প্রধান প্রতিবেদন, ইউএনবি
গত বছরের ২৬ থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত সুন্দরবনে সংরক্ষণ কার্যক্রমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত একটি সফরে অংশ নেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক। তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্বামী ক্যালাম ম্যাককালাম ও বোন ডেবোরাহ জেন কুক। বাগেরহাটের মংলা উপজেলার জয়মনি এলাকায় অবস্থিত ওয়াইল্ডটিম কনজারভেশন বায়োলজি সেন্টার, স্থানীয়ভাবে পরিচিত টাইগারহাউস, ছিল এই সফরের কেন্দ্রবিন্দু।
শীতের সুন্দরবন ও সফরের অভিজ্ঞতা
ডিসেম্বরের শেষ ভাগে সুন্দরবনের আবহাওয়া ছিল ব্যতিক্রমী। কুয়াশা আর কনকনে ঠান্ডায় নদী-খাল ঢাকা পড়ে ছিল। ২৭, ২৮ ও ২৯ ডিসেম্বর প্রতিদিনের বড় একটি অংশ কেটেছে নৌপথে—কখনো সরু খাল, কখনো প্রশস্ত নদী ধরে ধীরে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যে। অধিকাংশ দিন সূর্যের দেখা মেলেনি। এই নীরব, শীতল পরিবেশেই অতিথিরা উপভোগ করেছেন সুন্দরবনের স্থিরতা ও প্রকৃতির নিজস্ব ছন্দ।

টাইগারহাউস ও সংরক্ষণ উদ্যোগ
টাইগারহাউসের ছাদ থেকে দেখা যায় নদী, সুন্দরবনের বনপ্রান্ত, চিংড়ি ঘের ও গ্রাম—সব মিলিয়ে এক অনন্য দৃশ্যপট। সফরের সময় তারা ইকে সুন্দরবন জাদুঘর ও ব্যাখ্যা কেন্দ্র পরিদর্শন করেন এবং ওয়াইল্ডটিমের কাজ সম্পর্কে বিস্তারিত শোনেন। সংরক্ষণ যে কেবল বন্যপ্রাণী রক্ষার বিষয় নয়, বরং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া—এই বার্তাই সেখানে গুরুত্ব পায়।
এই কেন্দ্র ও জাদুঘর গড়ে ওঠার পেছনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের যৌথ উদ্যোগে দেশীয় পোশাকশিল্পভিত্তিক সহায়তায় সুন্দরবনে বাঘ সংরক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম এগিয়ে চলেছে।
বনে ভ্রমণ ও বাস্তবতা

হারবারিয়া, অন্ধরমণিক ও মৃগামারী খালসহ কয়েকটি এলাকায় বনে প্রবেশ করেন অতিথিরা। কুয়াশার কারণে অনেক সময় দূরের কিছুই স্পষ্ট ছিল না। তবে এই সীমাবদ্ধতাই যেন সুন্দরবনের বাস্তবতা শেখায়—এই বন সহজে নিজেকে উন্মুক্ত করে না। এখানে সংরক্ষণ মানে ধৈর্য, বিশ্বাস ও দীর্ঘস্থায়ী অঙ্গীকার।
একটি সকালের নাশতা ও একটি স্বপ্ন
সফরের সবচেয়ে হৃদয়ছোঁয়া মুহূর্তটি আসে আনুষ্ঠানিকতার বাইরে। এক সকালে নাশতার টেবিলে হাইকমিশনার ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে বসে পড়ে জয়মনি উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্রী টোনু। সে একজন টাইগারস্কাউট ও আর্থস্কাউট। তার সঙ্গে ছিলেন মা স্নিগ্ধা মণ্ডল, যিনি শিক্ষক ও আর্থমেন্টর হিসেবে এলাকায় বহু শিক্ষার্থীর অনুপ্রেরণা।
ঠিক সেই সকালেই টোনু তার দশম শ্রেণির পরীক্ষার ফল পায় এবং প্রথম স্থান অধিকার করে। সফরের শেষ দিনে বিদায়ের সময় টোনু তার মাকে বলে, বড় হয়ে সে রাষ্ট্রদূত হতে চায় এবং মাকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে চায়। সুন্দরবনের প্রান্ত থেকে উঠে আসা এই স্বপ্ন সংরক্ষণ আর শিক্ষার গভীর সম্পর্ককে স্পষ্ট করে।

মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থান
সফরের সময় প্রতিনিধি দল গ্রামভিত্তিক বাঘ প্রতিক্রিয়া দল, বাঘবন্ধু, টাইগারস্কাউট ও আর্থমেন্টরদের সঙ্গে কথা বলেন। বাঘ লোকালয়ে ঢুকে পড়লে কীভাবে স্থানীয় দলগুলো কাজ করে, তার একটি প্রদর্শনও তারা প্রত্যক্ষ করেন। এতে বোঝা যায়, সুন্দরবনে মানুষ ও বাঘের সহাবস্থান কোনো তাত্ত্বিক ধারণা নয়, প্রতিদিনের বাস্তবতা।
এছাড়া এলাকায় সুপেয় পানি সংকট মোকাবিলায় ওয়াইল্ডটিমের পানীয় জল বিতরণ কার্যক্রমও তারা দেখেন, যা এই অঞ্চলের মানুষের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
সফরের তাৎপর্য
এই সফর কেবল কূটনৈতিক ছিল না। এটি ছিল মানবিক, নীরব ও গভীরভাবে সংযুক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা। শীত, কুয়াশা আর শান্ত পরিবেশের মধ্য দিয়ে এই সফর আবারও মনে করিয়ে দেয়, সুন্দরবনের সংরক্ষণ মানে টোনু ও স্নিগ্ধার মতো মানুষের স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে লালন করা। প্রকৃতি রক্ষা আর মানুষের ভবিষ্যৎ—এই দুই একসঙ্গেই এগিয়ে চলে।



Sarakhon Report 



















