শিল্প খাতে স্থবিরতা ও বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার কারণে দেশে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ কাজ হারিয়ে “রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে”—এমন মন্তব্য করেছেন হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ.কে. আজাদ। শনিবার রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে আয়োজিত বাংলাদেশ ইকোনমিক কনফারেন্স ২০২৫–এর উদ্বোধনী সেশনে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে বণিক বার্তা।
উদ্বোধনী বক্তব্যে আজাদ বলেন, দেশে শ্রমবাজারে প্রবেশকারীর সংখ্যা প্রতি বছর বাড়লেও সে অনুযায়ী নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। “প্রতি বছর ৩০ লাখ মানুষ কর্মসংস্থানের জন্য প্রস্তুত হয়। এর মধ্যে ১.২ লাখ সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকরি পায়, ৮ লাখ বিদেশে যায়, আর ১০ লাখ বেসরকারি খাতে কাজ পায়। বাকি সবাই বেকার থাকে। নতুন চাকরি সৃষ্টি না হওয়ায় বেকারত্ব আরও বাড়ছে,” তিনি জানান।
জিডিপি কমছে, খেলাপি ঋণ বাড়ছে
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২৩ নভেম্বর প্রকাশিত বুলেটিন উদ্ধৃত করে আজাদ বলেন, গত বছর দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৪.২২ শতাংশ, যা এ বছর কমে ৩.৯৭ শতাংশে নামতে পারে। তিনি আরও বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক খেলাপি ঋণের হার ২৪ শতাংশ বললেও প্রকৃত হার “তার চেয়ে অনেক বেশি।”
তিনি অভিযোগ করেন, অনেক ব্যাংক শেয়ারহোল্ডারদের ডিভিডেন্ড দিতে ‘উইন্ডো ড্রেসিং’-এ জড়িত থাকে। “যদি প্রকৃত খেলাপি ঋণের হার ৩৫ শতাংশের মতো হয়, তাহলে এই টাকা কোথায় গেছে, কারা নিয়েছে—তা খুঁজে বের করা জরুরি। আগামী সরকার যেন তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনে,” বলেন তিনি।
কঠোর মুদ্রানীতি ও শিল্পায়ন সংকট
কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নরের কড়া সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির সমালোচনা করে আজাদ বলেন, উচ্চ সুদের কারণে বেসরকারি খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। “আমরা মাত্র ৬ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধি পেয়েছি। শিল্পায়ন খুবই খারাপ অবস্থায় আছে। গত বছর পুঁজিসামগ্রীর আমদানি কমেছে, আর এ বছর তা আরও ২৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে,” বলেন তিনি।
তিনি আরও জানান, সরকার রাজস্ব ঘাটতি পূরণে ব্যাংক থেকে ব্যাপক হারে ঋণ নিচ্ছে। “সরকারের ব্যাংক ঋণ এখন ২৭ শতাংশে পৌঁছেছে,” বলেন তিনি।
জ্বালানি সংকট: উদ্বেগজনক পরিস্থিতি
জ্বালানি খাতে ভয়াবহ সংকট সৃষ্টি হওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন আজাদ। তার তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৭.৮০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুত রয়েছে, আর বার্ষিক চাহিদা ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। “এই চাহিদার ৭০ শতাংশ দেশীয় রিজার্ভ থেকে এবং ৩০ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। ফলে প্রতিবছর মজুত ৯ শতাংশ করে কমে যাচ্ছে।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, “এভাবে চলতে থাকলে ৬–৭ বছরের মধ্যে গ্যাসের রিজার্ভ শেষ হয়ে যেতে পারে, তখন পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হতে হবে। বিনিয়োগকারীরা এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন।”
অন্যান্য বক্তাদের মতামত
সেশনে আরও বক্তব্য দেন বিসিএসএমএ প্রেসিডেন্ট ও জিপিএইচ গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, বিআইডিএস মহাপরিচালক অধ্যাপক এ.কে. এনামুল হক এবং এবিবি চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর আরেফিন।
উদ্বোধনী সেশনটি সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ. মানসুর। আলোচনায় সঞ্চালনা করেন বণিক বার্তার সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















