০৪:৩৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
ক্যালিফোর্নিয়ায় বিলিয়নিয়ার কর নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের বিভাজন, ধনীদের দেশ ছাড়ার আশঙ্কা ভারতের গিগ অর্থনীতির বিস্ফোরণ: অনিশ্চিত শ্রম থেকে আনুষ্ঠানিক সুরক্ষার পথে নতুন বাস্তবতা অস্ট্রেলিয়ার বন্ডি হামলার পর ইসরাইলের প্রেসিডেন্টের সফর, সামাজিক সম্প্রীতির বড় পরীক্ষা জাপানের রাজনীতিতে নতুন ঝড়, জন্ম নিচ্ছে একের পর এক দল বিজ্ঞান রক্ষায় কংগ্রেসের লড়াই, থামেনি ট্রাম্প যুগের চাপ নাটোরে নির্বাচনী প্রচারে সংঘর্ষে, আহত ১৩ গাজায় এখনো অচলাবস্থা: রাফাহ সীমান্ত খুললেও গাজার বাস্তবতায় তেমন পরিবর্তন নেই তিগ্রেতে নতুন উত্তেজনা: ভঙ্গুর শান্তির সামনে ইথিওপিয়া আফ্রিকায় মার্কিন সহায়তা—কম উদার,বেশি শর্তসাপেক্ষ বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হলে দুর্নীতি বাড়ে

অর্থনীতির জনক কি সত্যিই অতুলনীয় অ্যাডাম স্মিথ

অর্থনীতির ইতিহাসে কার্ল মার্ক্সের পর যে নামটি সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত, তিনি অ্যাডাম স্মিথ। ডারউইন বা নিউটনের মতোই তাঁর চিন্তাকে এতটাই মৌলিক বলে ধরা হয় যে প্রায়ই উৎস উল্লেখের প্রয়োজন পড়ে না। অথচ তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ জাতির সম্পদ ২০২৬ সালে আড়াইশ বছরে পা রাখতে চললেও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে, এই বইয়ের খ্যাতি কি তার প্রকৃত গুরুত্বকে ছাড়িয়ে গেছে।

জাতির সম্পদের খ্যাতি ও বাস্তবতা
অনেকে মনে করেন, এই বই আধুনিক অর্থনীতির ভিত্তিপ্রস্তর। বাস্তবে দেখা যায়, এতে থাকা অনেক ধারণাই স্মিথের একক উদ্ভাবন নয়। বরং ইউরোপের আগের চিন্তাবিদদের কাজের প্রতিফলন সেখানে স্পষ্ট। তবু সময়ের প্রেক্ষাপটে বইটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ এটি অর্থনীতিকে একটি সামগ্রিক ব্যবস্থার মতো করে ব্যাখ্যা করেছিল।

লাজুক মানুষ, গভীর চিন্তাবিদ
স্কটল্যান্ডের কির্ককাল্ডি শহরে জন্ম নেওয়া অ্যাডাম স্মিথ ছিলেন স্বভাবতই লাজুক ও অন্যমনস্ক। বিয়ে করেননি, জাঁকজমক পছন্দ করতেন না। গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে নৈতিক দর্শনের অধ্যাপক হিসেবে কাজ করলেও স্বাধীন চিন্তার টানে পরে নিজেকে গবেষণায় ডুবিয়ে দেন। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি নিজের লেখালেখি নিয়ে ছিলেন কঠোর ও আত্মসমালোচক।

স্বার্থপরতার ভুল ব্যাখ্যা
স্মিথকে প্রায়ই নিছক স্বার্থপরতার প্রবক্তা হিসেবে দেখানো হয়। কসাই, মদ প্রস্তুতকারী ও রুটিওয়ালার উদাহরণ টেনে বলা হয়, মানুষ কেবল নিজের লাভের কথা ভেবেই কাজ করে। কিন্তু তাঁর নৈতিক অনুভূতির তত্ত্ব গ্রন্থে স্মিথ স্পষ্ট করেছেন, মানুষ শুধু স্বার্থের দাস নয়। অন্যের অবস্থান কল্পনা করার ক্ষমতা মানুষের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখে। তিনি যে নিরপেক্ষ দর্শকের ধারণা দেন, তা মানুষের ভেতরের নৈতিক বিচারবোধ কে তুলে ধরে।

অদৃশ্য হাতের বাস্তব মানে
বাজারের অদৃশ্য হাত শব্দগুচ্ছটিও প্রায়শই ভুলভাবে ব্যবহৃত হয়। স্মিথ নিজে এই শব্দটি খুব কমবার ব্যবহার করেছেন এবং কখনোই সরাসরি মূল্য নির্ধারণের যান্ত্রিক প্রক্রিয়া বোঝাতে নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রেই তিনি রাষ্ট্রের দৃশ্যমান ভূমিকার পক্ষে ছিলেন। শিক্ষা ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব কিংবা সুদের সীমা নির্ধারণে আইনি হস্তক্ষেপের কথা তিনি জোর দিয়ে বলেছেন।

বাজারের সুফল ও মূল্য
শ্রমবিভাজনের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ার বিষয়টি স্মিথ জোর দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি আশঙ্কাও প্রকাশ করেন, একঘেয়ে কাজে ডুবে থাকা শ্রমিক মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অর্থাৎ বাজারের লাভের পাশাপাশি সামাজিক খরচ নিয়েও তিনি ছিলেন সচেতন।

জনকের তকমা নিয়ে প্রশ্ন
জাতির সম্পদ প্রকাশের পর বইটি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও স্মিথকে এককভাবে অর্থনীতির জনক বলা কি যুক্তিসংগত, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। তিনি দীর্ঘ বাক্যে লিখতেন, কিছু গুরুতর তাত্ত্বিক ভুলও করেছিলেন এবং বহু ধারণার উৎস স্পষ্ট করেননি। শ্রমমূল্য তত্ত্বের মতো চিন্তা পরে মার্ক্সবাদী বিশ্লেষণের পথ খুলে দেয়, যা নিজেই বিতর্কিত।

উত্তরাধিকার ও মূল্যায়ন
সব মিলিয়ে অ্যাডাম স্মিথ ছিলেন সময়ের সন্তান। তাঁর বই পুরোপুরি বিপ্লবী না হলেও অর্থনীতিকে বোঝার এক নতুন কাঠামো তৈরি করেছিল। তাই আড়াইশ বছরে জাতির সম্পদের জন্য এক গ্লাস তোলা যায়, তবে সবচেয়ে দামী বোতল খোলার প্রয়োজন বোধহয় নেই।

#অ্যাডামস্মিথ #জাতিরসম্পদ #অর্থনীতিরইতিহাস #অর্থনৈতিকভাবনা #বাজারওরাষ্ট্র

জনপ্রিয় সংবাদ

ক্যালিফোর্নিয়ায় বিলিয়নিয়ার কর নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের বিভাজন, ধনীদের দেশ ছাড়ার আশঙ্কা

অর্থনীতির জনক কি সত্যিই অতুলনীয় অ্যাডাম স্মিথ

১১:২১:০২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২১ ডিসেম্বর ২০২৫

অর্থনীতির ইতিহাসে কার্ল মার্ক্সের পর যে নামটি সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত, তিনি অ্যাডাম স্মিথ। ডারউইন বা নিউটনের মতোই তাঁর চিন্তাকে এতটাই মৌলিক বলে ধরা হয় যে প্রায়ই উৎস উল্লেখের প্রয়োজন পড়ে না। অথচ তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ জাতির সম্পদ ২০২৬ সালে আড়াইশ বছরে পা রাখতে চললেও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে, এই বইয়ের খ্যাতি কি তার প্রকৃত গুরুত্বকে ছাড়িয়ে গেছে।

জাতির সম্পদের খ্যাতি ও বাস্তবতা
অনেকে মনে করেন, এই বই আধুনিক অর্থনীতির ভিত্তিপ্রস্তর। বাস্তবে দেখা যায়, এতে থাকা অনেক ধারণাই স্মিথের একক উদ্ভাবন নয়। বরং ইউরোপের আগের চিন্তাবিদদের কাজের প্রতিফলন সেখানে স্পষ্ট। তবু সময়ের প্রেক্ষাপটে বইটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ এটি অর্থনীতিকে একটি সামগ্রিক ব্যবস্থার মতো করে ব্যাখ্যা করেছিল।

লাজুক মানুষ, গভীর চিন্তাবিদ
স্কটল্যান্ডের কির্ককাল্ডি শহরে জন্ম নেওয়া অ্যাডাম স্মিথ ছিলেন স্বভাবতই লাজুক ও অন্যমনস্ক। বিয়ে করেননি, জাঁকজমক পছন্দ করতেন না। গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে নৈতিক দর্শনের অধ্যাপক হিসেবে কাজ করলেও স্বাধীন চিন্তার টানে পরে নিজেকে গবেষণায় ডুবিয়ে দেন। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি নিজের লেখালেখি নিয়ে ছিলেন কঠোর ও আত্মসমালোচক।

স্বার্থপরতার ভুল ব্যাখ্যা
স্মিথকে প্রায়ই নিছক স্বার্থপরতার প্রবক্তা হিসেবে দেখানো হয়। কসাই, মদ প্রস্তুতকারী ও রুটিওয়ালার উদাহরণ টেনে বলা হয়, মানুষ কেবল নিজের লাভের কথা ভেবেই কাজ করে। কিন্তু তাঁর নৈতিক অনুভূতির তত্ত্ব গ্রন্থে স্মিথ স্পষ্ট করেছেন, মানুষ শুধু স্বার্থের দাস নয়। অন্যের অবস্থান কল্পনা করার ক্ষমতা মানুষের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখে। তিনি যে নিরপেক্ষ দর্শকের ধারণা দেন, তা মানুষের ভেতরের নৈতিক বিচারবোধ কে তুলে ধরে।

অদৃশ্য হাতের বাস্তব মানে
বাজারের অদৃশ্য হাত শব্দগুচ্ছটিও প্রায়শই ভুলভাবে ব্যবহৃত হয়। স্মিথ নিজে এই শব্দটি খুব কমবার ব্যবহার করেছেন এবং কখনোই সরাসরি মূল্য নির্ধারণের যান্ত্রিক প্রক্রিয়া বোঝাতে নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রেই তিনি রাষ্ট্রের দৃশ্যমান ভূমিকার পক্ষে ছিলেন। শিক্ষা ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব কিংবা সুদের সীমা নির্ধারণে আইনি হস্তক্ষেপের কথা তিনি জোর দিয়ে বলেছেন।

বাজারের সুফল ও মূল্য
শ্রমবিভাজনের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ার বিষয়টি স্মিথ জোর দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি আশঙ্কাও প্রকাশ করেন, একঘেয়ে কাজে ডুবে থাকা শ্রমিক মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অর্থাৎ বাজারের লাভের পাশাপাশি সামাজিক খরচ নিয়েও তিনি ছিলেন সচেতন।

জনকের তকমা নিয়ে প্রশ্ন
জাতির সম্পদ প্রকাশের পর বইটি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও স্মিথকে এককভাবে অর্থনীতির জনক বলা কি যুক্তিসংগত, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। তিনি দীর্ঘ বাক্যে লিখতেন, কিছু গুরুতর তাত্ত্বিক ভুলও করেছিলেন এবং বহু ধারণার উৎস স্পষ্ট করেননি। শ্রমমূল্য তত্ত্বের মতো চিন্তা পরে মার্ক্সবাদী বিশ্লেষণের পথ খুলে দেয়, যা নিজেই বিতর্কিত।

উত্তরাধিকার ও মূল্যায়ন
সব মিলিয়ে অ্যাডাম স্মিথ ছিলেন সময়ের সন্তান। তাঁর বই পুরোপুরি বিপ্লবী না হলেও অর্থনীতিকে বোঝার এক নতুন কাঠামো তৈরি করেছিল। তাই আড়াইশ বছরে জাতির সম্পদের জন্য এক গ্লাস তোলা যায়, তবে সবচেয়ে দামী বোতল খোলার প্রয়োজন বোধহয় নেই।

#অ্যাডামস্মিথ #জাতিরসম্পদ #অর্থনীতিরইতিহাস #অর্থনৈতিকভাবনা #বাজারওরাষ্ট্র