব্লাডার বা পটকা’ ভেসে থাকতে সাহায্য করেসেটিই ধীরে ধীরে বহু-প্রকোষ্ঠে ভাগ হয়ে ফুসফুসে রূপ নেয়যেখানে বিপুল তলভাগের মাধ্যমে বাতাস ও রক্তের সংস্পর্শ অনেক বেশি দক্ষ হয়।

খরায় টিকে থাকার কৌশল: লাংফিশের পাঠ
আফ্রিকার খরা-প্রবণ হ্রদে পানি শুকিয়ে গেলে লাংফিশ কাদায় গর্ত করে লেজ নিচে গেঁথে থাকেমুখের দিকে মিউকাসের ঝিল্লি টেনে আর্দ্রতা ধরে। ঝিল্লির ছোট ছিদ্র দিয়ে মুখ দিয়ে ফুসফুসে বাতাস চলাচল করে। পানিতে থাকলে গিলআর ডাঙায় বা শুষ্ক মৌসুমে ফুসফুসদুই মাধ্যমেই তারা শ্বাস নেয়। আজও কিছু প্রজাতি একই কৌশলে বেঁচে আছে।

গল্পের সার: সমুদ্র থেকে স্থলে
গ্যাস ব্লাডারের বহু-প্রকোষ্ঠ রূপান্তরনাসারন্ধ্রের বিকাশচামড়ার মাধ্যমে অক্সিজেন শোষণএই ছোট ছোট ধাপ মিলেই স্থলজ প্রাণীর ফুসফুসের জন্ম। উভচরদের আবির্ভাব সেই ধারাবাহিকতারই পরিণতি। মাডস্কিপারদের দেখলে তাই মনে হয়৫০০ মিলিয়ন বছর আগে পূর্বসূরীদের কঠিন পরীক্ষানিরীক্ষা না হলে আজ হয়তো আমরা কেউই ডাঙায় হাঁটতাম নাথাকলেও বড় বড় ফুলকা নিয়ে সাগরেই ভেসে বেড়াতাম।

উপসংহার: ইন্ডিকেটর প্রজাতি বাঁচানো মানে বনকে বাঁচানো
মাডস্কিপার কমে যাওয়া শুধু একটি মাছের গল্প নয়এটি পুরো ম্যানগ্রোভের বিপদের সংকেত। আবাসস্থল রক্ষাদূষণ নিয়ন্ত্রণজলপথের প্রাকৃতিক প্রবাহ বজায় রাখাসব মিলিয়ে সুন্দরবনের প্রাণজ বৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনার এটাই সময়।

#ট্যাগ: #সুন্দরবন #মাডস্কিপার #ম্যানগ্রোভ #জীববৈচিত্র্য #বিবর্তন #বাংলাদেশ #প্রকৃতি_সংরক্ষণ

জনপ্রিয় সংবাদ

ইসরায়েলের ‘শিরশ্ছেদ’ কৌশলে ফাটল? ইরানে নেতৃত্ব হত্যা বাড়ালেও জোরদার হচ্ছে কঠোরপন্থা

সুন্দরবনের মাডস্কিপার: হারিয়ে যাওয়া ইন্ডিকেটর প্রজাতি ও ডাঙায় ওঠার বিবর্তন-গল্প

০৫:৪৩:১০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৫

সুন্দরবনের খালপাড়কাদা চরশিকড়ের মাথায় একসময় চোখে পড়ত যে সব মাডস্কিপারআজ সেগুলো অনেকটাই বিরল। ম্যানগ্রোভের এই ইন্ডিকেটর স্পিসিস’ কমে যাওয়া মানে বন-বাস্তুতন্ত্র গুরুতর চাপে পড়ছে। একই সঙ্গে মাডস্কিপার আমাদের মনে করিয়ে দেয় কোটি কোটি বছরের সেই বিবর্তন-গল্পযেখান থেকে জলজ প্রাণীরা ধীরে ধীরে ডাঙায় টিকে থাকার কৌশল আয়ত্ত করে শেষ পর্যন্ত ফুসফুসের বিকাশ ঘটিয়েছে।

সুন্দরবনে মাডস্কিপার কেন গুরুত্বপূর্ণ
মাডস্কিপার ম্যানগ্রোভের স্বাস্থ্যের ব্যারোমিটার। আগে যেখানে-সেখানে দেখা যেতখালের ধারেকাদায়শ্বাসমূলের ফাঁকেসেই ভিড় এখন আর নেই। ইন্ডিকেটর প্রজাতির কমে যাওয়া দেখায়আবাসস্থল ও খাদ্যশৃঙ্খলে বিপর্যয় ঘটছে।

সকালের ছন্দ: প্রাণীদের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়
ভোরে শিশির ভেজা শরীর গরম করতে রোদে বসাক্ষুধা মেটাতে খাবার খোঁজাএ সময়েই অধিকাংশ পাখি ও বন্যপ্রাণী সবচেয়ে সক্রিয়। দিন গড়ালে চড়া রোদ এড়াতে তারা পাতার ছায়া বা ঝোপে সরে যায়তাই দুপুরে খালপাড় প্রায় স্তব্ধ।

ফটোগ্রাফারের চোখে অলস দুপুর
সকালের নরম আলোয় ছবি সুন্দর আসে। আর দুপুরে আমরা নৌকা ছায়ায় বেঁধে চুপচাপ বসে থাকিকখনো হঠাৎ কোনো প্রাণী বেরিয়ে আসেনা হয় কাদায় ছোট ছোট নানা রঙের ফিডলার কাঁকড়া বা জলের ধারে ব্যস্ত মাডস্কিপারদের দেখি। প্রতিটি ছবিই যেন একটি জানালাযেখান দিয়ে অনেক পুরোনো এক বিবর্তন-গল্প চোখে ভেসে ওঠে।

মাডস্কিপার: পানির মাছতবু ডাঙায় টিকে থাকা
সাধারণ মাছের ফুসফুস নেইতারা ফুলকা দিয়ে পানির অক্সিজেন নেয়তাই ডাঙায় তুললে মারা যায়। কিন্তু মাডস্কিপারদের পূর্বসূরীরা ডাঙায় টিকতে দুই কৌশল আয়ত্ত করেছিল
১) বড় মুখে পানি জমিয়ে রাখা: ডাঙায় থাকা অবস্থায় ফুলকা সেই জমে থাকা পানির অক্সিজেন ব্যবহার করে। একটু পরপর পানিতে নেমে পুরোনো পানি ফেলে নতুন অক্সিজেনসমৃদ্ধ পানি নিয়ে আবার উঠে আসে।
২) ভেজা চামড়ায় অক্সিজেন শোষণ: শরীর ভেজা থাকলে চামড়া দিয়েও সামান্য শ্বাস নেয়তাই সময় পরপর গা ভিজিয়ে আসে।

৫০০ মিলিয়ন বছরের ধারাবাহিক চেষ্টা
এই প্রাথমিক উদ্ভাবনগুলোই স্থলজ প্রাণজগতে শ্বাসপ্রশ্বাসের ভিত্তি গড়েছে। ডাঙায় দীর্ঘক্ষণ থাকার সুবিধা ধীরে ধীরে বাড়তে বাড়তে এক সময় ফুসফুসের বিকাশের দিকে পথ দেখিয়েছে।

লোব-ফিনড মাছ থেকে ফুসফুসের আদি রূপ
প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন বছর আগে লোব-ফিনড (বৈজ্ঞানিক নাম: সারকপ্টেরিজি) মাছেরা এই অভিযোজনে এগিয়ে যায়। তাদের উত্তরসূরী লাংফিশে’ ৪২০ মিলিয়ন বছর আগে কার্যকর ফুসফুসের সূচনা ঘটে। জলজ মাছের শরীরে যে গ্যাস ব্লাডার বা পটকা’ ভেসে থাকতে সাহায্য করেসেটিই ধীরে ধীরে বহু-প্রকোষ্ঠে ভাগ হয়ে ফুসফুসে রূপ নেয়যেখানে বিপুল তলভাগের মাধ্যমে বাতাস ও রক্তের সংস্পর্শ অনেক বেশি দক্ষ হয়।

খরায় টিকে থাকার কৌশল: লাংফিশের পাঠ
আফ্রিকার খরা-প্রবণ হ্রদে পানি শুকিয়ে গেলে লাংফিশ কাদায় গর্ত করে লেজ নিচে গেঁথে থাকেমুখের দিকে মিউকাসের ঝিল্লি টেনে আর্দ্রতা ধরে। ঝিল্লির ছোট ছিদ্র দিয়ে মুখ দিয়ে ফুসফুসে বাতাস চলাচল করে। পানিতে থাকলে গিলআর ডাঙায় বা শুষ্ক মৌসুমে ফুসফুসদুই মাধ্যমেই তারা শ্বাস নেয়। আজও কিছু প্রজাতি একই কৌশলে বেঁচে আছে।

গল্পের সার: সমুদ্র থেকে স্থলে
গ্যাস ব্লাডারের বহু-প্রকোষ্ঠ রূপান্তরনাসারন্ধ্রের বিকাশচামড়ার মাধ্যমে অক্সিজেন শোষণএই ছোট ছোট ধাপ মিলেই স্থলজ প্রাণীর ফুসফুসের জন্ম। উভচরদের আবির্ভাব সেই ধারাবাহিকতারই পরিণতি। মাডস্কিপারদের দেখলে তাই মনে হয়৫০০ মিলিয়ন বছর আগে পূর্বসূরীদের কঠিন পরীক্ষানিরীক্ষা না হলে আজ হয়তো আমরা কেউই ডাঙায় হাঁটতাম নাথাকলেও বড় বড় ফুলকা নিয়ে সাগরেই ভেসে বেড়াতাম।

উপসংহার: ইন্ডিকেটর প্রজাতি বাঁচানো মানে বনকে বাঁচানো
মাডস্কিপার কমে যাওয়া শুধু একটি মাছের গল্প নয়এটি পুরো ম্যানগ্রোভের বিপদের সংকেত। আবাসস্থল রক্ষাদূষণ নিয়ন্ত্রণজলপথের প্রাকৃতিক প্রবাহ বজায় রাখাসব মিলিয়ে সুন্দরবনের প্রাণজ বৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনার এটাই সময়।

#ট্যাগ: #সুন্দরবন #মাডস্কিপার #ম্যানগ্রোভ #জীববৈচিত্র্য #বিবর্তন #বাংলাদেশ #প্রকৃতি_সংরক্ষণ