চীনে অনলাইন ইতিবাচকতা চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা বাড়ছে, কিন্তু অর্থনীতির বাস্তব সংকট মানুষের মধ্যে নতুন ধরনের হতাশা তৈরি করছে, যা প্রশাসনের পক্ষে আর আড়াল করা সম্ভব হচ্ছে না। এই অবস্থার একটি স্পষ্ট উদাহরণ দেখা যায় পূর্ব চীনের উইফাঙ শহরে।
উইফাঙে অনলাইনে নেতিবাচকতা দমনে নজরদারি বৃদ্ধি
বোহাই সাগরের উপকূলে অবস্থিত উইফাঙ শহর জননিরাপত্তায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির দাবি করেছে। প্রশাসন জানায়, শহরের বিপুল সংখ্যক বাসিন্দা নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে সন্তুষ্ট এবং অপরাধের হার কমেছে। তবে নতুন করে পুলিশের নজর গিয়ে পড়েছে অনলাইনে মানুষের ‘নেতিবাচক মনোভাব’ ছড়ানোর ওপর।
নভেম্বরের মাঝামাঝি পুলিশ জানায়, এক মাসে তারা বহু নেতিবাচক মতামতের ঘটনা মোকাবিলা করেছে। এক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রেন নামে এক ব্যক্তিকে কৃষি নীতি সমালোচনামূলক ভিডিও সরাতে বাধ্য করা হয়। অপর এক ঘটনায় কিউ উপনামের এক শিক্ষার্থীকে শিক্ষককে অনলাইনে ‘বুলিং’ করার অভিযোগে ডেকে সতর্ক করা হয়।
চীনে জাতীয় পর্যায়ের ‘নেতিবাচকতা নিয়ন্ত্রণ’ উদ্যোগ
উইফাঙ একক উদাহরণ নয়—পুরো দেশেই অনলাইনে হতাশা কমানো এবং ইতিবাচক মনোভাব বাড়ানোর বিশেষ অভিযান চলছে। শি চিনফিং ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ‘ইতিবাচক শক্তি’কে অনলাইন আলোচনার মৌলিক নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সরকারবিরোধী মন্তব্যের কারণে অ্যাকাউন্ট নিষিদ্ধ হওয়া তাই নতুন ঘটনা নয়।

তবে সাম্প্রতিক কঠোর অভিযানে দেখা যাচ্ছে—সরকার সত্যিই উদ্বিগ্ন। বড় কারণ হলো অর্থনৈতিক মন্দা। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থী বাদে চাকরিপ্রত্যাশীদের মধ্যে প্রায় ১৭ শতাংশ বেকার। যুবসমাজের হতাশা এবং সর্বব্যাপী সামাজিকমাধ্যম মিললে অস্থিতিশীলতা বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আশাবাদী দেশ থেকে সন্দেহে পূর্ণ সমাজে পরিবর্তন
একসময় চীন ছিল ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী। মানুষ বিশ্বাস করত যে সময়ের সঙ্গে জীবন আরও উন্নত হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই বিশ্বাসে বড় ধাক্কা লেগেছে।
যদিও জনমত জরিপ পরিচালনা করা কঠিন, তবে উপলভ্য তথ্য হতাশা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। হার্ভার্ডের সমাজবিজ্ঞানী মার্টিন কিং হোয়াইটের আগের জরিপগুলো দেখায়—মানুষ সাফল্যকে প্রতিভা ও পরিশ্রমের ফল মনে করত। কিন্তু নতুন জরিপে দেখা যাচ্ছে—শ্রম দিলে অবশ্যই ফল মিলবে, এই বিশ্বাস ৬২ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ২৮ শতাংশে।
অন্য গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণেরা বিশ্বাস হারাচ্ছেন—দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া শিশুরা ভবিষ্যতে আগের মতো সহজে উপরে উঠতে পারবে না।
চীন হতাশ হলেও এখনো তুলনামূলক বেশি আশাবাদী
পরিবর্তন সত্ত্বেও চীন এখনো পশ্চিমা অনেক দেশের তুলনায় বেশি আশা ধরে রেখেছে। নতুন জরিপে প্রায় অর্ধেক উত্তরদাতা মনে করেন যে পাঁচ বছর পর তাদের অবস্থা আরও ভালো হবে, যদিও আগে এই হার ছিল প্রায় তিন-চতুর্থাংশ।
সরকারের উদ্বেগ এই কারণে—হতাশা বাড়লে রাষ্ট্রীয় সমৃদ্ধির গল্পে মানুষের আস্থা কমে যেতে পারে। পাশাপাশি আধুনিক জীবনের প্রতি অনাগ্রহ বাড়লে অর্থনীতিকে চালিত করা ‘চেষ্টা করলে সম্ভব’—এই মনোভাবও দুর্বল হতে পারে।

অনলাইনে নেতিবাচক মত দমনে কঠোর পদক্ষেপ
সেপ্টেম্বরে সাইবার অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ঘোষণা করে যে তারা এমন বার্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে, যা মানুষকে মনে করায়—পরিশ্রমের কোনো মূল্য নেই। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে তিনজন জনপ্রিয় ইনফ্লুয়েন্সারের কার্যক্রম বন্ধ করা হয়:
১. ঝাং জুয়েফেং—দাবি করেছিলেন দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের ভালো চাকরি পাওয়া কঠিন।
২. হু চেনফেং—ধনী-গরিব ভেদ বোঝাতে অ্যাপল–অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীর তুলনা করেন।
৩. লান ঝানফেই—বিলাসী ভ্রমণের ভিডিও পোস্ট করে কম সুবিধাপ্রাপ্তদের ক্ষুব্ধ করতেন।
এ ছাড়া উইবোসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে প্রায় ১,২০০ অ্যাকাউন্ট বন্ধ বা সীমিত করা হয়েছে।
প্রচারণার বাস্তব ফল
নেতিবাচকতা দমন করার চেষ্টা সত্ত্বেও অনলাইনে হতাশা কমছে না। অর্থনৈতিক তথ্য প্রকাশের পর সাধারণ মানুষ নিজেদের অভিজ্ঞতা ও কষ্টের কথা সোশ্যাল মিডিয়ায় তুলে ধরেন।
‘ইতিবাচক শক্তি’ শব্দবন্ধটি এখন অনেকের কাছে ব্যঙ্গাত্মক।
বিশ্বজুড়েই সামাজিকমাধ্যম মানুষের আবেগকে চরমে ঠেলে দেয়—চীন তাই এগুলো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। কিন্তু সমস্যার গভীরে রয়েছে অর্থনৈতিক সংকট; সেন্সরশিপ তা আড়াল করতে পারে, সমাধান নয়।
চীনের মানুষের হতাশার মূল কারণ অর্থনীতির দুর্বলতা—অ্যাপ নয়।
#চীন #অর্থনীতি #সেন্সরশিপ #অনলাইন_নিয়ন্ত্রণ #ইতিবাচক_শক্তি #হতাশা #বেকারত্ব
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















