২০২৫ সালকে নানা দিক থেকেই এক মোড় ঘোরানো বছর হিসেবে মনে রাখা হবে। বিশ্বের বহু অঞ্চলে সহিংস সশস্ত্র সংঘাত ভয়াবহ রূপ নেয়। ইউক্রেন থেকে শুরু করে ইসরায়েল-গাজা-ইরান-লেবানন, পাকিস্তান-ভারত, থাইল্যান্ড-কাম্বোডিয়া, ভেনেজুয়েলা, সুদান, ইথিওপিয়া ও মিয়ানমার—প্রায় সবখানেই উত্তেজনা ও সংঘর্ষ বাড়ে। একই সঙ্গে বছরটি ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ তিনটি বছরের একটি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে অন্যতম ব্যয়বহুল সময়।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধ বিশ্ব বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ায় এবং কৌশলগতভাবে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার দিক বদলে দেয়। প্রযুক্তি খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টরসহ নানা ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি ঘটে। আর্থিক বাজারে দেখা যায় রেকর্ড উত্থান, একই সঙ্গে সোনা ও রুপার দামও লাফিয়ে বাড়ে।
রাশিয়ার সম্পদ জব্দ ও ইউরোপের দুশ্চিন্তা
এই পরিস্থিতির মধ্যেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার প্রায় ২১০ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের সম্পদ অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয়। এর জবাবে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক মস্কোর আদালতে মামলা করে, যেখানে বেলজিয়ামভিত্তিক আর্থিক ক্লিয়ারিং সংস্থা ইউরোক্লিয়ারের কাছ থেকে প্রায় ২৩০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়। ইউরোক্লিয়ারের কাছেই রাশিয়ার অধিকাংশ সম্পদ সংরক্ষিত।
সার্বভৌম রাষ্ট্রের সম্পদ জব্দ করা ইউরোপের জন্য শুধু আইনি জটিলতাই নয়, বরং একটি অস্তিত্বগত সংকটও। ইউরোপ যদি একটি আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত থাকে, তবে এমন নজিরের পর কে সেখানে নিজের অর্থ রাখতে সাহস করবে? বিশেষ করে যখন এসব পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশে কিংবা ইউরোপের নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থে নেওয়া হতে পারে। বাস্তবতা হলো, ইউরোপ আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেনি, আর ইউক্রেনও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ন্যাটোর সদস্য নয়।
যুদ্ধ, শান্তি ও ভাঙনের শুরু
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন ইউরোপের দীর্ঘদিনের যুদ্ধ-পরবর্তী শান্তি ভেঙে দেয়। দুই বিশ্বযুদ্ধে শিল্প ও উপনিবেশিক সম্পদ নষ্ট করার পর ইউরোপ ঐক্যের মধ্য দিয়ে যে শান্তি ও সমৃদ্ধি পেয়েছিল, এই সংঘাত সেই ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেয়। তবে সমস্যার শুরু আরও আগেই হয়েছিল।
কল্যাণব্যবস্থা ও ইউরোপের দ্বন্দ্ব
২০১২ সালে, বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের কয়েক বছর পর, তৎকালীন জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মের্কেল এক সাক্ষাৎকারে ইউরোপের মূল সংকটের কথা তুলে ধরেন। বিশ্বের সবচেয়ে উদার কল্যাণব্যবস্থাগুলোর একটি থাকা সত্ত্বেও ইউরোপের অবস্থান ছিল চাপের মুখে। তিনি বলেছিলেন, বিশ্বের জনসংখ্যার সামান্য বেশি সাত শতাংশ ইউরোপে বাস করে, অথচ বৈশ্বিক মোট উৎপাদনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসে এখান থেকে এবং বিশ্বজুড়ে সামাজিক ব্যয়ের প্রায় অর্ধেক বহন করতে হয় ইউরোপকে। এই বাস্তবতায় নিজেদের সমৃদ্ধি ও জীবনযাত্রা ধরে রাখতে ইউরোপকে যে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে, তা ছিল অবশ্যম্ভাবী।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধ, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের চাপে ইউরোপ আজ এক গভীর অচলাবস্থার মুখে। প্রশ্ন থেকে যায়—এই সংকটের ভেতর দিয়েই কি ইউরোপ তার ভবিষ্যৎ পথ খুঁজে নিতে পারবে, নাকি এই স্থবিরতাই তার দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা হয়ে উঠবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















