ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের সময় ও পরবর্তী অস্থিরতার মধ্যে দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের বড় একটি অংশ এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। কারা অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, মোট পালানো বন্দিদের মধ্যে এখনো ৭১৩ জন ফেরারি রয়েছে। এদের মধ্যে অনেকেই দুর্ধর্ষ অপরাধে অভিযুক্ত, যা দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পালানো বন্দি ও অস্ত্র উদ্ধারে বড় চ্যালেঞ্জ
গণ-অভ্যুত্থানের সময় কারাগারগুলোতে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ সময় শুধু বন্দিরাই পালিয়ে যায়নি, কারাগার থেকে লুট হয়েছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র। চাইনিজ রাইফেল ও শটগানসহ মোট ৬৭টি অস্ত্র লুট হয়, যার মধ্যে এখনো ২৭টি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। মোট লুট হওয়া অস্ত্রের প্রায় ৪০ শতাংশ এখনো নিখোঁজ থাকায় নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এসব অস্ত্র অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হতে পারে।
কত বন্দি পালাল, কতজন ধরা পড়ল
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের আগে ও পরে দেশের ১৭টি কারাগারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। নরসিংদী, শেরপুর ও সাতক্ষীরা কারাগার থেকে সব বন্দিই পালিয়ে যায়। নরসিংদী থেকে ৮২৬ জন, শেরপুর থেকে ৫০০ জন, সাতক্ষীরা থেকে ৬০০ জন, কুষ্টিয়া কারাগার থেকে ১০৫ জন এবং কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ২০০ জন বন্দি পালিয়ে যান। সব মিলিয়ে ওই সময় ২ হাজার ২৩২ জন বন্দি কারাগার ছাড়িয়ে যায়। পরবর্তী অভিযানে ১ হাজার ৫১৯ জনকে পুনরায় আটক করা হলেও এখনো ৭১৩ জন ফেরারি রয়ে গেছে।
দুর্ধর্ষ অপরাধীদের ঝুঁকি
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, পলাতক বন্দিদের অনেকের বিরুদ্ধে হত্যা, ডাকাতি, অস্ত্র ও মাদক মামলা, ধর্ষণ, নারী নির্যাতনসহ নানা গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এদের কেউ কেউ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিও ছিলেন। জেল ভেঙে পালিয়ে যাওয়ার পর তারা নতুন করে অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে, যা সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ের খুন, ছিনতাই ও ডাকাতির পেছনে পলাতক বন্দিদের সংশ্লিষ্টতা থাকার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা।
নরসিংদী কারাগারে প্রথম বড় ঘটনা
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্যে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই নরসিংদী জেলা কারাগারে প্রথম বড় ধরনের হামলা হয়। হাজার হাজার মানুষ মিছিল নিয়ে কারাগারে ঢুকে সেলের তালা ভেঙে দেয়। এতে নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্যসহ মোট ৮২৬ জন বন্দি পালিয়ে যায়। সে সময় অস্ত্র, গোলাবারুদ ও খাদ্যপণ্য লুটের পাশাপাশি কারাগারে ব্যাপক অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে একপর্যায়ে কারারক্ষীরাও পিছু হটতে বাধ্য হন।
কাশিমপুর ও জামালপুর কারাগারের সংঘর্ষ
সরকার পতনের পরদিন ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। উচ্চ ঝুঁকির বন্দিরা দেয়াল ভেঙে ও টপকে পালানোর চেষ্টা করে। সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও ২০৯ জন বন্দি পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এ সময় গুলিতে ছয়জনের মৃত্যু হয়।
এরপর ৮ আগস্ট জামালপুর কারাগারে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। কয়েদিদের হামলায় ১৩ জন কারারক্ষী জিম্মি হন। গুলিবর্ষণে ছয়জন নিহত হলেও শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং সেখান থেকে কোনো বন্দি পালাতে পারেনি।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা
কারা অধিদপ্তর জানিয়েছে, পলাতক বন্দি ও লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় চলছে। পুলিশের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, এখনো যেসব বন্দিকে আটক করা যায়নি তাদের অবস্থান শনাক্তে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কর্তৃপক্ষের আশা, বিশেষ অভিযান জোরদার করা হলে দ্রুতই ফেরারি বন্দিদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















