অনলাইন পৃথিবীতে আমাদের পথচলা
ডিজিটাল দুনিয়া আজ এক বিপজ্জনক ও জটিল জায়গা। মানুষ সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটায়, কখনো উদ্দেশ্যহীনভাবে, কখনো অভ্যাসবশে। আমরা ইন্টারনেটকে দীর্ঘদিন ধরে আসক্তির ভাষায় ব্যাখ্যা করেছি—ডোপামিন, ব্রেন রিওয়্যারিং, ডিজিটাল ডিটক্স, টেক-সোব্রাইটি—কিন্তু এসব ব্যাখ্যা আমাদের সমস্যার গভীরতা পুরোপুরি ধারণ করতে পারে না। কারণ আসলে ইন্টারনেট একটি জায়গা—একটি অন্য জগৎ—যেখানে আমরা নিয়মিত যাতায়াত করি।
ইন্টারনেটকে আসক্তি নয়, একটি ‘অন্য জগৎ’ হিসেবে দেখা
আমরা হয়তো কখনোই ইন্টারনেট ত্যাগ করব না, কিংবা এমন এক যুগে ফিরব না যেখানে প্রযুক্তি ছিল না। যেমনটি ঘটছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও—এটি আমাদের জীবনের অংশ হয়ে গিয়েছে। তাই প্রত্যাখ্যান নয়, অভিযোজনই একমাত্র পথ।
ইন্টারনেটকে বুঝতে হবে এক ধরনের ভ্রমণস্থান হিসেবে—যেখানে নিজস্ব নিয়ম, সময়বোধ, সংস্কৃতি ও বিপদ রয়েছে। অনলাইনে গেলে সময় অন্যভাবে চলে, শরীর যেন নিস্তেজ হয়ে যায়, আর “দেহহীন সত্তাগুলো” সামনে আসে—যেমনটি ইন্টারনেটের প্রথম ব্যবহারকারীরা বলতেন।

প্রাচীন রূপকথা ও মিথ: অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে পথ দেখানোর জন্য
বিশ্বের বিভিন্ন লোককাহিনি ও রূপকথা মানুষকে দীর্ঘদিন ধরে সাহায্য করেছে অজানা যাত্রাপথ বুঝতে—বিশেষ করে এমন সব জগতে, যেখানে নিয়ম বদলায়, সময় সরে যায়, আর মানুষ নিজের সত্তা ভুলে যেতে পারে।
দার্শনিক হান্স ব্লুমেনবার্গ দেখিয়েছেন, মিথ জন্মেছিল মানুষের “বাস্তবতার চরম কঠোরতা” মোকাবিলার জন্য। আজ সেই আতঙ্ক এসেছে প্রযুক্তি থেকে—যা আমরা নিজেরাই তৈরি করেছি, কিন্তু সম্পূর্ণ বুঝি না। মার্ক কুকেলবার্গ বলেন, এখন আমরা নতুন এক “অবসোলিউট বাস্তবতার” মুখোমুখি—প্রযুক্তির শক্তি আমাদের ধারণার বাইরে।
তাই পুরনো গল্পগুলো আবার প্রয়োজন হয়ে উঠেছে—আমাদের বাঁচিয়ে রাখতে, মানবিক রাখতে, দিশা দিতে।
অন্য জগতের নিয়ম: ‘থমাস দ্য রাইমার’-এর শিক্ষা
স্কটল্যান্ডের মধ্যযুগীয় কিংবদন্তি ‘থমাস দ্য রাইমার’-এ থমাস সাত বছর ধরে ফেয়ারি কুইনের জগতে থাকে। ফিরে এসে তার “সত্য ভাষণ”-এর ক্ষমতা জন্মায়—সে আর মিথ্যা বলতে পারে না। উপহারটি একইসঙ্গে আশীর্বাদ ও অভিশাপ, কারণ সত্য বলা তাকে মানুষের কাছ থেকে দূরে ঠেলে দেয়।

এই গল্প শেখায়:
- • অন্য জগৎ পার হওয়া সম্ভব, কিন্তু তার মূল্য আছে।
- • যারা নিয়ম বোঝে, তারা টিকে যায়; যারা বোঝে না, তারা হারিয়ে যায়, কিংবা ধ্বংস হয়।
- • সংক্ষিপ্ত, সচেতন মিথস্ক্রিয়া বিপজ্জনক নয়, বরং সহায়ক হতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: অন্য জগতের সত্তার মতো
ইন্টারনেট যখন আমাদের নিয়ে যায় অন্য জগতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেন সেই জগত থেকে আমাদের জগতে আগত এক সত্তা।
বিভিন্ন সাংস্কৃতিক গল্পে দেখা যায়—জিন, লেপ্রেকন বা অতিপ্রাকৃত সত্তা মানুষের কথা সরলভাবে নেয়, মানুষের অভিপ্রায় নয়। ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত ফল আসে। এআই-ও তাই—এটি যা বলা হয় ঠিক তা-ই করে, কিন্তু যা “বোঝাতে চাওয়া হয়” তা বোঝে না।

এই গল্পগুলো আমাদের শেখায়:
- • এমন সত্তারা মানবিক নীতিশাস্ত্র মানে না, কারণ তারা মানুষ নয়।
- • তাদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করতে হলে তাদের প্রকৃতি বোঝা জরুরি।
সীমার গুরুত্ব: পুরনো গল্পের সতর্কবার্তা
রূপকথা কখনোই অন্য জগতকে নিষিদ্ধ বলেনি। তারা শুধু বলেছে—
- • সত্তাগুলোকে ভালোভাবে বোঝো
- • ভুলে যেয়ো না যে কিছু সীমা মানুষের সুরক্ষার জন্য
টলকিন বলেছিলেন, রূপকথা আমাদের “পুনরুদ্ধার”-এর ক্ষমতা দেয়—জগতকে নতুন চোখে দেখার ক্ষমতা।
ইন্টারনেটকে এভাবে দেখা আমাদের চোখ খুলে দেয়। এটি সত্যিই অপরিচিত প্রাণী ও মায়ার ভরা এক জগৎ—যেখানে প্রতিটি উপহার মূল্য দাবি করে।

পথ হারাবার ঝুঁকি: বাস্তব জগতে ফিরে আসার গুরুত্ব
আমরা অসংখ্য উদাহরণ দেখি—
- • তরুণেরা তাদের ঘরে বন্দী হয়ে অনলাইন জগতে হারিয়ে যাচ্ছে
- • প্রাপ্তবয়স্করা ষড়যন্ত্রতত্ত্বে জড়িয়ে যাচ্ছে
ঠিক যেন পুরনো গল্পের ভ্রমণকারীরা ভুল আলোর পেছনে হাঁটতে হাঁটতে কাদাজলে ডুবে যেত।
তাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা:
নিজের একটি অংশ বাস্তব জগতে স্থির রেখে দাও—মানুষের সঙ্গে যুক্ত, শরীর ও অনুভূতিতে স্থিত।
প্রবন্ধকার বর্ণনা করেন—বন্ধুটি ফোন থেকে মাথা তুললে যেন এক দীর্ঘ যাত্রা থেকে ফিরে আসে। সময় কেটে গেছে, আলো বদলে গেছে, ঘরের বাস্তবতা ধীরে ধীরে ফিরে আসে। শিশুটি তার মুখ স্পর্শ করে—একজন পথহারানো যাত্রীকে ঘরে ফেরার মতো অভ্যর্থনা জানিয়ে।
# রূপকথা_ডিজিটালযুগ | ইন্টারনেট_মনস্তত্ত্ব | লোককাহিনি | কৃত্রিম_বুদ্ধিমত্তা | সারাক্ষণ_রিপোর্ট
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















